লোকমুখে একটি কথা প্রচলিত আছে, খুঁজলে নাকি সবকিছু পাওয়া যায়। কিন্তু এমন কোনো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে কি যিনি আনন্দে থাকতে চান না এই পৃথিবীতে? আসলে এটি সম্ভব নয়। বেদান্ত সূত্রে জীবাত্মা ও পরমাত্মার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। “আনন্দময়োঅভ্যাসাৎ”। অর্থাৎ ভগবান হচ্ছেন সমস্ত আনন্দের উৎস এবং নিত্য আনন্দময়। যেহেতু জীবাত্মাও ভগবানের অংশ, তাই জীবাত্মাও স্বরূপে নিত্য আনন্দময় অর্থাৎ জীব সর্বদাই আনন্দের খোঁজ করে। কিন্তু আমরা দেখি জীব এই জগতে নানাভাবে দুঃখভোগ করে এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
ভগবদগীতার শুরুতে আমরা দেখতে পাই, সর্বকালের সর্বশ্রষ্ঠ যোদ্ধা অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাহচর্যে থেকেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রক্কালে তার আত্মীয়স্বজনদের দর্শন করে এবং তাদের সাথেই যুদ্ধ করতে হবে এমন চিন্তা করে অত্যন্ত বিষাদগ্রস্ত হন। ক্রমান্বয়ে অর্জুনের বুদ্ধি হতাশা ও সিদ্ধান্তহীনতায় পর্যবসিত হয়। বিষাদগ্রস্ত হলে, সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য অনেকে বিভিন্ন পন্থার শরণাপন্ন হন। কিন্তু অর্জুন এই ভীষণ পরিস্থিতিতেও ভগবানের চরণে সমর্পিত হন। ভগবানের চরণে সমর্পণকেই বলা হয় যোগ। গীতার প্রথম অধ্যায় বিষাদযোগের মূল বিষয়বস্তু হলো বিষাদগ্রস্ত অবস্থাতেও অর্জুন ভগবানের নিকটে শরণগ্রহণ করেন অর্থাৎ যেকোনো বিষম পরিস্থিতিতেও আমাদেরকে ভগবানের সাথে যুক্ত থাকতে হবে। এরপর শ্রীভগবান অর্জুনকে জ্ঞান প্রদান করেন, যার মাধ্যমে অর্জুন বিষাদ থেকে মুক্ত হন। গীতার সর্বশেষ অধ্যায়ের নাম মোক্ষযোগ। গীতার প্রথম ও শেষ অধ্যায়ের নাম ইঙ্গিত প্রদান করে যে, কেউ যদি এই জ্ঞান শুদ্ধ পরম্পরার মাধ্যমে লাভ করেন, তাহলে তিনি বিষাদ থেকে মোক্ষ পর্যন্ত উন্নীত হবেন।
কেন জীবের হৃদয়ে বিষাদ উৎপন্ন হয় ?
প্রশ্ন হতে পারে, যদি জীবাত্মা স্বাভাবিকভাবে নিত্য আনন্দময় হয়, তাহলে কেন জীব দুঃখ পায়? মূলত ভবিষ্যতের অবস্থার কথা চিন্তা করে তার মধ্যে উপস্থিত হয় ভয়। জীবের হৃদয়ে উৎপন্ন হওয়া সেই ভয় থেকে জীব দুঃখ অনুভব করে। এমনকি ভবিষ্যতের কষ্ট লাভের পূর্বেই বর্তমানে সে ভয়ভীত হয়ে অযথাই বিষাদ অনুভব করে। গীতাতে আমরা দেখি, দুর্যোধন পাণ্ডবদের সৈন্য দর্শন করে এবং তাদের দিব্য শঙ্খধ্বনি শ্রবণ করে নিজের বিজয় নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পরেন তথা ভয়ভীত হন। অর্জুনও আত্মীয়দের দর্শন করে ভয়ভীত হয়ে অনুচিত আচরণ করেন। এভাবে দর্শনেন্দ্রিয় ও শ্রবণেন্দ্রিয় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মূলত মনের মধ্যে ভয় উৎপন্ন হয়।
ভয় এমন একটি জিনিস যা আমরা কেবল জাগ্রত অবস্থাতে অনুভব করি এমন নয়, বরং ঘুমিয়ে থেকে অবাস্তব স্বপ্ন দেখেও আমরা ভয় পেয়ে যাই। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক শোষণ, পারিবারিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যগত চিন্তা, জীবিকা নির্বাহ ইত্যাদি কারণে জাগ্রত অবস্থাতে আমরা ভয়ভীত হই। অন্যের সফলতা দর্শন করে নিজের অনিশ্চিত ভাগ্য নিয়ে আমরা ভয়ভীত হই। আমরা ভয়ভীত হই, যখন আমরা শুনি কেউ আমাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। তবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভয় হচ্ছে মৃত্যুভয়। এরকম যত প্রকারের ভয় আছে সবগুলোর উৎপত্তির কারণ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতমে বলা হয়েছে —
ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যাৎ
ঈশাদপেতস্য বিপর্যয়োহস্মৃতিঃ।
তন্মায়য়াতো বুধ আভজেত্তং
ভক্ত্যৈকয়েশং গুরুদেবতাত্মা।।
“শ্রীভগবানের বহিরঙ্গা মায়াবলে আচ্ছন্ন হয়ে যখন জীব দেহাত্মবুদ্ধির ফলে জড় জাগতিক দেহটিকে স্বরূপ সিদ্ধান্তে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন ভয় জাগে। যখন এভাবে পরমেশ্বর ভগবানের সাথে সম্বন্ধ বিষয়ে বিমুখ হয়, তখন শ্রীভগবানের সেবকরূপে তার স্বরূপসত্ত্বাও বিভ্রান্ত হয়। মায়া নামে অভিহিত বিভ্রান্তির প্রভাবেই এমন বিপর্যয়মূলক ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সুতরাং, বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মাত্রেই শ্রীগুরুদেবকে আরাধ্য-দেবতা এবং একান্ত প্রিয়তম জ্ঞানে অনন্য ভক্তিসহকারে শ্রীভগবানের আরাধনা করবেন।”
কেবল জাগতিক ঐশ্বর্য, ক্ষমতা, বুদ্ধি, সৌন্দর্য, বিদ্যা ইত্যাদি সর্বোচ্চ পরিমাণে থাকলেও কেউ ভয় থেকে মুক্ত হতে পারেন না, যদি না তিনি তার দেহাত্মবুদ্ধি থেকে বেরিয়ে আসেন। এককথায় জড়দেহ এবং দেহগত বিষয়ের প্রতি আসক্তি থেকে কৃষ্ণ বিস্মরণ ঘটে এবং কৃষ্ণ বিস্মরণের কারণে জীবের মধ্যে ভয় উৎপন্ন হয়। আসক্তির কারণে বদ্ধজীব প্রাপ্ত বস্তু হারানোর ভয় ও অপ্রাপ্ত বস্তু লাভ হবে কি না তা ভেবে ভয়ভীত হয়। অর্থাৎ জড় বস্তুর প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি কোনোটিই ভয় থেকে জীবকে মুক্তি প্রদান করতে পারে না। এভাবে জীব বিষাদের এক অন্তহীন সাগরে ক্রমাগত হাবুডুবু খেতে থাকে।
হিরণ্যকশিপু যদিও ত্রিভুবন জয় করে নিয়েছিলেন, কিন্তু তারপরও নিজের ছোট শিশু সন্তান যখন তার অবাধ্য হয়ে বিষ্ণুভক্তি শুরু করেছিল, তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। কারণ তিনি চিন্তিত ছিলেন যে কীভাবে এই বিষ্ণুভক্তির বীজ তার পুত্রের হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল। যে বিষ্ণুভক্তির বীজ হৃদয়ে অন্যান্য সকল ভয় থেকে মুক্তির কারণ হতে পারে, সেই বিষ্ণুভক্তির পন্থাকেই আসুরিক ব্যক্তিরা ভয় পায়। ফলে যতই জাগতিক ক্ষমতা থাকুক না কেন, আসুরিক ব্যক্তিরা ভয় তথা বিষাদ থেকে মুক্ত হতে পারে না। কিন্তু অপরপক্ষে একজন অকিঞ্চন ভক্ত যার কোনো ধরনের জাগতিক ক্ষমতা নেই, তিনি সব ধরনের বিষাদ থেকে মুক্ত হয়ে সর্বত্র আনন্দে বিচরণ করেন।
কীভাবে বিষাদ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?
একবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর আরেকজন প্রিয় ভক্ত উদ্ধবকে জ্ঞান প্রদান করেছিলেন, তখন তিনি মহারাজ যদুর কাহিনি উল্লেখ করেন, যার নাম অনুসারে তাঁর বংশের নাম হয় যদু বংশ বা যাদব বংশ। মহারাজ যদু একজন তরুণ ও জ্ঞানবান ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসীকে দেখেছিলেন যিনি মহানন্দে, নির্ভিকভাবে পুরো পৃথিবী পর্যটন করছিলেন। অতঃপর মহারাজ যদু উপলব্ধি করতে পারেন যে, জাগতিক মানুষ যেমন কামনা বাসনার দ্বারা জর্জরিত হয়ে সংসার দাবানলে জ্বলছে, তখন এই ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী বৈরাগ্য পালন করে মুক্তভাবে বা আসক্তিবিহীন অবস্থায় বিশ্ব পরিভ্রমণ করছেন। এই পৃথিবীর মানুষ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য বিশ্বের নানা রকম দর্শনীয় স্থানে গমন করেন। কিন্তু সন্ন্যাসীদের পর্যটন
সৌন্দর্য দর্শনের প্রতি আসক্তি থেকে উৎপন্ন হয় না, বরং তা বৈরাগ্যময় জীবনের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত। মূলত তাঁর নির্দিষ্ট কোনো গৃহ বা আশ্রম বা বিশ্রামস্থল ছিল না এবং পর্যটনের সময় যখন যেমন সুযোগ হতো তিনি সেভাবে দিন অতিবাহিত করতেন। এভাবে কোনো দৈহিক প্রয়োজন নির্বাহ করার ভয়ে তিনি ভীত ছিলেন না। অর্থাৎ এককথায় তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে সন্তুষ্টচিত্ত থাকাতে তাঁর হৃদয়ে কোনো বিষাদ ছিল না এবং তিনি আনন্দ সহকারে পৃথিবী ভ্রমণ করতে পেরেছিলেন।
এরপর মহারাজ যদু সেই মহান সন্ন্যাসীর কাছ থেকে ভগবৎ বিষয়ক সদুপদেশ গ্রহণ করে অবশেষে সকল জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে পারমার্থিক স্তরে যথাযথভাবে স্থিত হন।
এখান থেকে শিক্ষণীয় দিকটি হলো, শ্রবণেদ্রিয় যখন আসক্তিরহিত সাধুদের শ্রীমুখ থেকে নির্গত চিন্ময় শব্দধ্বনি শ্রবণে যুক্ত থাকবে, তখন আসক্তি ছেদনের মাধ্যমে ভয়, হতাশা বা বিষাদ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
শ্রীল প্রভুপাদ যখন পাশ্চাত্যদেশে গমন করেন তখন সেখানে হিপি আন্দোলন চলছিল। সেই যুবক-যুবতীরা সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তান হলেও তারা সমাজের তথাকথিত জীবনধারার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। তারা প্রচণ্ড পরিমাণে এক অসন্তুষ্ট, দিগ্ভ্রান্ত ও হতাশাচ্ছন্ন যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করছিল। কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদের কাছ থেকে ভগবদ্গীতার অমৃতময় বাণী শ্রবণের পর হাজার হাজার যুবক জীবনের প্রকৃত মূল্য বুঝতে পেরে কৃষ্ণভাবনামৃতে যুক্ত হয়ে দিব্য আনন্দ অনুভব করেন।
দার্শনিকভাবে ভগবত্তত্ত্ববিজ্ঞান সমন্বিত চিন্ময় শব্দ তরঙ্গ ও ভগবানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যেমন প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ নোটিশের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের বিষাদগ্রস্ততা সর্বজনবিদিত হলেও এটি ছাড়া অর্জুন আরেকবার ব্যাপকভাবে শোকাকুল হয়ে পড়েন, যে লীলাটি শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধে বর্ণিত হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় ভগবানের সরাসরি সঙ্গের ফলে অর্জুনের মোহ দূর হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে ভগবান যখন এই ধরাধামে তাঁর লীলাবিলাস সম্পন্ন করে অন্য কোনো ব্রহ্মাণ্ডে তাঁর নিত্যলীলা প্রকট করার জন্য গমন করেন, তখন আবারও অর্জুন ভগবানের বিরহ—শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন। তখন অর্জুন ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী ভগবদ্গীতার জ্ঞান স্মরণ করেন। যদিও সেই সময় সরাসরিভাবে কৃষ্ণের দর্শন লাভের সুযোগ অর্জুন হারিয়েছিলেন, কিন্তু গীতার জ্ঞান পুনরায় তাঁকে বিষাদ থেকে উত্তরণের জন্য পথ করে দেয় এবং অর্জুনের হৃদয়ের তাপ দূরীভূত হয় এবং তিনি নিজে সেই কথা যুধিষ্ঠির মহারাজকে উল্লেখ করেন। এখান থেকে প্রমাণিত হয়, ভগবানের বাণী বা ভগবদ্গীতা ও ভগবান সম্পুর্ণভাবে অভিন্ন এবং তা ভগবানের সরাসরি উপস্থিতির মতই শক্তিশালী।
অর্জুন বলেন —
শকালার্থযুক্তানি হৃত্তাপোপশমানি চ।
হরন্তি স্মরতশ্চিত্তং গোবিন্দাভিহিতানি মে।।
অর্থাৎ “পরমেশ্বর ভগবান গোবিন্দ প্রদত্ত উপদেশগুলো আমি স্মরণ করছি, কেননা এগুলো দেশ এবং কালের সমস্ত পরিস্থিতিতে হৃদয়ের তাপ প্রশমিত করার সারগর্ভ উপদেশে পূর্ণ।”
ভগবদ্গীতার জ্ঞান কোন অবস্থায় সাহায্য করবে?
অনেক সময় আমরা চিন্তা করি, আমার সাথে তো ভগবান নেই বা আমি কখনো সরাসরি ভগবানকে দেখিনি । কিন্তু ভগবান ও তাঁর বাণী অভিন্ন। তাই তিনি নিজ বাণীর মাধ্যমে সবসময় আমাদের সাঙ্গে আছেন এবং ভগবানের বাণীর মাধ্যমে আমরা যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে পারি। আবার অনেকে চিন্তা করে, ভগবান অর্জুনকে ৫০০০ বছর পূর্বে এই গীতার জ্ঞান দান করেন, কিন্তু বর্তমানে আধুনিক যুগ। কীভাবে সেই জ্ঞান এখনও আমাদের সময়ে কার্যকরী হতে পারে? এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে বিধায় অর্জুন পূর্ববর্তী শ্লোকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, এই জ্ঞান দেশ, কাল, পাত্রভেদে সকলের জন্য সবসময় সমভাবে প্রযোজ্য।
প্রকৃতপক্ষে ভগবান কেবল অর্জুনের হিতের জন্যই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার উপদেশ দান করেননি, তিনি সর্বকালের সর্বদেশের সমস্ত মানুষের জন্য এই মূল্যবান উপদেশ দান করেছিলেন। বাস্তব জীবনে আমরা দেখি একজন ব্যক্তি শুধু একবার না, বারবার ভিন্ন ভিন্ন কারণবশত তার জীবনে যুদ্ধময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা তাকে বিষাদগ্রস্ত করে। এমনকি সে যত বড় যোদ্ধাই হোক না কেন! তাই ভগবান এমন একটি পরিস্থিতির অবতারণা করে অর্জুনকে এই জ্ঞান দিয়েছেন, যেন তা সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হয়। কারণ আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো যুদ্ধে রত রয়েছি।
এছাড়াও ভগবান অর্জুনকে গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে বলেন, কোটি কোটি বছর পূর্বে তিনি গীতার জ্ঞান সূর্যদেবকে দান করেছিলেন। রাতের অন্ধকারে যে ভীতি কাজ করে, সূর্যদেব নিজস্ব প্রকাশ ছড়িয়ে সেই ভয় থেকে সমস্ত জীবকুলকে উদ্ধার করেন। সূর্যের আলোর মাধ্যমে যখন সবকিছু আলোকিত হয়ে ওঠে তখন আমরা সব দেখতে পারি, কিন্তু ভগবান প্রদত্ত গীতার জ্ঞানের মাধ্যমে সূর্যদেব পর্যন্ত আলোকিত হয়েছেন। আর যে জ্ঞান আলোকদেবতাকে পর্যন্ত আলোকিত করতে পারে, সেই জ্ঞান লাভ করে আমরা কি আলোকিত হবো না? তাই একজন আলোকিত মানুষকেও যেকোনো অবস্থাতে এই জ্ঞান আরো আলোকিত করতে পারে। অর্জুন কিংবা সূর্যদেব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
মানুষের জীবনে দুঃখ-বিষাদ অনিবার্যভাবে আসে। কখনো প্রিয়জনের বিচ্ছেদে, কখনো জীবনের অনিশ্চয়তা বা ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জে আমরা ভেঙে পড়ি। কিন্তু গীতা আমাদের শিক্ষা দেয়-বিষাদ থেকে পালিয়ে নয়, বরং জ্ঞানের আলোয় তাকে জয় করতে হয়। অর্জুন যেমন শ্রীকৃষ্ণের শরণ নিয়ে তাঁর বাণীর দ্বারা সাহস, স্থিরতা ও কর্তব্যপালনের শক্তি লাভ করেছিলেন, তেমনি আমরাও ভগবানের বাণীকে আশ্রয় করলে জীবনের প্রতিটি “বিষাদযুদ্ধ”— এ জয়ী হতে পারি। তাই গীতার শিক্ষা শুধু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, আজকের মানবজীবনের প্রতিটি সংকটের মুহূর্তেও সমান প্রাসঙ্গিক। — হরেকৃষ্ণ