ক্ষমার নীতি
অনেক সময় মানুষ স্বার্থসিদ্ধির আশায় অন্যের ক্ষতিসাধনে পিছপা হয় না। এটি একপ্রকার মূঢ়তা। বিচারবুদ্ধি যখন সৎ কাজে প্রয়োগ না হয়, তখন অন্যের অমঙ্গল ঘটাই স্বাভাবিক। এই কর্ম প্রবণতা যদি বারবার ঘটতে থাকে, তবে তা একসময় মহাত্মাদের চরণে গর্হিত অপরাধে পরিণত হয় এবং অপরাধীর নিশ্চিত অধঃপতন ঘটে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায়, অপরাধীকে তার অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে, হৃদয় থেকে ক্ষমা করার গুণ অর্জন করা আবশ্যক। এই প্রবন্ধে ক্ষমার নীতিসমূহ এবং তা পালনের মাধ্যমে জীবনে সম্ভাব্য পরিবর্তনের দিক আলোচনা করা হয়েছে।
অপরাধের গোড়াপত্তন
অপরের অকল্যাণ চিন্তা, নিন্দা, অবজ্ঞা এবং হীন কর্মের মাধ্যমে অপরাধের সূচনা ঘটে। যদি এই কর্ম মহাত্মাদের বিরুদ্ধে হয়, তবে তার পরিণতি জীবনে চিরস্থায়ী দুঃখ ডেকে আনে। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের চতুর্থ স্কন্ধে, প্রজাপতি দক্ষের কাহিনিতে। যথার্থ জ্ঞানের অভাবে দক্ষ, বৈষ্ণব চূড়ামণি শিবের মাহাত্ম্য বুঝতে ব্যর্থ হয়ে তাঁকে যজ্ঞে অবমাননা করেন। শিবপত্নী সতী দেবী এই অপমান সহ্য করতে না পেরে অগ্নিতে আত্মবিসর্জন দেন। এর ফলে দক্ষ গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হন এবং শিবের অনুচরগণ যজ্ঞস্থলে এসে যজ্ঞ পণ্ড করে তার মস্তক ছিন্ন করে ফেলেন। কিন্তু শিব দক্ষকে ক্ষমা করেন এবং ছাগমুণ্ড দ্বারা দক্ষের পুনর্জীবন দান করেন।
অপরাধ সংঘটনের কারণসমূহ
সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া, অপর্যাপ্ত জ্ঞান, সময় সচেতনতার অভাব, অমনোযোগিতা এবং কর্মে নিষ্ঠার অভাব — এসবই অপরাধ সংঘটনের মূল কারণ। বিচার করার আগে বিচার্য বিষয় সম্পূর্ণরূপে জানা আবশ্যক; নতুবা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ক্ষমা গুণ: একটি মহৎ গুণ
অনেকেই মনে করেন, সম্পদ, অনুসারী, বিদ্যা, বংশগৌরব বা শারীরিক সৌন্দর্যই মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য। কিন্তু উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি জানেন, প্রকৃত সৌন্দর্য গুণে নিহিত। ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবত (৯.১৫.৪০) — এর ব্যাখ্যায় চাণক্য পণ্ডিতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন:
— কোকিল মধুর কণ্ঠের জন্য সুন্দর
— স্ত্রী সতীত্বে সুন্দর
— শূদ্র বিশ্বস্ততায় সুন্দর
— বৈশ্য গোরক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নতিতে সুন্দর
— ক্ষত্রিয় বীরত্বে সুন্দর
— ব্রাহ্মণ ক্ষমার গুণে সুন্দর
সৌন্দর্যের বাহ্যিক ব্যাখ্যা দিয়ে গুণহীন প্রশংসা করা কেবল মূল্যবান সময়ের অপচয় এবং কখনো তা হিতের বিপরীতও হতে পারে। প্রকৃত সম্মান তাদেরই প্রাপ্য, যাঁরা ক্ষমাশীল। কারণ, ক্ষমাশীলদের প্রতি ভগবান স্বয়ং প্রসন্ন হন — “ক্ষমিণামাশু ভগবাংস্তুষ্যতে হরিরীশ্বরঃ।”
ক্ষমা প্রার্থনার মনোভাব
কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বপ্রথম তা স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়া জরুরি। অপরাধ কার প্রতি হয়েছে, কেন হয়েছে এবং তা কীভাবে এড়ানো যেত — এসব বিষয়ে উপলব্ধি আবশ্যক। একই ভুল পুনরাবৃত্তি না করার সংকল্প ও সতর্কতা অপরিহার্য। অপরাধীর কর্তব্য হলো বিনম্রভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা — সরাসরি না পারলে অন্তত বার্তা পাঠিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে।
দক্ষের যজ্ঞের সময়ে দেবতারা শিবের অবমাননায় মৌন থেকে অপরাধী হন। পরে ব্রহ্মার পরামর্শে তাঁরা শিবের শরণ নেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, “শুদ্ধ চিত্তে শরণ নিলে শিব সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করেন।”
বৈষ্ণবরা সহজেই ক্ষমা করেন। তবে কেবল মৌখিক অনুতাপ যথেষ্ট নয়; অনুতপ্ত হৃদয় থেকে তাঁদের গুণগান করা এবং তাঁদের সেবায় নিয়োজিত হওয়াই প্রকৃত মহিমা কীর্তন। শরণাগত হয়ে অনুশোচনাই প্রকৃত ক্ষমা প্রার্থনা।
ক্ষমা প্রদর্শনের নীতি
ভুল কেবল কনিষ্ঠরাই করেন না — “আব্রহ্ম স্তম্ভ পর্যন্তম্ — ব্রহ্মলোক পর্যন্ত সকলেই মায়ার দ্বারা আক্রান্ত। তাই ভুল হতেই পারে। অপরের ভুল দেখে তাঁর প্রতি অহংকার বা ঘৃণা নয়, বরং ভাবা উচিত ভগবানের পরিকল্পনায় এতে আমাদের কোনো শিক্ষার উপলক্ষ রয়েছে।
পরীক্ষিত মহারাজের দৃষ্টান্তে দেখা যায় — তাঁর প্রতি ব্রাহ্মণের অভিশাপ সত্ত্বেও তিনি প্রতিক্রিয়া করেননি, কারণ ভাগবতের প্রকাশ তারই মাধ্যমে হবে। আবার, যখন কোনো জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ভুল করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তখন তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।
মহাদেব যখন ব্রহ্মাকে প্রণাম করেছিলেন বা বামনদেব কশ্যপ মুনিকে, শ্রীকৃষ্ণ নন্দ—যশোদা ও যুধিষ্ঠিরকে প্রণাম করেছিলেন — এসব দৃষ্টান্ত শাস্ত্রজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এগুলোর মাধ্যমে শিক্ষা মেলে — জ্যেষ্ঠদের প্রতি বিনম্রতা প্রদর্শন সর্বদাই শ্রেয়।
ক্ষমা করার মনোভাব
অজ্ঞতা ও সূক্ষ্ম অহংকার মানুষকে ক্ষমাশীলতার গুণ থেকে বঞ্চিত করে। মনে রাখতে হবে, যারা ভুল করেন, তারা মায়ার দ্বারা প্ররোচিত। তাই প্রতিশোধ নয়, করুণা দেখানোই ভক্তের ধর্ম। যেমন, পরীক্ষিৎ মহারাজ অভিশাপ পেয়েও প্রতিশোধ নেননি (ভাগবত ১.১৮.৩৮)।
ভক্তগণ সাধারণত প্রতিক্রিয়া দেখান না কারণ:
— তাঁরা অপরাধ গুরুতরভাবে গ্রহণ করেন না, যেন অপরাধীর অধঃপতন না হয়
— ত্রিগুণে প্রভাবিত নয় বলে অপরের দোষ-গুণে বিচলিত হন না
— তাঁরা করুণার সাগর, অপরাধীর প্রতি কৃপা বর্ষণ করেন
— কনিষ্ঠদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনই তাঁদের স্বভাব
— অপরাধ ক্ষমা করলে অপরাধীর সংশোধনের সুযোগ হয়
— ক্ষমাকারীর মহিমা বৃদ্ধি পায়
ক্ষমা কেবল অপরাধীকেই নয়, ক্ষমাকারীকেও শুদ্ধ করে। এতে অহংকার দূর হয় এবং হৃদয়ে বিনম্রতা গড়ে ওঠে। সঠিক মনোভাব নিয়ে ক্ষমা করতে পারলে মানুষের চরিত্র পরিশুদ্ধ হয় এবং সে ভগবানের কৃপা লাভে যোগ্য হয়ে ওঠে। — হরেকৃষ্ণ