দুর্গাপূজা  মায়ার অন্তরালে চিরন্তন সত্যের প্রকাশ
দুর্গাপূজা মায়ার অন্তরালে চিরন্তন সত্যের প্রকাশ
✍ সুদর্শন নিমাই দাস
১৩ আগস্ট ২০২৬
বর্ষ: 2025  |  ইস্যু: ৪র্থ সংখ্যা

দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মের শাক্ত উপাসনার প্রধানতম উৎসব। এটি কেবল ধমীর্য় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং দর্শন, আধ্যাত্মিকতা এবং সমাজ-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রতিফলন। ভারতীয় ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক। তিনি মহামায়া; শ্রীকৃষ্ণের মায়াশক্তির প্রকাশ। দুর্গাপূজা আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে পালিত সর্বজনীন একটি উৎসব। ঋগ্বেদ, মার্কণ্ডেয় পুরান, চণ্ডী এবং বিভিন্ন তন্ত্রগ্রন্থে দুর্গা পূজার শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিহিত রয়েছে।

পূজার কাল এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সাধারণত বছরে দু’বার দেবীর পূজা করার রীতি রয়েছে — (১) বাসন্তী পূজা (চৈত্র মাসে) এবং (২) শারদীয় পূজা (আশ্বিন মাসে)। ভগবান শ্রীরাম চন্দ্র লঙ্কায় যাওয়ার পূর্বে আশ্বিন মাসে দেবীর পূজা করেছিলেন বলে শোনা যায়, যা অকালবোধন নামে পরিচিত। পরবতীর্কালে তা শারদীয় পূজা হিসেবে সর্বজনীন রূপ পায়।

আচার-বিধান: দুর্গাপূজা একাধিক ধাপে সম্পন্ন হয় —

(১) মহালয়া- দেবীর আহ্বান চণ্ডীপাঠ

(২) ষষ্ঠী- বোধন ও অধিবাস

(৩) সপ্তমী-নবপত্রিকা প্রবেশ

(৪) অষ্টমী-কুমারী পূজা, সন্ধিপূজা

(৫) নবমী-মহারাজোপচার

(৬) দশমী-বিসর্জন

প্রতীকী ব্যাখ্যা:

(১) দশভূজা রূপ-দশ দিকের রক্ষাকত্রী, (২) সিংহ বাহন-শক্তি ও সাহসের প্রতীক, (৩) অস্ত্রসমূহ- ন্যায়, ধর্ম, সংযম ও জ্ঞানের প্রতীক, (৪) মহিষাসুর-অহংকার, লোভ ও অজ্ঞতার প্রতীক

কে এই দেবী দুর্গা: শাস্ত্রীয় ভিত্তি

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা: ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন — “মম মায়া দুরত্যয়া” (ভ.গী ৭.১৪) অর্থাৎ আমার মায়া অত্যন্ত দুরতিক্রম্য। এই মায়াশক্তিই দেবী দুর্গা।

শ্রীমদ্ভাগবত: শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণের দশম স্কন্ধে উল্লেখ আছে — কংস যখন দেবকীর অষ্টম সন্তানকে হত্যা করতে চাইলো, তখন দেবী যোগমায়া দুর্গারূপে প্রকাশিত হয়ে কংসকে বলেন, তার বধহেতু যিনি জন্মেছেন তিনি তখন অন্যত্র রয়েছেন। এই লীলায় দেবী দুর্গা শ্রীকৃষ্ণের ভগিণীরূপে প্রকাশিত হন।

শ্রী শ্রী চণ্ডী: শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে দেবীকে বার বার ‘মহামায়া’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এই মহামায়া হলেন শ্রীকৃষ্ণের শক্তি যিনি জীবকে মোহগ্রস্ত করেন।

   শাস্ত্রে দেবী দুর্গাকে দু’ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। জীব ভগবানের নিত্য দাস এবং তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভগবদ্ধাম তার নিত্য আলয় এবং ভগবৎ সেবা হচ্ছে তার বৃত্তি। কিন্তু যে মুহূর্তে জীব তার সেবা বৃত্তি ভুলে ভোগবাঞ্ছা করে, তখনই সে জড় জগৎরূপ দুর্গে পতিত হয়, যে দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী হচ্ছেন দেবী দুর্গা। কেউ যখন ভগবানকে ভুলে যায় দেবী তখন মহামায়ারূপে তাকে মোহগ্রস্ত করে রাখেন। এই মহামায়া হলেন শ্রীকৃষ্ণের বহিরঙ্গা শক্তি। আবার কেউ যদি ভগবানের ভক্তি করে পুনরায় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে চায়, তাহলে দেবী তাকে যোগমায়ারূপে সাহায্য করেন যাতে তিনি ভগবদ্ধাম প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। এই যোগমায়া হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা শক্তির প্রকাশ। তাই দেবী দুর্গা যোগমায়া বা মহামায়া, যে রূপেই প্রকাশিত হোন না কেন, তিনি আসলে শ্রীকৃষ্ণেরই শক্তি। অর্থাৎ দেবী দুর্গার আরাধনা মানে শ্রীকৃষ্ণের শক্তিরই আরাধনা।

   আজকের সমাজে দুর্গাপূজা কেবল উৎসবের আনন্দ নয়, এটি মানুষের অন্তরে সুপ্ত শক্তি জাগরণ, আসুরিক প্রবৃত্তির দমন এবং ভগবৎ চেতনার বিকাশ। দুর্গাপূজা আমাদের শিক্ষা দেয় — অশুভের ওপর শুভের বিজয়, অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয় এবং মায়ার অন্তরালে চিরন্তন সত্যের প্রকাশ। — হরেকৃষ্ণ

বিষাদযুদ্ধ জয়  ও ভগবদ্গীতার  প্রাসঙ্গিকতা
বিষাদযুদ্ধ জয় ও ভগবদ্গীতার প্রাসঙ্গিকতা
আর্য সভ্যতা
আর্য সভ্যতা
সনাতন ধর্মের মৌলিক পর্ব-৪ (ঈশ্বর রহস্য—২)
সনাতন ধর্মের মৌলিক পর্ব-৪ (ঈশ্বর রহস্য—২)
শ্রীকৃষ্ণই কি বেদের বিষ্ণু?
শ্রীকৃষ্ণই কি বেদের বিষ্ণু?
ক্ষমা
ক্ষমা