প্রতিদিনের সংবাদপত্রে আমরা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ও অবৈধ সম্পর্কের খবর পড়ে ক্লান্ত। রাজনীতিবিদরা বলেন, “নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা চাই।” কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কি আগে থেকেই সঠিক ও ভুলের পার্থক্য জানে না? নিশ্চয়ই জানে। তারা কেবল ভাবে যে, নৈতিক নিয়ম না মেনে চললে জীবনে আরো সুবিধা পাওয়া যাবে। নীতিবিদদের উপদেশ বা রাজনীতিবিদদের আইন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে অনুপ্রাণিত করে না।
নিয়ম মানা-কেন?
নীতিমালায় চলার অর্থ হলো যেভাবে ট্রাফিক আইন মানলে পথ চলা সুরক্ষিত ও মসৃণ হয়, ঠিক তেমন। কিন্তু কেউ তো কেবল আইন মানতেই ভ্রমণ করে না; উদ্দেশ্য থাকে গন্তব্যে পৌঁছানো। যদি পথিক মনে করে যে, ট্রাফিক আইন মানা তার গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে, তাহলে সে সুযোগ পেলে আইন ভাঙবে।
নীতিমালাও সমাজে কৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শেখায় না জীবনের লক্ষ্য কী বা সামাজিক লেনদেনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কী। ফলে অনেকে হয়তো সংস্কার বা ঐতিহ্যের কারণে নৈতিক থাকে, কিন্তু তারাই আবার লোভ বা বিপদের মুখে পড়ে সেই নৈতিকতা ত্যাগ করে।
অথচ আজকের ভোগবাদী সমাজে খ্যাতি, ধন, ভোগ, ক্ষমতা, আরাম, মর্যাদা সহ যেসব বিষয়কে অতিমাত্রায় প্রশংসা করা হয়, সেগুলো অর্জনের পথেই তো মানুষ নৈতিকতা ভঙ্গ করতে প্রলুব্ধ হয়। ভগবদ্গীতা (১৬.৮-১৫) বলছে, বস্তুবাদী মনোভাব লোভ ও কামনায় মানুষকে ঠেলে দেয়, যার ফলে আসে দুর্নীতি। উপরন্তু, ঈশ্বরহীন শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শেখায় না যে মহাজাগতিক এক নৈতিক প্রতিদান ব্যবস্থাও আছে। শাস্তির ব্যবস্থাও যখন অকার্যকর — তখন নৈতিকতা অবান্তর মনে হয়, বিশেষ করে সুচতুর বা ক্ষমতাবানদের কাছে।
এই পরিস্থিতিতে কেবল ভাষণ বা আইন দিয়ে কি মানুষকে নৈতিক করা সম্ভব?
প্রেম নৈতিকতার ভিত্তি
“নৈতিকতা মানে সুযোগের অভাব” — এই কথাটি প্রমাণ করে আজকের ব্যবহারিক, সুবিধাবাদী নৈতিকতার দীনতা। প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্র বলে — আত্মিকতা ছাড়া নৈতিকতা টিকতে পারে না। তাই সত্যিকারের নৈতিক সমাজ গড়তে হলে প্রয়োজন আধ্যাত্মিক শিক্ষার, যার কেন্দ্রবিন্দু হবে জীবনের একটি ইতিবাচক লক্ষ্য।
শাস্ত্রে বলা আছে, জীবনের লক্ষ্য হলো ঈশ্বরপ্রেম অর্জন। আমরা প্রত্যেকে আত্মা — এক অনন্ত প্রেমময় সম্পর্ক আছে আমাদের ও পরম করুণাময়ের মাঝে। আসল আনন্দ আসে এই ঈশ্বরপ্রেম জাগ্রত হলে। আর ঈশ্বরকে ভালোবাসলে, তাঁর সৃষ্ট সকল জীবকেই আমরা ভালোবাসতে শিখি। সেই প্রেম থেকে আসে সেবা ও সহানুভূতির মনোভাব, যা একটি পারস্পারিক বিশ্বাস ও উষ্ণতায় ভরা নৈতিক সমাজ গঠনের পথ খুলে দেয়।
একেবারে প্রাথমিক স্তরের আত্মিক সাধনাও আমাদের ভিতরের অন্তর্জ্ঞানকে জাগ্রত করে। তখন আমরা বুঝতে পারি — ঈশ্বরই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণকামী। তাই নৈতিকতা তখন আর চাপ নয়, বরং ভালোবেসে ও আনন্দের সঙ্গে পালনযোগ্য একটি আদর্শ হয়ে ওঠে। এটা কল্পনা নয়, বাস্তবতা।
অনেকেই বলবে — “এসব কথা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বিজ্ঞানের সাথে তো ঈশ্বরতত্ত্ব মেলে না।” কিন্তু বিজ্ঞান কি কখনো প্রমাণ করতে পেরেছে যে ঈশ্বর বা আত্মা নেই? না। বরং বহু বিজ্ঞানীও আজ স্বীকার করেন যে, সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করলে মহাবিশ্বে এক সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতির প্রমাণ মেলে।
ঈশ্বরপ্রেম যদি কল্পনাই হতো, তাহলে মহান ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীন রূপে তা এত যুক্তিবদ্ধ ও পরীক্ষিতভাবে লিপিবদ্ধ হতো না। প্রার্থনা, ধ্যান, ঈশ্বরনাম সংকীর্তন প্রভৃতি সহযোগে প্রকৃত সাধনার মাধ্যমে যে কেউ ঈশ্বরের প্রেমময় সান্নিধ্য পেতে পারে।
উচ্চতর নৈতিকতা
কেউ হয়তো বলবেন — “কৃষ্ণ তো নিজেই নৈতিকতা ভঙ্গ করেন! তাঁর ভক্তরাও তাই করেন। তাহলে কৃষ্ণের আরাধনায় নৈতিকতা শেখা যাবে কীভাবে?”
এই প্রশ্নের উত্তরে বোঝা দরকার-নৈতিকতার উদ্দেশ্য কী?
আমরা এই বস্তুজগতের অন্ধকারে পথ হারিয়েছি। নৈতিক বিধান হচ্ছে টর্চের আলো, যা আমাদের সঠিক পথে রাখে, যাতে আমরা ঈশ্বরপ্রেমের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি। কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং সেই সূর্য, যার আলোয় সমস্ত নৈতিকতা প্রকাশ পায়। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ; তাঁর কোনো স্বার্থপরতা নেই। তিনি যে কাজই করেন, তা নিঃস্বার্থ প্রেমবশতই করেন।
আমাদের নৈতিকতা ধারণ বা অবলম্বন করতে হয়, কারণ আমাদের মধ্যে কামনা-লোভ-অহঙ্কার থাকে। কৃষ্ণ এসবের ঊর্ধ্বে। তাই তাঁর কাজকে আমাদের সাধারণ নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করা বোকামি-সূর্যকে টর্চ দিয়ে খোঁজার মতো।
উদাহরণস্বরূপ, বৃন্দাবনে কৃষ্ণ যখন মাখন চুরি করেন, তখন তিনি প্রভু নন, এক দুষ্টুমি করা শিশু। সেই দুষ্টুমি তাঁর মা যশোদা ও গোপীদের সাথে প্রেমের সম্পর্ককে মধুরতর করে তোলে। এমনকি তাঁর রাধা ও গোপীদের সঙ্গে প্রেমলীলা শারীরিক নয়, আত্মিক। যারা সংসার আসক্তি পরিত্যাগ করে কৃষ্ণের লীলার স্তব করে, তারা যদি তা কামনাবশত করত, তাহলে সংসার ত্যাগ করত না।
আর কুরুক্ষেত্রে যখন কৃষ্ণ পাণ্ডবদের ‘নীতিবিরোধী’ কৌশল অবলম্বন করতে বলেন, তা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য। যেমন পুলিশের গাড়ি ট্রাফিক আইন ভেঙে অপরাধী ধরতে পারে, কারণ তা আইনের রক্ষার জন্য।
সাধারণত ভক্তরা নৈতিক আচরণে শ্রদ্ধাশীল থাকেন, সেটাই তাদের ভক্তির প্রকাশ। কিন্তু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে, ঈশ্বরের ইচ্ছাপূরণে তাঁরা নৈতিকতার বাহ্যিক রূপ ভাঙতেও পারেন — যদি তা বৃহত্তর কল্যাণের জন্য হয়।
তাই চিৎকার করে ‘নৈতিক হও’, আইন করে ‘ভালো থাকো’ বললেই সমাজ ঠিক হবে না। যতক্ষণ মানুষ ভোগের লক্ষ্যে বাঁচবে, ততক্ষণ নৈতিকতাও তাদের কাছে মূল্যহীন থাকবে। কিন্তু যখন মানুষ ঈশ্বরপ্রেমকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করবে, তখন নৈতিকতাও তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক, বাস্তব ও আনন্দদায়ক হয়ে উঠবে।
আমাদের সমাজে আজ দরকার আত্মিক শিক্ষার তথা কৃষ্ণভাবনামৃতের শিক্ষা, যাতে মানুষ বুঝতে পারে ভালোবাসা কাকে বলে, কাকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়, আর ভালো থাকার অর্থই আসলে কী। আর ব্যক্তি হিসেবে, আমরা যদি বুঝি নৈতিকতার আত্মিক ভিত্তি কী, তাহলে স্বার্থপরতা, ক্ষোভ বা অহংকার ছাড়াও আমরা সমাজের পরিবর্তনের বাহক হতে পারি।
একটি ক্যানসার আক্রান্ত শরীরে একটি সুস্থ কোষও রোগ নিরাময়ের সূচনা করতে পারে। তেমনই আজকের অসুস্থ সমাজে আমরা প্রত্যেকে যদি কৃষ্ণভাবনাময় আত্মিক ও নৈতিক জীবনযাপন করি, তবে সেই পুনর্জাগরণ আসতে বাধ্য। — হরেকৃষ্ণ
ভাষান্তর: সুদীপ দাস