“হে ভগবান, আপনার যে দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে শ্রীমদ্ভাগবত এবং ভগবদ্গীতায় মানুষের ধর্ম উপদিষ্ট হয়েছে, সেই দৃষ্টি কখনো জীবনের চরম উদ্দেশ্য থেকে বিচলিত হয় না। যাঁরা আপনার পরিচালনায় সেই ধর্ম অনুশীলন করেন, তাঁরা স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত জীবের প্রতিই সমদৃষ্টি-সম্পন্ন, এবং তাঁরা কখনো উচ্চ-নিচ বিচার করেন না। তাঁদের বলা হয় আর্য। এই প্রকার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা পরমেশ্বর ভগবান আপনারই উপাসনা করেন।” (ভাগবত ৬.১৬.৪৩) ভাগবত-ধর্ম এবং কৃষ্ণকথা একই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু চেয়েছিলেন যে, সকলেই যেন গুরু হয়ে ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত, পুরাণ, বেদান্ত-সূত্র আদি বৈদিক শাস্ত্র থেকে কৃষ্ণ-উপদেশ সর্বত্র প্রচার করেন। সভ্যতায় অগ্রণী আর্যেরা ভাগবত-ধর্ম অনুসরণ করেন। প্রহল্লাদ মহারাজ পাঁচ বছর বয়স্ক বালক হওয়া সত্ত্বেও উপদেশ দিয়েছেন—
“হে ভগবান, আপনার যে দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে শ্রীমদ্ভাগবত এবং ভগবদ্গীতায় মানুষের ধর্ম উপদিষ্ট হয়েছে, সেই দৃষ্টি কখনো জীবনের চরম উদ্দেশ্য থেকে বিচলিত হয় না। যাঁরা আপনার পরিচালনায় সেই ধর্ম অনুশীলন করেন, তাঁরা স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত জীবের প্রতিই সমদৃষ্টি-সম্পন্ন, এবং তাঁরা কখনো উচ্চ-নিচ বিচার করেন না। তাঁদের বলা হয় আর্য। এই প্রকার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা পরমেশ্বর ভগবান আপনারই উপাসনা করেন।” (ভাগবত ৬.১৬.৪৩)
ভাগবত-ধর্ম এবং কৃষ্ণকথা একই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু চেয়েছিলেন যে, সকলেই যেন গুরু হয়ে ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত, পুরাণ, বেদান্ত-সূত্র আদি বৈদিক শাস্ত্র থেকে কৃষ্ণ-উপদেশ সর্বত্র প্রচার করেন। সভ্যতায় অগ্রণী আর্যেরা ভাগবত-ধর্ম অনুসরণ করেন। প্রহল্লাদ মহারাজ পাঁচ বছর বয়স্ক বালক হওয়া সত্ত্বেও উপদেশ দিয়েছেন—
কৌমার আচরেৎ প্রাজ্ঞো ধর্মান্ ভাগবতানিহ।
দুর্লভং মানুষং জন্ম তদপ্যধ্রুবমর্থদম্ ।।
(শ্রীমদ্ভাগবত ৭/৬/১)
প্রহল্লাদ মহারাজ তাঁর পাঠশালায় শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে যখনই সুযোগ পেতেন, তখনই তাঁর সহপাঠীদের ভাগবত-ধর্ম উপদেশ দিতেন। তিনি তাদের বলেছিলেন জীবনের শুরু থেকেই, পাঁচ বছর বয়স থেকে ভাগবত-ধর্ম আচরণ করা উচিত, কারণ মনুষ্য জন্ম অত্যন্ত দুর্লভ এবং এই মনুষ্য জন্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বিষয়টি যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করা। ভাগবত-ধর্মের অর্থ হচ্ছে ভগবানের উপদেশ অনুসারে জীবনযাপন করা। ভগবদ্গীতায় আমরা দেখতে পাই যে, ভগবান মনুষ্য-সমাজকে চারটি বর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) বিভক্ত করেছেন। পুনরায় পুরাণ আদি বৈদিক শাস্ত্রে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষের পারমার্থিক জীবনও চারটি আশ্রমে বিভক্ত করা হয়েছে। অতএব, ভাগবত-ধর্মের অর্থ হচ্ছে বর্ণাশ্রম-ধর্ম। মানুষের কর্তব্য ভগবানের নির্দেশ অনুসারে এই ভাগবত-ধর্ম অনুসরণ করে জীবন যাপন করা এবং যাঁরা তা করেন তাঁদের বলা হয় আর্য। আর্য সভ্যতা নিষ্ঠা সহকারে ভগবানের নির্দেশ পালন করে এবং কখনো সেই পরম পবিত্র নির্দেশ থেকে বিচলিত হয় না। এই প্রকার সভ্য মানুষেরা গাছপালা, পশুপক্ষী, মানুষ এবং অন্যান্য জীবদের মধ্যে কোনো ভেদ দর্শন করেন না। পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ — যেহেতু তাঁরা কৃষ্ণভাবনায় স¤পূর্ণরূপে শিক্ষিত, তাই তাঁরা সমস্ত জীবকে সমদৃষ্টিতে দর্শন করেন। আর্যেরা অকারণে একটি গাছের চারাকে পর্যন্ত হত্যা করেন না, অতএব ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের জন্য গাছ কাঁটা তো দূরের কথা। বর্তমানে পৃথিবী জুড়ে সর্বত্র ব্যাপকভাবে হত্যা হচ্ছে। মানুষ তাদের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য অকাতরে গাছপালা, পশুপক্ষী এবং অন্যান্য মানুষদেরও হত্যা করছে। এটি আর্য সভ্যতা নয়। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থিরচরসত্ত্বকদম্বেষু অপৃথগ্ধিয়ঃ। অপৃথন্ধিয়ঃ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে, আর্যেরা উচ্চতর এবং নিম্নতর জীবনের মধ্যে ভেদ দর্শন করেন না। সমস্ত জীবনই রক্ষা করা উচিত। প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, এমনকি গাছপালারও। এটিই আর্য সভ্যতার মূল ভাবধারা। নিম্নস্তরের জীবদের বাদ দিয়ে, যাঁরা সভ্য মানুষের স্তরে এসেছেন, তাঁদের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র — এই চারটি বর্ণে বিভক্ত করা কর্তব্য। ব্রাহ্মণদের কর্তব্য ভগবদ্গীতা ও অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রে ভগবান যেসমস্ত উপদেশ দিয়েছেন, সেগুলো অনুসরণ করা।
এই বর্ণবিভাগের ভিত্তি অবশ্যই গুণ এবং কর্ম হওয়া উচিত। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের গুণাবলি অনুসারে এই বর্ণবিভাগ হওয়া কর্তব্য। এটিই আর্য সভ্যতা। কেন তাঁরা তা গ্রহণ করেন? কারণ তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টি বিধানে অত্যন্ত আগ্রহী। এটিই আদর্শ সভ্যতা। আর্যেরা শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ থেকে বিচলিত হন না অথবা শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা সম্বন্ধে কোনো রকম সন্দেহ প্রকাশ করেন না; কিন্তু অনার্যেরা এবং আসুরিক ভাবাপন্ন মানুষেরা ভগবদ্গীতার এবং শ্রীমদ্ভাগবতের নির্দেশ পালন করতে পারে না। তার কারণ তারা অন্য জীবের জীবনের বিনিময়ে তাদের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের শিক্ষা লাভ করেছে। নূনং প্রমত্তঃ কুরুতে বিকর্ম-তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের জন্য সবরকম নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হওয়া। যদ্ ইন্দ্রিয়প্রীতয় আপৃণোতি-তারা এভাবে বিপথগামী হয় কারণ তারা তাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধন করতে চায়। তাদের অন্য কোনো বৃত্তি বা উচ্চাকাক্সক্ষা নেই। পূর্ববর্তী শ্লোকে তাদের এই প্রকার সভ্যতার নিন্দা করা হয়েছে। কঃ ক্ষেমো নিজপরয়োঃ কিয়ান্ বার্থঃ স্বপরদ্রুহা ধর্মেণ — “যে সভ্যতায় অন্যদের হত্যা করা হয়, সেই সভ্যতার কী প্রয়োজন?” তাই এই শ্লোকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, সকলেই যেন আর্য সভ্যতার অনুগামী হয়ে ভগবানের নির্দেশ পালন করেন। মানুষের কর্তব্য ভগবানের নির্দেশ অনুসারে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করা। আমরা কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের আদর্শে একটি সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি
মানুষের কর্তব্য ভগবানের নির্দেশ অনুসারে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কার্যকলাপ অনুষ্ঠান করা। আমরা কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের আদর্শে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এটিই কৃষ্ণভাবনামৃতের অর্থ। এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সমগ্র মানব-সমাজের কল্যাণের জন্য ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতের নির্দেশ অনুসারে নিষ্ঠা সহকারে ভাগবত-ধর্ম পালন করছে
এটিই কৃষ্ণভাবনামৃতের অর্থ। তাই আমরা ভগবদ্গীতার জ্ঞান যথাযথভাবে উপস্থাপন করছি এবং সব রকম মনগড়া জল্পনা-কল্পনা ঝেঁটিয়ে বিদায় করছি। মূর্খ ও পাষণ্ডরা ভগবদ্গীতার মনগড়া অর্থ তৈরি করে। শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন, মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু — “সর্বদা আমার কথা চিন্তা করো, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করো এবং আমাকে নমস্কার করো” — তার কদর্থ করে তারা বলে কৃষ্ণের শরণাগত হতে হবে না। এভাবে তারা ভগবদ্গীতার মনগড়া অর্থ তৈরি করে। কিন্তু এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সমগ্র মানব-সমাজের কল্যাণের জন্য ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতের নির্দেশ অনুসারে নিষ্ঠা সহকারে ভাগবত-ধর্ম পালন করছে। যারা তাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের জন্য ভগবদ্গীতার কদর্থ করে, তারা অনার্য। তাই সেই ধরনের মানুষদের দেওয়া ভগবদ্গীতার ভাষ্য তৎক্ষণাৎ বর্জন করা উচিত। ভগবদ্গীতার উপদেশ যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করা উচিত। ভগবদ্গীতায় (১২/৬-৭) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন —
যে তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ।
অনন্যেনৈব যোগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে ।
তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।
ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাস্।।
বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়ে সর্বত্র ব্যাপকভাবে হত্যা হচ্ছে। মানুষেরা তাদের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য অকাতরে গাছপালা, পশুপক্ষী এবং অন্যান্য মানুষদেরও হত্যা করছে। এটি আর্য সভ্যতা নয়। আর্যেরা উচ্চতর এবং নিম্নতর জীবনের মধ্যে ভেদ দর্শন করেন না। সমস্ত জীবনই রক্ষা করা উচিত। প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, এমনকি গাছপালারও। এটিই আর্য সভ্যতার মূল ভাবধারা।
“হে পার্থ, যারা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করে, মৎপরায়ণ হয়ে অনন্য ভক্তিযোগের দ্বারা আমার উপাসনা ও ধ্যান করে, সেই সমস্ত ভক্তদের আমি মৃত্যুময় সংসার-সাগর থেকে অচিরেই উদ্ধার করি।” — হরেকৃষ্ণ