১. প্রশ্ন: ঈশ্বর, পরমেশ্বর, ভগবান, ব্রহ্ম, পরমব্রহ্ম, পরমপুরুষ, পুরুষোত্তম, পরমতত্ত্ব প্রভৃতি শব্দের তাৎপর্য কী?
উত্তর: ঈশ্বর: ঈশ্বর অর্থ নিয়ন্তা — যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। সে অর্থে নগন্য জীব থেকে উন্নত ঋষি বা দেবতা — সকলেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঈশ্বর। তবে সাধারণ অর্থে ঈশ্বর বলতে সবকিছুর নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবানকেই বোঝানো হয়ে থাকে।
পরমেশ্বর: যিনি সকল নিয়ন্তার নিয়ন্তা, তিনিই পরম নিয়ন্তা বা পরমেশ্বর নামে অভিহিত।
পরমাত্মা: প্রাণিদেহে অবস্থিত আত্মা চেতন বস্তু। পরমেশ্বর ভগবান পরম চেতনাময়। তিনি সমস্ত আত্মার উৎস ও আশ্রয়। তাই তিনিই পরমাত্মা। জীবাত্মা কেবল তার নিজের শরীর সম্পর্কে অবগত, কিন্তু পরমাত্মা সমস্ত শরীর এমনকি সবকিছু পূর্ণরূপে অবগত। অন্তর্যামী হয়ে তিনি প্রত্যেক জীবের হৃদয়ে তার কর্মের সাক্ষী, অনুমোদদাতা ও ফলদাতারূপে অবস্থান করেন।
ভগবান: ‘ভগ’ অর্থ ঐশ্বর্য; ‘বান’ অর্থ কোনো কিছুর অধিকারী। যেমন, ধনের অধিকারী ধনবান, যার রূপ আছে, তিনি রূপবান। তেমনই, ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য — এ ছয় ঐশ্বর্য যাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে বিদ্যমান, তিনিই ভগবান। তবে কোনো জীবের মধ্যে যখন এ ষড়ৈশ্বর্য অধিক মাত্রায় থাকে, তখন তাঁর সম্মানার্থে কখনো কখনো তাঁকেও ভগবান বলে সম্বোধন করা হয়। কিন্তু ভগবান শব্দে মূলত পরমেশ্বরকেই বোঝানো হয়।
ব্রহ্ম: ভগবানের দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটা। ভগবানের নিরাকার স্বরূপকে ব্রহ্ম বলা হয়। জীবাত্মাসমূহ ব্রহ্মের অংশ হওয়ায় কখনো কখনো জীবকেও ব্রহ্ম বলা হয়। তবে মুখ্য অর্থে ব্রহ্ম শব্দে ভগবানকেই বোঝায়।
যস্য প্রভা প্রভবতো জগদণ্ডকোটি—
কোটিষ¦শেষবসুধাদিবিভূতিভিন্নম্।
তদ্ ব্রহ্ম নিষ্কলমনন্তমশেষভূতং
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।
(ব্রহ্মসংহিতা ৫.৪০)
একথা ভগবান শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৪.২৭) স্পষ্ট করে দিয়েছেন —
ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্যাব্যয়স্য চ।
শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ ।।
“আমিই নির্বিশেষ ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়। অব্যয় অমৃতের, শাশ্বত ধর্মের এবং ঐকান্তিক সুখের আমিই আশ্রয়।”
পরমব্রহ্ম: একমাত্র পরমেশ্বর ভগবানই পরমব্রহ্ম। জীব কখনোই এমনকি মুক্তিলাভের পরও পরমব্রহ্ম বা তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না।
পরমপুরুষ: ‘পুরুষ’ অর্থ ভোক্তা। জীবসমূহ অনুভোক্তা, ভগবান পরম ভোক্তা; তাই ভগবানই পরমপুরুষ।
পুরুষোত্তম: ক্ষুদ্র ভোক্তা হিসেবে কখনো কখনো জীবাত্মাকেও পুরুষ বলা হয়; কিন্তু ভগবান হলেন উত্তম পুরুষ তথা পুরুষোত্তম — বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ (গীতা ১৫.১৮)।
পরমতত্ত্ব: সমস্ত তত্ত্ববস্তুর মধ্যে ভগবানই সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই তিনিই পরমতত্ত্ব।
প্রশ্ন: ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব — এই তিনজনের মধ্যে পরমেশ্বর কে?
উত্তর: ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন — তিনিই সকলের পালনকর্তা (১৩.১৫)। জড় ও চেতন জগতের সবকিছুর উৎস তিনিই এবং তিনিই সমস্ত জগতের উৎপত্তি ও প্রলয়ের মূল কারণ (৭.৬, ১০.৮)। কৃষ্ণই জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়ের স্থান এবং কৃষ্ণের জন্যই এই স্থাবর জঙ্গমাত্মক জগৎ সৃষ্টি হয়েছে (ম.ভা. সভাপর্ব ৩৭.২১)। অর্থাৎ, এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণই ব্রহ্মারূপে সৃষ্টি করেন, বিষ্ণুরূপে পালন করেন এবং শিবরূপে সংহার করেন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব — এই তিনজনই সেই এক পরমেশ্বরের প্রকাশ বা প্রতিনিধি। তাঁরা ভগবানের গুণাবতার — ব্রহ্মা রজোগুণের, শিব তমোগুণের এবং বিষ্ণু সত্ত্বগুণের অধিপতি। কিন্তু এ তিন গুণাবতারের মধ্যে বিষ্ণু নিগুর্ণ ও মায়ার অতীত। ব্রহ্মা জীবতত্ত্ব, শিব জীব ও ঈশ্বরের মধ্যবর্তী বিশেষ তত্ত্ব এবং বিষ্ণু ঈশ্বরতত্ত্ব।
শ্রীমদ্ভাগবতে (৪.৭.৫০) ভগবান শ্রীবিষ্ণু দক্ষকে বলেন —
অহং ব্রহ্মা চ শব্বর্শ্চ জগতঃ কারণং পরম্।
আত্মেশ্বর উপদ্রষ্টা স্বয়ংদৃগবিশেষণঃ।।
“আমি জগতের পরম কারণ, পরমাত্মা, ঈশ্বর ও সাক্ষীস্বরূপ, আমি স্বয়ংপ্রকাশ ও জড় —উপাধিরহিত অপ্রাকৃত বস্তু; আমিই আবার গুণাবতার ব্রহ্মা ও শিবরূপে প্রকাশিত থাকি।” (শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ও শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরকৃত অনুবাদ)
যে কল্পে বিষ্ণু নিজেই ব্রহ্মা হন, সেই কল্পে ব্রহ্মা ঈশ্বরতত্ত্ব। সদাশিব ঈশ্বরতত্ত্ব, কিন্তু রুদ্ররূপে তিনি স্বতন্ত্র ঈশ্বর নন, আধিকারিক দেববিশেষ (যাকে অধিকার দেওয়া হয়েছে); তাঁর ঈশ্বরতা বিষ্ণু বা কৃষ্ণের ঈশ্বরতার অধীন; আবার, কোনো কল্পে যোগ্য জীব শিবের পদ গ্রহণ করেন। যেহেতু, কল্পবিশেষে বিষ্ণুই ব্রহ্মা হন, মহেশধামে বিরাজিত সদাশিবও মূলত বিষ্ণুই এবং সমস্ত দেবতা বিষ্ণুরই অংশ (ঋগ্বেদ), তাই সর্ববেদ বলে — তদ্বিষ্ণো পরমং পদং সদা...। অতএব এই তিনজনের মধ্যে সর্বকালে বিষ্ণুই পরমেশ্বর।
তাই শ্রীমদ্ভাবতে (১.২.২৩) বলা হয়েছে —
সত্ত্বং রজস্তম ইতি প্রকৃর্তেগুণাস্তৈ —
যুর্ক্তঃ পরঃ পুরুষ এক ইহাস্য ধত্তে।
স্থিত্যাদয়ে হরিবিরিঞ্চিহরেতি সংজ্ঞাঃ
শ্রেয়াংসি তত্র খলু সত্ত্বতনোনৃণাং স্যুঃ ।।২৩।।
“পরমেশ্বর ভগবান সত্ত্ব, রজ ও তম নামক জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত। জড় জগতের সৃষ্টি, পালন ও বিনাশের জন্য তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব — এই তিনটি গুণজাত রূপ ধারণ করেন। এই তিনটি রূপের মধ্যে সমস্ত মানুষ সত্ত্বগুণজাত বিষ্ণু থেকেই আত্যন্তিক মঙ্গল লাভ করতে পারেন।”
প্রশ্ন: যদি বিষ্ণু পরমেশ্বর হন, তাহলে শিব ও ব্রহ্মাকে কেন তেমনই শক্তিশালী মনে হয়? তাঁদেরকেও তো অনেক সময় ‘ভগবান’ বলা হয়!
উত্তর: ব্রহ্মা ও শিব ভগবানের স্বাংশ প্রভাববিশিষ্ট বিভিন্নাংশ, অর্থাৎ তাঁরা প্রায় ভগবানের মতো প্রভাবসম্পন্ন। তাই তাঁদের ভগবানের মতোই শক্তিশালী মনে হয়। সৃষ্টি ও সংহারের জন্য ভগবান তাঁদের সেই শক্তি প্রদান করেছেন; তাঁদের সেই অধিকার দিয়েছেন, তাই তারা হলেন আধিকারিক দেবতা। যেহেতু তাঁরা প্রায় ভগবানের মতো শক্তিসম্পন, তাই সম্মানার্থে তাঁদেরকেও অনেক সময় ‘ভগবান’ সম্বোধন করা হয়। তাছাড়া কোনো কোনো কল্পে ভগবান নিজেই ব্রহ্মা হন এবং সদাশিব বিষ্ণু থেকে অভিন্ন, সেজন্য শাস্ত্রে ব্রহ্মা ও শিবকে কোথাও কোথায় পরমেশ্বর ভগবানরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান কল্পে গুণাবতার শিব ও ব্রহ্মা আধিকারিক দেবতা এবং ভগবানের আজ্ঞাবহ।
প্রশ্ন: বিষ্ণু পরমেশ্বর হলে ব্রহ্মাকে কেন সৃষ্টিকর্তা বলা হয়? মূল সৃষ্টিকর্তা কে — ব্রহ্মা নাকি বিষ্ণু?
উত্তর: ভগবান বিষ্ণু তাঁর মায়াশক্তি দ্বারা জড়জগৎ সৃষ্টির উপাদান ও ব্রহ্মাণ্ডসমূহ সৃষ্টি করেন; জীবাত্মাসমূহও তাঁর থেকেই প্রকাশিত হয়। তিনিই সৃষ্টির প্রারম্ভে মহাকালরূপ জ্যোতির্লিঙ্গ তথা শিবরূপে প্রকটিত হন। এমনকি ব্রহ্মাকেও তিনিই সৃষ্টি করেন। তারপর ব্রহ্মা বিষ্ণুর নির্দেশে তাঁরই দ্বারা শক্তিপ্রাপ্ত হয়ে, সৃষ্টির উপাদানগুলো দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত সমস্ত গ্রহ -নক্ষত্র সমন্বিত চতুর্দশ ভুবন, দেবদেবী, বিভিন্ন প্রজাতির জীবদেহ ইত্যাদি সৃষ্টি করেন। সুতরাং ব্রহ্মা হলেন গৌণ সৃষ্টিকর্তা; মুখ্য সৃষ্টিকর্তা হলেন ভগবান বিষ্ণু।
প্রশ্ন: ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব — এই তিনজনের মধ্যে গুণগত বা শক্তিগত পার্থক্য আছে কি?
উত্তর: ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব — এই তিনজনের মধ্যে গুণগত বা শক্তিগত পার্থক্য অবশ্যই আছে। নিচে এই তিন সত্তা সম্পর্কে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলো:
ব্রহ্মা: ব্রহ্মা জড়া প্রকৃতির রজোগুণের অধীশ্বর। ব্রহ্মসংহিতায় (৫.৪৯) বলা হয়েছে, সূর্য যেমন মণিতে নিজের তেজ আংশিক প্রকাশ করেন, তেমনি পরমেশ্বর গোবিন্দ পুণ্যবান জীবের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করে ব্রহ্মারূপে সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করান। তাই ব্রহ্মা সাক্ষাৎ ঈশ্বর নন, বরং তাঁর শক্ত্যাবিষ্ট প্রতিনিধি এবং আধিকারিক দেবতা।
ব্রহ্মা দুই প্রকার — কখনো কোনো উপযুক্ত জীব শক্তি প্রাপ্ত হয়ে ব্রহ্মা হন; আবার কখনো এমন যোগ্য জীব না থাকলে, ভগবান নিজেই অংশরূপে ব্রহ্মা হন (চৈ.চ. ম. ২০.৩০৫)। ব্রহ্মসংহিতা (৫.১৫) অনুসারে, বিষ্ণুর দক্ষিণাংশ থেকে হিরণ্যগর্ভ নামে প্রজাপতি (ব্রহ্মা) প্রকাশিত হন। তিনিই প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডের ব্রহ্মার মূলতত্ত্ব।
ব্রহ্মার মধ্যে জীবের পঞ্চাশটি গুণ সাধারণ জীব অপেক্ষা অধিকভাবে এবং তার অতিরিক্ত আরো পাঁচটি গুণ আংশিকভাবে বর্তমান; শিবে এই গুণাবলি আরো উচ্চমাত্রায় থাকায়, শিবের ঈশ্বরত্ব ব্রহ্মার চেয়ে অধিক।
বর্তমান কল্পের ব্রহ্মা ভগবানের শক্ত্যাবিষ্ট জীব। গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে তাঁর জন্ম। তাঁর আয়ু ১০০ ব্রহ্মবর্ষ (পৃথিবীর হিসাবে বহু কোটি বছর), যার ৫০ বছর ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে। সুতরাং, ব্রহ্মা পরমেশ্বর ভগবান নন, ভগবানের শক্তির এক প্রকাশমাত্র — এ বিষয়ে শাস্ত্রসম্মত সিদ্ধান্ত সুস্পষ্ট ও নিরবিবাদ।
বিষ্ণু: সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র বিষ্ণু বা নারায়কেই পরমব্রহ্ম, পরমেশ্বর ও ভগবান রূপে কীর্তন করে। মূলত, শ্রীকৃষ্ণই গোলোকে মাধুর্যভাবে গোপবালকরূপে এবং বৈকুণ্ঠে ঐশ্বর্যভাবে নারায়ণরূপে বিরাজমান। নারায়ণ শ্রীকৃষ্ণের স্বাংশ প্রকাশ, যেমন একজন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় ভিন্ন সাজে প্রকাশ পেলেও মূলত অভিন্ন, তেমনই নারায়ণ ও শ্রীকৃষ্ণ অভিন্ন। এই তত্ত্ব ব্রহ্মসংহিতা (৫.১) ও (৫.৪৬) — এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে: “ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ...” এবং “দীপার্চিরেব হি দশান্তরম...” এই শ্লোকগুলো বোঝায় যে, শ্রীকৃষ্ণই পরম ঈশ্বর এবং তাঁর স্বাংশরূপে নারায়ণ বা বিষ্ণু প্রকাশিত হন, যেমন মূল দীপ থেকে বহু দীপ প্রজ্বলিত হয়।
বিষ্ণু তত্ত্বের প্রকাশধারা এইরূপ: শ্রীকৃষ্ণ-বলরাম — প্রথম চতুর্ব্যূহ (বাসুদেব, সংকর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ)-মহাসংকর্ষণ-নারায়ণ -দ্বিতীয় চতুর্ব্যূহ — মহাবিষ্ণু (কারণোদকশায়ী)- গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু-ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণু।
মহাবিষ্ণুর নিঃশ্বাসে তাঁর লোমকূপ থেকে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি হয় (ব্রহ্মসংহিতা ৫.৪৮)। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে তিনি গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে প্রবেশ করেন এবং সেই গর্ভজলে শয়ন করেন। তাঁর নাভিপদ্ম থেকে ব্রহ্মার জন্ম, ব্রহ্মার ভ্রম্ন-যুগলের মধ্য থেকে রুদ্রের তথা শিবের জন্ম। এরপর, ভগবান ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুরূপে হৃদয় — অন্তঃস্থ পরমাত্মা রূপে অবস্থান করেন এবং গুণাবতার বিষ্ণু হিসেবেও প্রকাশিত হন। তিনি মায়াতীত, সত্ত্বগুণের অধীশ্বর।
বিষ্ণু সর্বদা বিশুদ্ধসত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত স্বাংশ-বিলাস তত্ত্ব। তিনি মায়ার দ্বারা প্রভাবিত নন, বরং মায়ার অধীশ্বর। তিনি শ্রীকৃষ্ণের বিলাসমূর্তি। অনন্ত গুণধর শ্রীকৃষ্ণের ৬৪ গুণের মধ্যে ৬০টি দিব্য গুণ পূর্ণরূপে তাঁর মধ্যে প্রকাশিত। রাম, নৃসিংহ, বামন প্রভৃতি স্বাংশ অবতাররূপে তিনিই লীলাবিলাস করেন।
সারাংশে, বিষ্ণু কোনো সাধারণ দেবতা নন; তিনি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বাংশ প্রকাশ এবং মায়াতীত পরমেশ্বর।
শিব: শিবের দুই প্রকার প্রকাশ — ১. সদাশিব এবং ২. রুদ্রশিব। সংহারকারী রুদ্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গুণাবতার। তিনি সদাশিবরূপী বিষ্ণুর অংশ। বৈকুণ্ঠধামে বিরাজিত সদাশিব নিগুর্ণ এবং স্বয়ংরূপ শ্রীকৃষ্ণেরই অঙ্গবিশেষ। এই সদাশিব গুণাবতার-শিবের অংশী, অতএব ব্রহ্মা হতে শ্রেষ্ঠ এবং বিষ্ণুর সাথে সমান।
ব্রহ্মসংহিতা ও অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে, শিব মূলতত্ত্বে ভগবত্তত্ত্ব। বৈকুণ্ঠের অন্তর্গত শিবধামে বিষ্ণুই সদাশিবরূপে অবস্থান করেন। তাই বিষ্ণু ও সদাশিবে মূলত কোনো ভেদ নেই। অর্থাৎ, সদাশিব মূলত বিষ্ণুই। কেবল অপরিণত ভক্তরাই সদাশিব ও বিষ্ণুতে ভেদ দর্শন করে বিতর্কের সৃষ্টি করে। গুণাবতার-শিবের অংশী এই বিষ্ণুতত্ত্ব-সদাশিবই বৃন্দাবনে ‘গোপেশ্বর’ নামে খ্যাত। তিনি শুদ্ধবৈষ্ণবগণের দ্বারা পূজিত। এমনকি তামসশাস্ত্রেও শিব সম্পর্কে যে পরতত্ত্বসূচক শব্দাদি প্রযুক্ত হয়েছে, তা প্রকারান্তরে সদাশিবরূপী বিষ্ণু সম্পর্কেই প্রযুক্ত।
কপূর্রের ন্যায় গৌরবর্ণ সদাশিব গুণাতীত পরমেশ্বর। তিনি জন্মমৃত্যুর অতীত। কিন্তু জড়জগতের সৃষ্টির জন্য মহাবিষ্ণুর ইচ্ছায় শিব যখন শম্ভু বা রুদ্র রূপে প্রকাশিত হন, তখন তাঁর সেই রূপ পরমেশ্বরের সঙ্গে যুগপৎ ভেদ ও অভেদ তত্ত্ব। তিনি স্বতন্ত্র ঈশ্বর নন। আবার যেহেতু তাঁর মধ্যে সাধারণ জীবের পঞ্চাশটি গুণের অতিরিক্ত কিছু গুণাবলি (যেমন — সর্বজ্ঞ) এবং ব্রহ্মা অপেক্ষাও অধিক কিছু গুণাবলি বিদ্যমান, তাই তাঁকে সরাসরি জীবও বলা যায় না। বিষ্ণুতত্ত্ব — প্রকাশসমূহকে বলা হয় স্বাংশ এবং জীবকে বলা হয় বিভিন্নাংশ। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভাষায় — শ্রীশিব তথা রুদ্র হলেন স্বাংশ প্রভাববিশিষ্ট বিভিন্নাংশ, অর্থাৎ স্বয়ং ভগবানের দ্বারা প্রভাবিত এক বিশেষ সত্তা।
প্রশ্ন: সদাশিব ভগবান বিষ্ণু থেকে অভিন্ন হলে তাঁকে বৈষ্ণব বলা হয় কেন?
উত্তর: সদাশিব বা রুদ্র উভয় রূপেই শিবের মধ্যে ভক্তভাব বিদ্যমান; ঠিক যেমন অদ্বৈতাচার্য, অনন্তদেব ও বলরামের মধ্যে ভক্তভাব। তেমনই, সদাশিব বিষ্ণু থেকে অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও ভক্তভাবহেতু তিনি সর্বদা সংকর্ষণরূপী বিষ্ণুর ধ্যানে নিমগ্ন থাকেন; বিষ্ণুর সন্তুষ্টির জন্য তিনি কঠোর বৈরাগ্যপূর্ণ জীবন যাপন করেন। সেকারণে শাস্ত্র বলে — বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভূ — অর্থাৎ বৈষ্ণবগণের মধ্যে শিবই শ্রেষ্ঠ। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণবরূপে অন্য বৈষ্ণবগণের দ্বারা পূজিত হন।
প্রশ্ন: শাস্ত্রে নাকি বলা আছে — যখন কিছুই ছিল না, তখন শিব ছিলেন; তাহলে কি শিবই সকলের আদি পরমেশ্বর নন?
উত্তর: এই মন্ত্রে ‘শিব’ অর্থ মঙ্গলময় পরমেশ্বর — তিনি ছিলেন, তিনি আছেন এবং তিনিই থাকবেন। শাস্ত্রে এটাও বলা হয়েছে — যখন কিছুই ছিল না, তখন বিষ্ণু বা নারায়ণ ছিলেন। এবার যদি বলা হয় — এই মন্ত্রে ‘নারায়ণ’ অর্থ, যিনি জলে শয়ন করে আছেন; নিশ্চয়ই শিব জলে শয়ন করে থাকেন না, তিনি থাকেন কৈলাশে; জলে থাকেন নারায়ণ তথা বিষ্ণু। সুতরাং, আদিতে শিব ছিলেন — এই বাক্যে শিব শব্দেও নারায়ণকেই বোঝায়। তাই নয় কি? অতএব, নারায়ণই আদি পরমেশ্বর, আর তিনিই সদাশিব।
আবার, শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকেও বলা হয়, অনাদির আদি গোবিন্দ। শ্রীকৃষ্ণই বৈকুণ্ঠে নারায়ণ এবং মহেশধামে তিনিই সদাশিব। তাই সদাশিব, নারায়ণ, বিষ্ণু, কৃষ্ণ — যে নামেই বলা হোক, তাঁরা এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর। তাঁর রূপ নিত্য; কখনো প্রকাশিত, কখনো অপ্রকাশিত। অতএব, আদিতে শিব ছিলেন অথবা নারায়ণ বা কৃষ্ণ ছিলেন — যেভাবেই বলা হোক, একজনকেই বোঝায়। এটাই পরম সত্য।
প্রশ্ন: শাস্ত্রে কোথায় বলা হয়েছে যে বিষ্ণু বা কৃষ্ণই সর্বোচ্চ, আর ব্রহ্মা—শিব তাঁর অধীন?
উত্তর: মহাভারতে স্পষ্টই আছে কৃষ্ণই নারায়ণ বা বিষ্ণু, ব্রহ্মারূপে তিনি সৃষ্টিকর্ত, শিবরূপে তিনিই সংহারকর্তা। “একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, সাধ্যগণ, বিশ্বেদেবগণ, বায়ুগণ, ব্রহ্মা, দেবমাতা অদিতি, সপ্তর্ষি — তাঁরা সকলেই এক কৃষ্ণ হতেই উৎপন্ন হয়েছে — (মহাভারত, অনুশাসন পর্ব — ১৩৬.৩৪)। ভাগবত বলে, সমস্ত অবতার শ্রীকৃষ্ণের অংশ, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান — কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং। ব্রহ্মসংহিতায় ব্রহ্মা নিজেই বলেছেন — শ্রীকৃষ্ণই আদিপুরুষ, অন্য সকল দেবতাই তাঁর আজ্ঞাবহ। ভগবদ্গীতা অনুসারেও শ্রীকৃষ্ণই পরমতত্ত্ব। সর্বোপরি, বেদ (ঋগ্বেদ ১.২২.২০) বলে — তদ্বিষ্ণো পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্। অথার্ৎ বিষ্ণুই পরম পদ, দেবতারা সর্বদাই তাঁর দর্শনাকাক্সক্ষী; শ্রীকৃষ্ণই বিষ্ণু এবং বেদে (ঋগ্বেদ ১.১৫৪.৬ ও শুক্লযজুর্বেদে ৬.৩) ভগবানের ধাম প্রসঙ্গে গোলোক তথা কৃষ্ণলোকেরই বর্ণনা রয়েছে। বিষ্ণু তথা কৃষ্ণই পরমতত্ত্ব — এমন বহু শাস্ত্রপ্রমাণ রয়েছে। অতএব, বিষ্ণু বা কৃষ্ণই সর্বোচ্চ, সকলেই তাঁর অধীন। শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তার শাস্ত্রপ্রমাণ অমৃতের সন্ধানে জুলাই-সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় দেখুন।
প্রশ্ন: বিষ্ণুর ভক্তরা কি শিবের পূজা করেন না? আবার শৈবরা কি বিষ্ণুকে সর্বোচ্চ মানেন না?
উত্তর: বিষ্ণুর ভক্তরা অবশ্যই শিবের পূজা করেন। শিবের মধ্যে সর্বদা ভক্তভাব। তাই বিষ্ণুর ভক্তরা শিবকে পরম বৈষ্ণবজ্ঞানে পূজা করে তাঁর কাছে কৃষ্ণভক্তি প্রার্থনা করেন। যথার্থ বৈষ্ণব বা শৈব সদাশিব ও বিষ্ণুতে ভেদ দর্শন করেন না। যদি উভয়ে একই হন, তাহলে শিবকে সর্বোচ্চ মানা মানে বিষ্ণুকেই সর্বোচ্চ মানা। অতএব, আদর্শ শৈব অবশ্যই বিষ্ণুকে সর্বোচ্চ মানেন।
প্রশ্ন: শিব যদি ভগবানের অংশ হন, তাহলে কেন তাঁকে তামসিক বলা হয়? শাস্ত্রে তো গুণাতীত পরমেশ্বরের কথা বলা হয়!
উত্তর: শিব তমোগুণের নিয়ন্তা। তমোগুণাচ্ছন্ন জীবদের আশ্রয় দানের জন্য এবং তাদের কাছে সহজসাধ্য হওয়ার জন্য তাঁকে কখনো কখনো তমোগুণাচ্ছন্ন মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিব গুণাতীত।
প্রশ্ন: শিব ও বিষ্ণুর মাঝে সম্পর্ক কেমন?
উত্তর: শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে মধুর সম্পর্ক। তাই শাস্ত্রে একে অপরের স্তুতি বা প্রশংসা করতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও শিবকে বিষ্ণুর সখা বলেও উল্লেখ পাওয়া যায়। অবশ্যই সেই সখ্যতা দাস্যভাবযুক্ত। অধিকন্তু, বিষ্ণুই শিব রূপে প্রকাশিত হন। আবার, ব্রহ্মসংহিতা অনুসারে, তাদের সম্পর্ক দুধ ও দইয়ের মতো। দুধ যেমন বিকারবিশেষ যোগে দই হয়, তেমনই কার্যবশত কৃষ্ণ বা বিষ্ণুই শম্ভুতা প্রাপ্ত হন।
প্রশ্ন: শিবলিঙ্গ কী? কেন পূজনীয়?
উত্তর: লিঙ্গ অর্থ চিহ্ন বা প্রতীক। শিবলিঙ্গ শিবের প্রতীকী রূপ। তাই শিবলিঙ্গে ত্রিপুণ্ড্র তিলক অংকন করা হয়। সৃষ্টির প্রারম্ভে মহাবিষ্ণুর চিন্ময় দৃষ্টিপাতের ফলে স্তম্ভসদৃশ এক জ্যোতির্ময় সত্তা প্রকাশিত হয়, পরবর্তীকালে সেই স্তম্ভাকৃতিই শিবের প্রতীক তথা শিবলিঙ্গরূপে পূজিত হয়। এই প্রতীক বা চিহ্ন শিব থেকে অভিন্ন এবং তা নির্মাণ করাও সহজসাধ্য। তাই আশুতোষ শিবের ভক্তরা অনেক ক্ষেত্রে এই রূপেই তাঁর পূজা করে থাকেন।
চলবে...