যুবসমাজে আধ্যাত্মিকতা  বিলাস নাকি প্রয়োজন?
যুবসমাজে আধ্যাত্মিকতা বিলাস নাকি প্রয়োজন?
✍ গৌরাঙ্গ দাস
১২ আগস্ট ২০২৬
বর্ষ: 2025  |  ইস্যু: ৩য় সংখ্যা

প্রযুক্তি, প্রতিযোগিতা ও পরিপূর্ণতার দৌড়ে ব্যস্ত আজকের যুবসমাজ যেন এক অদৃশ্য ভারে ক্লান্ত, বিভ্রান্ত ও কখনো কখনো ভগ্নচেতা। উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার, সোশ্যাল স্ট্যাটাস-সবকিছুর মাঝেও কোথাও যেন অপূর্ণতা, অসন্তোষ ও অন্তর্দাহ বাসা বাঁধে। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ যখন আধ্যাত্মিকতার দিকে আকৃষ্ট হয়, তখন অনেকেই প্রশ্ন তোলে — “এটা কি আসলেই প্রয়োজন? নাকি শুধু মানসিক বিলাস?”

   আধ্যাত্মিকতা মানেই কি সংসারবিমুখতা? নাকি এটা জীবনের মূল গ্রোতে থেকেও অন্তরের ভারমুক্তির একটি পথ? বিশেষ করে যুবকদের কাছে এই প্রশ্ন আরো গভীর-কারণ, এ সময়েই গড়ে ওঠে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি, পরিচয় ও মূল্যবোধ।

   এই প্রবন্ধে আমরা অনুসন্ধান করব, কেন এবং কীভাবে আধ্যাত্মিকতা যুবসমাজের জন্য প্রয়োজনীয় আলোর মতো কাজ করতে পারে। দেখব, এটা শুধু বিলাস নয়, বরং সময়ের দাবিতেই আজকের তরুণদের আত্মসন্ধানী পথযাত্রার এক অপরিহার্য দিক।

উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর বিখ্যাত কবিতা “All the worldÕs a stage” – এ যুবক বয়সের মানসিকতা সম্পর্কে লিখেছেন: “Then a soldier, full of strange oaths and bearded like the pard, Jealous in honour, sudden and quick in quarrel, seeking the bubble reputation even in the cannon’s mouth

.” অর্থাৎ, “এরপর সে হয়ে ওঠে এক বীর সৈনিক, চিতাবাঘের মতো দাঁড়িওয়ালা, বিচিত্র শপথে মুখর, সম্মানে উত্তেজিত, সামান্য কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, আর ক্ষণিক খ্যাতির জন্য কামানের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে।”

এই হলো এক নবযুবকের মন-একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আবেগে পূর্ণ, নিজের লক্ষ্য স্থির করে পরিণত হবার চেষ্টায় নিয়োজিত। সে সম্মান কামনা করে এবং তার সম্মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ জানায়। অথচ জীবনের এই অমূল্য সময়টা, যেখানে সে তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য কাজে লাগাতে পারতো, তা নষ্ট হয়ে যায় যদি তার অন্তরের প্রেরণা বাইরের মোহের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়।

গণমাধ্যমের এমন এক মোহময় শক্তি রয়েছে, যা আমাদেরকে সস্তা ভোগের প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে মুগ্ধ করে, আর আমাদের জীবনের উদ্যম ও যৌবনের বল তুলে নিয়ে যায়। যৌবনকাল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমাদের চিন্তা করা দরকার-আমরা কোথায় আমাদের শক্তি ও সম্পদ বিনিয়োগ করছি, ঈশ্বরপ্রদত্ত বুদ্ধিকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি? সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আমাদের উদ্দেশ্য ও প্রেরণায় স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক।

তিন প্রকার অনুপ্রেরণা

প্রেরণার তিনটি স্তর থাকে — কোনো কিছু করার মানসিকতা বা ইচ্ছা, সৃষ্টিশীল শক্তি এবং এমন এক চেতনা, যা অসাধারণ সাফল্যের দিকে পরিচালিত করে। এই তিন রকম অনুপ্রেরণাই প্রকৃতির তিন গুণ — তম, রজ ও সত্ত্ব-এর দ্বারা প্রভাবিত।

   আমাদের ইতিহাস বলে, হিরণ্যকশিপুও অনুপ্রাণিত হয়েছিল, কিন্তু তার অনুপ্রেরণা ছিল ধ্বংসের। এটি তমোগুণ দ্বারা চালিত। রজোগুণ দ্বারা প্রভাবিত অনুপ্রেরণার উদাহরণ, কোনো তরুণ কেবল একটি সুন্দরী তরুণীকে দেখতে কলেজে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত হয়। আবার, সত্ত্বগুণের অনুপ্রেরণা রূপান্তরমূলক — যেমন, কলিঙ্গ যুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ দেখে সম্রাট অশোকের হৃদয়ে পরিবর্তন আসে এবং তিনি মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। মাদার তেরেসাও ছিলেন সেই প্রেরণার প্রতীক — মানবতার দুঃখ তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল অসহায়দের সেবা করতে।

সঠিক অনুপ্রেরণা

যারা সত্ত্বগুণে থাকে, তারা রক্ষণ করতে চায়; রজোগুণীরা সৃষ্টি করতে চায়; আর তমোগুণীরা ধ্বংসে উৎসাহী হয়। কিন্তু কৃষ্ণভাবনামৃত চেতনার মূল উদ্দেশ্য — প্রতিটি জীবাত্মাকে তার জীবনের পরম লক্ষ্য অর্জনের অনুপ্রেরণা দেওয়া, যা এই তিন গুণের ঊর্ধ্বে।

ভাগবত — এ বলা হয়েছে:

“এতাং স আস্থায় পরাত্ম-নিষ্ঠাম্

অধ্যাসিতাং পূর্বতামৈঃ মহর্ষিভিঃ।

অহং তরিষ্যামি দুরন্ত-পারং

তমো মুকুন্দাঙ্ঘ্রি-নিষেবয়ৈব।।”

“আমি পূর্বতন মহর্ষিদের মতোই কৃষ্ণের পদসেবায় অবিচল থেকে এই অপরিসীম জড় অজ্ঞানতাকে অতিক্রম করব।”

   এই অনুপ্রেরণাই সেই ব্যক্তি গ্রহণ করেন, যিনি আত্মানুসন্ধানে নিযুক্ত, যিনি জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন ছিন্ন করে পরমেশ্বরের প্রেমলাভ করতে চান। এই কর্মফলপূর্ণ, দুঃখময় সংসারসাগর পার হওয়া সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন অনড় সংকল্প এবং এমন ব্যক্তিদের সান্নিধ্য থেকে সদা অনুপ্রেরণা, যাঁরা আত্ম — উন্নয়নের পথ রপ্ত করেছেন।

কেন এখনই, যখন আমরা যুবক?

অনেকে বলবেন, “আচ্ছা, মানলাম আমাদের একদিন আত্মসিদ্ধি লাভ করতে হবে। কিন্তু এত তাড়াহুড়ো কেন? সামনে তো একটা গোটা জীবন পড়ে আছে! ৬০ — ৭০ বছর বয়সে তো আর আনন্দ করা যায় না, এখন তো জীবনের আস্বাদ নেওয়ার সময়। এখন আধ্যাত্মিকতা নিয়ে ভাবার দরকার কী?”

কিন্তু প্রশ্ন হলো-কে যুবক, আর কে বৃদ্ধ?

অনেকে বলেন, “যখন আর হাঁটতে পারব না, তখন আমি বৃদ্ধ।” আবার কেউ বলেন, “যখন ভালো করে চিবোতে পারব না, তখন আমি বৃদ্ধ।” কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চারাও দাঁত হারায়, আবার অনেক তরুণ দুর্ঘটনায় পা হারায়। তাহলে বয়সের মানে কী?

   আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যৌবন ও বার্ধক্যের সংজ্ঞা হলো — মৃত্যুর কতটা নিকটে আছি। যে যত নিকটে, সে ততটাই বৃদ্ধ; আর যে যত দূরে, সে ততটাই যুবক।

মৃত্যু সবার জন্য সমান

আমাদের বোঝা দরকার, মৃত্যু যেকোনো সময় আমাদের গ্রাস করতে পারে। যেখানে মানুষ অন্যত্র সমানাধিকারের জন্য লড়ছে, সেখানে মৃত্যু তো সকলকে বিনা পারিশ্রমিকে দিয়ে দেয়। তাই, এই শরীরে আমাদের সময় খুব সীমিত; এই সময়টা আমাদের কাজে লাগাতে হবে, ঈশ্বরপ্রেম অর্জনের সাধনায়। কারণ এই পথই আমাদের জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধির আবর্ত থেকে মুক্ত করতে পারে।

   আমরা আত্মা; চিরন্তনভাবে ঈশ্বরের সেবক। এই সত্য ভুলে যাওয়ার ফলেই আমরা ভোগ ও দুঃখের দ্বন্দ্বে আবদ্ধ হয়ে আছি এই ক্ষণস্থায়ী জগতে।

   যত তাড়াতাড়ি আমরা এই সত্যটি উপলব্ধি করব এবং ঈশ্বরনির্দেশিত জীবনযাপনের জন্য সাধনা করব, তত তাড়াতাড়ি আমরা মোহের বন্ধন থেকে মুক্ত হবো। তাই শেক্সপিয়রের কথা অনুসারে, চিতাবাঘের মতো দাঁড়িওয়ালা ও অদ্ভুত শপথে পূর্ণ তরুণকে শপথ নিতে হবে সেবার, শুধু জাতি, পরিবার বা সমাজের জন্য নয়, সমস্ত জীবের কল্যাণ এবং নিজের আত্মার মুক্তির জন্য।

   তার বিশ্বাসে হতে হবে দৃঢ়, চেতনায় হতে হবে প্রবল এবং আত্মজ্ঞান লাভের জন্য হতে হবে একাগ্র — সত্যিকারের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকদের সাহায্যে। — হরেকৃষ্ণ

বিষাদযুদ্ধ জয়  ও ভগবদ্গীতার  প্রাসঙ্গিকতা
বিষাদযুদ্ধ জয় ও ভগবদ্গীতার প্রাসঙ্গিকতা
আর্য সভ্যতা
আর্য সভ্যতা
সনাতন ধর্মের মৌলিক পর্ব-৪ (ঈশ্বর রহস্য—২)
সনাতন ধর্মের মৌলিক পর্ব-৪ (ঈশ্বর রহস্য—২)
শ্রীকৃষ্ণই কি বেদের বিষ্ণু?
শ্রীকৃষ্ণই কি বেদের বিষ্ণু?
ক্ষমা
ক্ষমা