বর্ষ: 2025 | ইস্যু: ৩য় সংখ্যা
বৈদিক
শাস্ত্রের বিশাল সাহিত্যভাণ্ডারে ‘বিষ্ণু নামটি আবিভূর্ত হয় এক সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ,
সর্বোচ্চ ঈশ্বরস্বরূপ পরম সত্ত্বার নাম হিসেবে। অপরদিকে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ — একদিকে
যেমন শৈশব লীলায় মনোমুগ্ধকারী, তেমনই গীতার রণাঙ্গনে পরম জ্ঞান প্রদাতা—ভক্তের
হৃদয়স্পর্শী পরমেশ্বররূপে বিরাজমান। প্রশ্ন
জাগে: কৃষ্ণ ও বিষ্ণু—এই দুই রূপ কি আলাদা, না
কি একই পরম সত্তার দুই প্রকাশ? অজ্ঞতাবশত, কেউ আবার বেদের বিষ্ণু ও পুরাণের বিষ্ণুকে
আলাদা মনে করে। অথচ শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও ভক্তিসাহিত্যের অন্তর্নিহিত সুর যেন ধ্বনিত
করে এক গভীর সত্য — শ্রীকৃষ্ণই বেদের বিষ্ণু।
এই
প্রবন্ধে আমরা খোঁজ করব সেই চিরন্তন সত্যের, যেখানে বেদের দার্শনিক তত্ত্ব ও ভাগবতের
দর্শন মিলিত হয়ে প্রকাশ করে এক অনন্য ঐক্যবোধ। শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি, আচার্যদের ব্যাখ্যা
এবং ভক্তির আবহে আবিষ্কার করব—কেন ও কীভাবে শ্রীকৃষ্ণই
সেই পরম বিষ্ণু, যাঁর কথা বেদে — পুরাণে ঋষিরা গেয়েছেন, যাঁকে প্রেমে ডেকেছেন গোপীরা।
“শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর ভগবান: বেদে কোথায় আছে?”
শিরোনামে অমৃতের সন্ধানের জুলাই—আগস্ট—সেপ্টেম্বর
২০২৪ সংখ্যা থেকে দুটো সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছিল।
সেখানে বৈদিক শাস্ত্র থেকে শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তার অনেকগুলো প্রমাণ উল্লেখ করা হয়েছিল।
বেদের কিছু মন্ত্রে সরাসরি কৃষ্ণের নাম উল্লেখিত আছে, আবার কিছু মন্ত্রে বিষ্ণু বা
অন্য কোনো শব্দে কৃষ্ণের কথা উল্লেখিত আছে। সেই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল — বেদে বিষ্ণুরূপে
শ্রীকৃষ্ণেরই মহিমা কীর্তিত হয়েছে। প্রশ্ন হতে পারে, সেসমস্ত অনেক মন্ত্রে তো বিষ্ণু
শব্দ রয়েছে, কৃষ্ণ নাম নেই—এর সমাধান কী?
ভাগবতেও অনেকসময় কৃষ্ণকে বোঝাতে বিষ্ণু শব্দ ব্যবহৃত
হয়েছে। যথা: বিক্রীড়িতং ব্রজবধূভিরিদঞ্চ বিষ্ণোঃ (ভা. ১০/৩৩/৩৯)। প্রহ্লাদ মহারাজ
বলেছেন — মতির্ন কৃষ্ণে পরতঃ স্বতো বা (ভা. ৭/৫/৩০); আবার, তিনি পরের শ্লোকেই বলছেন
— ন তে গতি স্বার্থগতিং হি বিষ্ণুম্ (ভা. ৭/৫/৩১)। কারণ, কৃষ্ণ ও বিষ্ণু মূলত একই পরমেশ্বর।
কৃষ্ণেরই আরেক নাম বিষ্ণু; কৃষ্ণই বিষ্ণুরূপে জগৎপালন করেন।
তাই
এখানে বিষ্ণু শব্দে কৃষ্ণকেই বোঝায়। গোপ ও গোজাতির সুরক্ষা, গোবর্ধন ধারণ, গোচারণ
প্রভৃতি লীলা ভগবান বিষ্ণুরূপে নয়, কৃষ্ণরূপে করে থাকেন। মহাভারতে (সভাপর্ব ৬৫.৪১)
স্পষ্ট উল্লেখিত আছে—কৃষ্ণঞ্চ বিষ্ণুঞ্চ হরিং
ত্রাণায় বিক্রোশতি যাজ্ঞসেনী। অর্থাৎ “বস্ত্রহরণকালে দ্রৌপদী লজ্জানিবারণের জন্য সর্বদুঃখহর্তা
নররূপধারী কৃষ্ণনামক বিষ্ণুকে মনে মনে ডাকতে লাগলেন।”
এষ
বৈ ভগবান্ সাক্ষাদাদ্যো নারায়ণঃ পুমান্।
মোহয়ন্মায়য়া
লোকং গূঢ়শ্চরতি বৃষ্ণিষু ।।ভা. ১.৯.১৮।।
কৃষ্ণ
সম্পর্কে ভীষ্মদেব বলেছেন, “এই সাক্ষাৎ অচিন্ত্য, আদি পুরুষ। তিনি আদি নারায়ণ, পরম
ভোক্তা। কিন্তু তিনি তাঁর নিজের সৃষ্ট মায়াশক্তির প্রভাবে আমাদের মুগ্ধ করে বৃষ্ণিকুলেরই
একজনের মতো হয়ে তাঁদের মাঝে বিচরণ করছেন।”
পরমতত্ত্ব নির্বিশেষরূপে অব্যক্ত, সর্বব্যাপ্ত
ও নিরাকার; কিন্তু সবিশেষরূপে তিনি এক হয়েও অনন্তরূপে প্রকাশিত, অনন্তমূর্তিতে বিরাজমান;
তিনি নারায়ণ তথা বিষ্ণুরূপে বৈকুণ্ঠ ছাড়াও জড়জগতে মহাসমুদ্রে (কারণসমুদ্র, গর্ভোদকসমুদ্র
ও ক্ষীরসমুদ্র) অবস্থান করেন, লক্ষ্মীদেবী তাঁর পত্নী; এসমস্ত সিদ্ধান্ত বেদ ও পুরাণে
একই*** (প্রবন্ধের শেষে এর প্রমাণ উদ্ধৃত করা হয়েছে)। অতএব, বেদ ও পুরাণের বিষ্ণু
একই এবং কৃষ্ণই সেই বিষ্ণু।
সমস্ত উপনিষদের সারাতিসার ভগবদগীতায় বেদোক্ত বিষ্ণু
ও কৃষ্ণের একত্ব স্পষ্টভাবে নির্দেশিত হয়েছে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণকেই বিষ্ণু বলে সম্বোধন
করা হয়েছে—শমং
চ বিষ্ণো (১১.২৪), প্রতপন্তি বিষ্ণো (১১.৩০), আদিত্যানাম্ অহং বিষ্ণু (১০.২১) প্রভৃতি।
শ্রীকৃষ্ণই শ্রীবিষ্ণুরূপে সর্বজীবের অন্তরস্থিত পরমাত্মা—অহমাত্মা
গূঢ়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ (১০.২০)। শুধু সম্বোধন নয়, বিশ্বরূপ প্রদর্শনকালে কৃষ্ণ
অজুর্নকে বিষ্ণুরূপে দর্শন দান করেন এবং তারপর আবার কৃষ্ণরূপ ধারণ করেন। এতে বিষ্ণু
ও কৃষ্ণের একত্বই প্রমাণিত হয়। কংসের কারাগারেও বসুদেব ও দেবকীর পুত্র হিসেবে তিনি
প্রথমে বিষ্ণুরূপে, তারপর কৃষ্ণরূপে প্রকাশিত হন। তাছাড়া, কৃষ্ণ সুদর্শন চক্র ধারণ
করেন এবং সুদর্শন চক্র মূলত বিষ্ণুরই অস্ত্র। এক্ষেত্রেও কৃষ্ণ ও বিষ্ণুর একত্ব নির্দেশ
করে। সর্বোপরি, ঋগ্বেদ (১.১৫৪.৬) ও শুক্লযজুর্বেদে (৬.৩) গোলোকের তথা কৃষ্ণলোকের যে
বর্ণনা রয়েছে — যথা:
তা
বাং বাস্তূন্যুশ্মসি গমধ্যৈ যত্র গাবো ভূরিশৃঙ্গা অয়াসঃ।
অত্রাহ
তদুরুগায়স্য বৃষ্ণঃ পরমং পদমব ভাতি ভূরি ।।৬।।
(ঋগ্বেদ
মণ্ডল ১, সূক্ত ১৫৪, মন্ত্র ৬; শুক্লযজুর্বেদ ৬.৩)
অর্থাৎ,
“যেসকল সুখের স্থানে ভূরিশৃঙ্গ বিশিষ্ট ও ক্ষিপ্রগামী গোসমূহ বিচরণ করে, সেসকল স্থানে
গমনের জন্য তোমাদের উভয়ের (রাধাকৃষ্ণের) কাছে প্রার্থনা করি। এসকল স্থানে বহুলোকের
স্তুতিযোগ্য, অভীষ্টবর্ষী (সমস্ত অভিলাষ পূরণকারী) বিষ্ণুর পরমপদ স্ফূর্তি প্রাপ্ত
হচ্ছে; অর্থাৎ এসকল স্থানই বিষ্ণুর পরম ধাম।”
এই কৃষ্ণলোককে বিষ্ণুর পরমধামরূপে উল্লেখের দ্বারাও
সহজে বোঝা যায় যে, বেদের বিষ্ণু ও কৃষ্ণ একই পরমেশ্বর ভগবান।
বিষ্ণু:
কেবল বিশেষণাত্মক নাম নয়, ব্যক্তিবিশেষ
নিরাকারবাদীদের
ধারণা, “বিষ্ণু একটি বিশেষণাত্মক নাম। তা ব্যক্তিকে বোঝায় না। নিরাকার ব্রহ্মকে সর্বব্যাপক
অর্থে বিষ্ণু বলা হয়।” পরমেশ্বরের সব নামই তাঁর
গুণ বা কার্যভিত্তিক অর্থাৎ বিশেষণাত্মক। সুতরাং, বিষ্ণু পরমেশ্বরের বিশেষণাত্মক নাম
বিধায় তাঁর ব্যক্তিত্ব নেই — এ যুক্তি সম্পূর্ণ অসঙ্গত।
আবার কেউ মনে করেন, “সূর্য আলোকরশ্মি দ্বারা সর্বব্যাপ্ত
বিধায় বেদে সূর্যকেই বিষ্ণু বলা হয়েছে।” কিন্তু বেদে সূর্য ও বিষ্ণু
পৃথক দেব রূপে বর্ণিত। সূর্য একটি গ্রহ বা জ্যোতিষ্কবিশেষ; এর একজন অধিষ্ঠাতা দেবতা
আছেন। আর বিষ্ণু পরমব্রহ্ম; তিনি দেবতাদেরও আরাধ্য, তাই সূর্যদেবেরও বরেণ্য — তৎ সবিতুঃ
বরেণ্যম্। সুতরাং, বেদে বিষ্ণু মানেই সূর্য নয়।
তাছাড়া, সূর্য তাঁর আলোক বা তাপশক্তির দ্বারা
সর্বব্যাপ্ত হলেও সূর্য কিন্তু নিরাকার নয়। তেমনই, সবিশেষ ভগবান বিষ্ণু তাঁর অঙ্গজ্যোতি
বা ব্রহ্মরূপে সর্বব্যাপ্ত হলেও তিনি নিরাকার নন। তাই বেদে বিভিন্ন স্থানে হস্ত, পদ,
ললাট, চক্ষু, কর্ণ, মুখমণ্ডল সমন্বিত বিষ্ণুর চিরতরুণ দিব্য রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়,
যিনি উপবেশন, শয়ন, গমন, শ্রবণ, দর্শনাদি কার্যও করে থাকেন। অতএব, বিষ্ণু কেবল বিশেষণাত্মক
নাম নয়, ব্যক্তিবিশেষ। সেই ব্যক্তির মূল স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ। (বিস্তারিত: অমৃতের সন্ধানে
জুলাই—আগস্ট—সেপ্টেম্বর
২০২১ — এ ‘বেদে ঈশ্বরের সাকারত্বের প্রমাণ’ প্রবন্ধ)
[সূর্য
ও বিষ্ণু পৃথক—ঋগ্বেদে
১/৯০/৯, ১০/৯০/৩; যজুর্বেদ ৩৬/৯; অথর্ববেদ ১৯/৯/৬; মুণ্ডকোপনিষদ ২.২.৯—১০;
শ্বেতাশ্বতর ৪.১৮]
বেদে
শ্রীকৃষ্ণের মহিমা বিষ্ণুরূপে কীর্তিত কেন?
এতটুকু
আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, বেদে বিষ্ণুরূপে শ্রীকৃষ্ণেরই মহিমা কীর্তিত হয়েছে। কিন্তু
বেদে শ্রীকৃষ্ণের কথা সরাসরি খুব বেশি পাওয়া যায় না কেন? এর বহুবিধ কারণ রয়েছে।
এখানে বিশেষ পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হলো।
১.
কৃষ্ণ প্রতি যুগে স্বয়ংরূপে অবতরণ করেন না: বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে ভগবান বিভিন্ন সময়
বিভিন্ন রূপে এ জগতে অবতীর্ণ হন এবং এসমস্ত অবতার (রাম, নৃসিং, বামন প্রমুখ) ক্ষীরোদকশায়ী
বিষ্ণুর প্রকাশ। ভগবান যুগে যুগে অবতীর্ণ হলেও স্বয়ং কৃষ্ণরূপে প্রতিযুগে আসেন না।
প্রতি কল্পের আটাশতম চতুযুর্গের দ্বাপরের শেষে তিনি স্বয়ংরূপে অর্থাৎ কৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ
হন। অর্থাৎ কল্পের অন্যান্য সময় তিনি বিষ্ণুর অবতার রূপেই প্রকটিত হন।
২.
কৃষ্ণ বিষ্ণুরূপে জগৎ পালন করেন: শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ংরূপে গোলোকে তাঁর নিত্য পার্ষদদের
সঙ্গে নিত্য আনন্দবিহার করেন। আর তিনি জগৎ পালন করেন বিষ্ণুরূপে। জগতে দেবমানবাদি সকলে
বিপদাপন্ন হলে সাধারণত পালনকর্তা বিষ্ণুরই শরণাপন্ন হন। বিভিন্ন শাস্ত্রে তার প্রমাণ
পাওয়া যায়। তাই সর্বসাধারণের জন্য বেদে কৃষ্ণের মহিমা বিষ্ণুরূপে থাকা খুবই স্বাভাবিক।
৩.
জীব সাধারণভাবে দাস্যভাবযুক্ত: ভগবানের সঙ্গে জীব প্রধানত পাঁচটি রসে বা পাঁচ ভাবে
যুক্ত হতে পারে। যথা: শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রত্যেক
রস শ্রেষ্ঠ হলেও নিরপেক্ষ বিচারে মধুর রস সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। জীব প্রাথমিক অবস্থায়
শান্ত বা দাস্য ভাবে ভগবানের আরাধনা করে এবং এই দাস্য ভাব প্রত্যেক রসেই বিদ্যমান।
ভগবান সকলের পরম প্রভু এবং দাস্যই জীবের স্বরূপ। এই সার্বজনীন ভাব বিনিময় হয় বিশেষত
বিষ্ণুরূপের সঙ্গেই। তাই সার্বজনীন বেদে কৃষ্ণের মহিমা বিষ্ণুরূপে কীর্তিত হয়েছে।
৩.
শ্রীকৃষ্ণ রূপ বিশেষ: শ্রীকৃষ্ণ হলেন সেই মূল প্রদীপ, যাঁর থেকে অন্য সমস্ত বিষ্ণু—অবতাররূপ
প্রদীপ প্রকাশিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান; অন্যান্য অবতারগণ তাঁর স্বাংশ প্রকাশ।
সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রস কেবল ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণের লীলাতেই পূর্ণতা প্রাপ্ত
হয়। এই রূপে তাঁর ভগবত্তাকে আড়াল করে তিনি ভক্তের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে বিচিত্র লীলার
মধ্য দিয়ে আনন্দ আস্বাদন করেন। তিনি লীলা পুরুষোত্তম। অর্থাৎ পরমতত্ত্বের কৃষ্ণ রূপটি
বিশেষ রূপ। তাই তাঁর কথা বেদে সাধারণভাবে না বলে বিশেষভাবে বলা স্বাভাবিক।
মূল্যবান
জিনিস গুপ্ত রাখা হয়। কৃষ্ণতত্ত্ব পরম গোপনীয়। তাই কৃষ্ণ ও কৃষ্ণভক্তি বেদগোপ্য।
৫.
দেবতারা পরোক্ষ উক্তি পছন্দ করেন: প্রিয়জনকে পরোক্ষভাবে ভিন্ন নামে ডাকা সাধারণ রীতি।
ঐতরেয় উপনিষদ (১.৩.১৪) অনুসারে, উন্নত সাধক পরমেশ্বরের কৃপায় তাঁকে দর্শন করতে পারেন,
তাই তাঁর নাম ‘ইন্দ্র’। তবুও ব্রহ্মজ্ঞ ও দেবতাগণ
তাঁকে পরোক্ষভাবে ‘ইন্দ্র’ নামে অভিহিত করেন। কারণ
তারা তাদের প্রিয় প্রভুকে পরোক্ষ নামে সম্বোধন এবং পরোক্ষ উক্তি করতেই পছন্দ করেন—পরোক্ষপ্রিয়া
ইব হি দেবাঃ। তেমনই, স্বয়ং ভগবানের মূল নাম ‘কৃষ্ণ’(কৃষ্ণস্তু ভগবান
স্বয়ং); কিন্তু তাঁর বিবিধ গুণ বা কার্যভেদে ভক্তরা তাঁকে বিভিন্ন নামে সম্বোধন করতে
ভালোবাসেন। যেমন, গিরিধারী, নন্দসুত, যশোদানন্দন, দেবকীপুত্র, বাসুদেব, গোপাল, গোবিন্দ,
গোপীবল্লভ, রাধানাথ, শ্যামসুন্দর, ব্রজবিহারী, নবকিশোর প্রভৃতি। একারণে বেদেও শ্যাম,
গোপামনি, গোপতি, বিষ্ণু, রাধাপতি প্রভৃতি বহু নাম ও কার্যের দ্বারা পরমেশ্বর ভগবান
শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তিত হয়েছে।
বেদের বিষ্ণু ও শ্রীকৃষ্ণকে আলাদা ভাবার যে ধারা,
তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি আপাতবিভেদ মাত্র। শাস্ত্রের গভীরে গেলে বোঝা যায়,
শ্রীকৃষ্ণই সেই পরম বিষ্ণু, যিনি ভক্তদের সঙ্গে লীলা করে থাকেন নন্দ—যশোদা
বা বসুদেব—দেবকীর
সন্তান রূপে। ঈশ্বররূপে তাঁর গাম্ভীর্য যেমন অপরিসীম, তেমনই ভক্তপ্রাণ তাঁর মাধুর্যও
অতুলনীয়। তাই বলা যায়, শ্রীকৃষ্ণই বেদের পরম বিষ্ণু —
এটি কেবল তাত্ত্বিক সত্য নয়, বরং ভক্তের হৃদয়ে গাঁথা এক চিরন্তন উপলব্ধি ও পরম সত্য।
[***এক
ও অদ্বিতীয় বিশ্বস্রষ্টাই অনন্ত রূপে প্রকাশিত হন — শ্বেতাশ্বতর ৫.১৩; কঠোপনিষদ ২.২.১২;
শুক্লযজুর্বেদ ১.৩০। তিনি নিত্য বা অজ হয়েও বহুরূপে মায়ার প্রপঞ্চে অবতীর্ণ হন —
শুক্লজযুর্বেদ ৩১.১৯ ও ৫.২০; অথর্ববেদ ৭.৩.১.৫। তাঁর সহস্র সহস্র প্রতিমা—সহস্রস্য
প্রতিমাং — শুক্লযজুর্বেদ ১৩.৪১। বিষ্ণুর মহাসমুদ্রে অবস্থান—তপশ্চৈবাস্তাং
কর্ম চান্তর্মহত্যর্ণবে। — অথর্ববেদ, ১১কাণ্ড, ৪র্থ অনুবাক, সুক্ত ৪, মন্ত্র ২ ও ৬)।
যোনিরপ্স্বন্তঃ সমুদ্রে — ঋগ্বেদ ১০.১২৫.৭। ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবী বিষ্ণুর
পত্নী—শ্রীশ্চ
তে লক্ষ্মীশ্চতে পত্নৌ— শুক্লযজুর্বেদ ৩১.২২।] — হরেকৃষ্ণ