বর্ষ: 2025 | ইস্যু: ৪র্থ সংখ্যা
ক্ষমা
কেবল অপরাধীকেই নয়, ক্ষমাকারীকেও শুদ্ধ করে। এতে অহংকার দূর হয় এবং হৃদয়ে বিনম্রতা
গড়ে ওঠে। সঠিক মনোভাব নিয়ে ক্ষমা করতে পারলে মানুষের চরিত্র পরিশুদ্ধ হয় এবং সে
ভগবানের কৃপা লাভে যোগ্য হয়ে ওঠে
বঙ্গদেশে
শক্তিপূজার সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় রূপ হলো দেবী কালিকা। এজন্য বিভিন্ন দেশে
আদ্যাশক্তির বিভিন্ন রূপে পূজার প্রাধান্য প্রসঙ্গে ব্রহ্মযামলে উল্লেখিত আদ্যাস্তোত্রে
বলা হয়েছে — ‘কালিকা বঙ্গদেশে চ, অযোধ্যায়ং মহেশ্বরী’। অবশ্য কালীমাতার এই প্রভাব
বুঝতে আমাদের শাস্ত্র পর্যন্ত না গেলেও চলবে; যেকোনো এলাকার প্রধান ও সবচেয়ে জনপ্রিয়
মন্দিরটি সাধারণত কালী মন্দির, যা বাঙ্গালি সংস্কৃতিতে কালীর শক্তিশালী প্রভাবকেই চিহ্নিত
করে। ভারতের অন্য অঞ্চলে কালী মন্দিরের এতো আধিক্য চোখে পড়ে না।
‘কালী’ শব্দের অনেক রকম অর্থ পাওয়া যায়। একটি অর্থে
কালী অর্থ ঘোর কৃষ্ণবর্ণা। আবার, যিনি কালস্বরূপা, প্রলয়কালে যিনি কালরূপে জগৎকে গ্রাস
করেন, তিনিই কালী। আবার, যিনি মহাকালের (শিব) প্রকৃতিস্বরূপা, তিনিই মহাকালী। আরেক
অর্থে, যিনি কালকে কলন করেন, তিনিই কালী। দেবী দুর্গা ও কালী দু’জনেই অভিন্ন, দু’জনেই
আদ্যাশক্তির দুটি রূপ মাত্র; রজোগুণে দুর্গা এবং তমোগুণে তিনি কালীরূপা। তাইতো বলা
হচ্ছে —
“জয়ন্তী
মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।
দুর্গা
শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্তু তে।।”
দেবীকালীর উগ্রমূর্তির তাৎপর্য
দেবী
কালীর রূপটি বিচিত্র-কারো কাছে ভয়ংকরী, কারো কাছে মাতৃস্বরূপিণী, আবার, কারো কাছে
কৌতুকের, বিশেষ করে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবীর এই রূপ বিভ্রান্তির বিষয়বস্তুও
বটে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, দেবীর এই রূপের মধ্যে এক অদ্ভূত আধ্যাত্মিক রহস্য লুকিয়ে
আছে।
চতুভূর্জা
দেবীর
ডান দিকের উপরের হাতে আছে বরমুদ্রা, যা দ্বারা তিনি ভক্তকে তার মনোবাঞ্ছা অনুসারে বর
দান করছেন এবং নিচের হাতে অভয়মুদ্রা মুদ্রা, যা দ্বারা তিনি দৈত্যভয়ে ভীত জীবকে অভয়
দিচ্ছেন। বা দিকের উপরের হাতে আছে সুতীক্ষ্ম খড়গ, যা দিয়ে তিনি অসুর বিনাশ করে ভক্তদের
রক্ষা করছেন, আরো গভীর অর্থে, জ্ঞানরূপ খড়গ দ্বারা অজ্ঞানতারূপ তমোগুণকে ছিন্ন করছেন।
নিচের দিকে অবশিষ্ট হাতে সদ্যছিন্ন মুণ্ড, যা দ্বারা তিনি অসুর তথা আসুরিক ভাবাপন্ন
ব্যক্তিদের নিষ্ঠুর পরিণতি দেখাচ্ছেন। দেবীর চতুভুর্জা রূপ চতুবর্গ তথা ধর্ম, অর্থ,
কাম, মোক্ষ প্রদায়িণী।
দিগম্বরী ও মুণ্ডমালাধারিণী
দেবী
কালীর একাধিক রূপভেদ বিভিন্ন শাস্ত্রে দেখা যায়। কোথাও তিনি রক্ত বর্ণের বস্ত্র ও
সর্ব অলংকার ভূষিতা, কোথাও ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা, আবার, কখনোও দিগম্বরী, কেবল মুণ্ডমালা
ও কাঁটা হস্তের মেখলা বা কোমরবন্ধনী ধারণ করে আছেন।
প্রকৃতপক্ষে,
অসুরেরা যখন দেবী দুর্গার তেজময় অস্ত্রশস্ত্র সমন্বিত যুদ্ধং দেহী রূপ দেখার পরও সেই
রূপে বিমোহিত হয়ে পড়ার ফলে যুদ্ধ করতে পারছে না, তখন দেবী তাদের বলেন তাঁর উগ্ররূপা
কালিকার সাথে যুদ্ধ করতে। এই কালিকা দিগম্বরী হলেও তার রূপ এমন ভয়ংকর যে, অসুরেরা
তাঁর এই রূপ দেখার পরও কামমোহিত হওয়া তো দূরের কথা, আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন দেবী
কালিকা তাদের গ্রাস করেন।
আবার,
অন্য অর্থে প্রলয়কালে জীবকূল ধ্বংস হলে কেবল তাদের অস্থি আর নরকংকালই অবশিষ্ট থাকে।
প্রলয়কারিণী শক্তি কালী তাই কেবল অস্থি, নরমুণ্ড, আর কংকাল দ্বারা নিজেকে আচ্ছাদিত
করেন। যেহেতু কালী প্রলয়কারিণী এবং তমোগুণকে স্বীকার করেন, তাই তিনি সুন্দর বস্ত্র
আদি অলংকার দিয়ে সাত্ত্বিকী বা রাজসিকী রূপ নেবেন না, এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া কালী
যেহেতু ভগবতীর উগ্রশক্তি, তাই যুদ্ধকালে তিনি এতটাই উগ্রতেজ ধারণ করেন যে বস্ত্র, আভরণ,
অলংকার তার গায়ে থাকা সম্ভব নয়।
আমরা
দেখি রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, বামাক্ষ্যাপা এবং শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস আদি বিখ্যাত মাতৃসাধকেরা
এই দিগম্বরী কালীর সাধনা করেই কামরিপুকে জয় করেছেন। তাইতো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম
তাঁর রচিত শ্যামা সঙ্গীতে গেয়েছেন — “বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না, মা আমার তাই দিগ্বসন।
কালো মেয়ের পায়ের তলায়, দেখে যারে আলোর নাচন।” প্রকৃতপক্ষে, মাতা সর্বদিক ব্যাপ্ত
হয়ে আছেন তাই তিনি দিগম্বরী (দিককে যিনি অম্বর করেছেন)।
শিববক্ষে চরণ এবং জিহ্বায়
কামড়
মাতা
কালী তাঁর মুক্তার ন্যায় শুভ্র দন্তরাজি দ্বারা রক্তলাল জিহ্বা কামড় দিয়ে আছেন।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, অসুর সংহারে মত্ত কালী ক্রোধে তাঁর খড়গ দ্বারা নির্বিচারে
অসুরকূলকে সংহার করতে লাগলেন। তখন উমাপতি শিব অসুরকূলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য,
সর্বোপরি দেবী কালিকাকে শান্ত করে জগতের ভারসাম্য রক্ষার জন্য যে পথ দিয়ে দেবী অসুর
সংহার করতে করতে আসছিলেন, সেই পথে শায়িত হন। তখন দেবী কালী অজ্ঞাতসারে চলতে চলতে মহাদেবের
বক্ষে তাঁর চরণ রাখেন। তৎক্ষণাৎ পতিপরায়ণা দেবী স্বীয় পতির গায়ে চরণ রেখেছেন দেখে
লজ্জায়, অনুশোচনায় জিহ্বায় কামড় দেন। যেহেতু এই রূপেই উগ্র কালিকা শান্ত হন, তাই
এই জিহ্বা কামড়ে থাকা, শিববক্ষে দণ্ডায়মান রূপটিকে ভক্ত কল্যাণকারিণী রূপ হিসেবে
পূজা করা হয়। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মা সত্ত্বগুণরূপা শুভ্র দন্তরাজি দ্বারা
রজোগুণরূপ লাল জিহ্বাকে কেটেছেন। জিহ্বা লোলুপতার প্রতীক। তাই মায়ের এই ভাব আমাদের
সত্ত্বগুণ দ্বারা রজোগুণ তথা লোভ, লালসা, অহংকার, কামনাকে দমন করার শিক্ষা দেয়।
ত্রিনয়নী ও মুক্তকেশী
দক্ষিণাকালীর
ধ্যানমন্ত্র বলছে — ‘শবারূপ মহাভীমাং মুক্তকেশী চতুর্ভুজাম্’ অর্থাৎ মা মুক্তকেশী।
এই মুক্তকেশ বৈরাগ্যের প্রতীক। তাঁর ত্রিনয়ন তিনটি কাল-অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের প্রতীক। আবার, দেবী ত্রিগুণময়ী সত্ত্ব, রজো, তমো
গুণ-স্বরূপা (গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণী নমোহস্তু তে)।
বঙ্গদেশে কালীপূজা
বাংলায়
কার্তিকী অমাবস্যার দীপাবলিতে কালী পূজা প্রচলিত, যদিও ভারতের অন্যান্য প্রদেশে দীপাবলিতে
লক্ষ্মীপূজা হয়। কলকাতার বিখ্যাত মন্দির ৫১ সতীপীঠের অন্যতম কালীঘাঁ মন্দিরে দীপাবলির
দিন দেবী কালীকে মহালক্ষ্মীরূপে পূজা করা হয়। যদিও প্রাচীনকাল থেকেই কালী আরাধনা চলে
আসছে, তবুও দীপাবলির এই কালী পূজার প্রবর্তন করেন নবদ্বীপের বিখ্যাত পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ
আগমবাগীশ, যিনি কৃষ্ণনগরের শাক্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভার পণ্ডিত ছিলেন। সকল অমাবস্যা
তিথিই কালীপূজার জন্য প্রশস্ত। দুর্গাপূজার অষ্টমীতে যে সন্ধিপূজা হয় (অষ্টমী ও নবমী
তিথির সন্ধিক্ষণ) তখন আসলে দুর্গামূর্তিতে কালীর ধ্যান করে কালীর পূজা হয়। এটি সেই
তিথি, যে তিথিতে দেবী দুর্গার প্রচণ্ড ক্রোধে তাঁর ললাঁট থেকে তেজ নির্গত হয় এবং সেই
তেজ হতে দেবী কালী আবিভূর্তা হন অসুর বিনাশের জন্য। কালীর একাধিক রূপভেদ আছে যেমন —
দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, সিদ্ধকালী, মহাকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী ইত্যাদি।
তবে গৃহে বা মন্দিরে সাধারণ ভক্তদের জন্য দক্ষিণাকালী পূজা করার নিয়ম, অন্যরূপগুলো
সাধক বা তন্ত্রমতে পূজা করা উচিত বলে মনে করা হয়। শিবহৃদয়ে দক্ষিণচরণ বা ডান পা স্থাপন
করেছেন বলে এই কালীকে দক্ষিণাকালী বলা হয়, অন্যদিকে বাম পা সামনে থাকলে তা শ্মশানকালী
বা অন্যান্য রূপ; যা গৃহীদের বা সাধারণ নিয়মে পূজা করা অমঙ্গলজনক। প্রধানত তন্ত্র
সাধকেরা এই বামাকালীর পূজা করেন।
দেবীকালী পরম বৈষ্ণবী
ব্রহ্মবৈবর্ত
পুরাণের প্রকৃতিখণ্ডে (১.৯০) কালী সম্পর্কে বলা হয়েছে —
‘কৃষ্ণভক্তা,
কৃষ্ণতুল্যা তেজসা বিক্রমৈগুর্ণৈঃ।
কৃষ্ণভাব
নয়া শশ্বৎ কৃষ্ণবর্ণা সনাতনী’ ।।
অর্থাৎ,
“দেবীকালী তেজ ও গুণ বিক্রমে কৃষ্ণতুল্যা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি কৃষ্ণ ভক্তিপরায়ণা
তথা শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত (বৈষ্ণবী)। এই সনাতনী নিরন্তর কৃষ্ণের ভাবনাবশত কৃষ্ণবর্ণ হয়েছেন।”
ভক্তের
মধ্যে ভগবানের সমস্ত দিব্যগুণ বিকশিত হয়, তথাপি ভক্ত ও ভগবান দুই ভিন্ন সত্ত্বা। ভগবান
সেব্য, আর ভক্ত হলেন তাঁর সেবক। তেমনি দেবীকালী হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবিকা তথা
পরম বৈষ্ণবী। — হরেকৃষ্ণ