শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ
শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ
✍ কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
১৪ জুলাই ২০২৬
বর্ষ: 2025  |  ইস্যু: ২য় সংখ্যা

[শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্যতম পার্ষদ শ্রীল জীব গোস্বামী। তিনি বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামীর অন্যতম। তিনি এত ভক্তিগ্রন্থ রচনা করেছেন যে, সেগুলো গণনা করে শেষ করা যায় না। সেগুলোর মধ্যে ‘ষট্সন্দর্ভ’ নামে পরিচিত ‘শ্রীভাগবতসন্দর্ভ’ গ্রন্ধে শ্রীল জীব গোস্বামী ভগবদ্ভক্তির চরম সিদ্ধান্ত নিরূপণ করেছেন। এই মহিমান্বিত গ্রন্থের বিষয়বস্তু শ্রীল প্রভুপাদের লেখনি থেকে তুলে ধরা হলো।]

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্যতম পার্ষদ শ্রীল জীব গোস্বামী। তিনি বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামীর অন্যতম। শ্রীল রূপ গোস্বামীর ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রীল জীব গোস্বামী এত ভক্তিগ্রন্থ রচনা করেছেন যে, সেগুলো গণনা করে শেষ করা যায় না। শ্রীভাগবতসন্দর্ভে শ্রীল জীব গোস্বামী ভগবদ্ভক্তির চরম সিদ্ধান্ত নিরূপণ করেছেন। ‘ভাগবতসন্দর্ভ’ ‘ষট্সন্দর্ভ’ নামেও পরিচিত।

   ‘তত্ত্বসন্দর্ভ’ নামক প্রথম বিভাগে নিরূপিত হয়েছে যে, পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

  ‘ভগবৎসন্দর্ভ’ নামক দ্বিতীয় সন্দর্ভে নির্বিশেষ ব্রহ্ম এবং অন্তর্যামী পরমাত্মার পার্থক্য নিরূপিত হয়েছে এবং চিৎ-জগৎ ও জড় কলুষমুক্ত বিশুদ্ধ সত্ত্বের বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, শুদ্ধ সত্ত্বের চিন্ময় স্থিতির বর্ণনা করা হয়েছে। জড় জগতের যে সত্ত্বগুণ তা রজ ও তমোগুণের কলুষের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু কেউ যখন বিশুদ্ধ সত্ত্বে অধিষ্ঠিত হন, তখন আর তাঁর এধরনের কলুষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। সেটি শুদ্ধ সত্ত্বের চিন্ময় স্তর। সেখানে পরমেশ্বর ভগবানের ও জীবের শক্তির বর্ণনা করা হয়েছে এবং ভগবানের বৈচিত্র্যময় অচিন্ত্য শক্তিরও বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবানের শক্তিসমূহকে চিৎ-শক্তি, জীবশক্তি, স্বরূপশক্তি ও মায়াশক্তি আদি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। শ্রীবিগ্রহ আরাধনার নিত্যত্ব, শ্রীবিগ্রহের সর্বশক্তিমত্তা, বিভুতা, সর্বাশ্রয়তা, তাঁর সূক্ষ্ম ও স্থূল শক্তিসমূহ, তাঁর স্বপ্রকাশত্ব, রূপ-গুণ-লীলাময়ত্ব, অপ্রাকৃতত্ব, পূর্ণ স্বরূপত্ব আদির কথাও বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, চিৎ—জগতে পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুই অচিন্ত্য শক্তিসম্পন্ন এবং চিৎ-জগৎ, ভগবানের পার্ষদ ও ভগবানের তিন প্রকার শক্তি, সবই চিন্ময়। এই গ্রন্থে নির্বিশেষ ব্রহ্ম ও পরমেশ্বর ভগবানের তারতম্য, ভগবানের পূর্ণত্ব, সকল বৈদিক জ্ঞানের উদ্দেশ্য, ভগবানের স্বরূপশক্তি এবং সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের আদি প্রণেতা যে পরমেশ্বর ভগবান, এই সমস্ত বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।

   তৃতীয় সন্দর্ভটির নাম ‘পরমাত্মসন্দর্ভ’। এই গ্রন্থে পরমাত্মা সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে পরমাত্মা কীভাবে অসংখ্য জীবের সঙ্গে বিরাজ করেন তা বলা হয়েছে। এই গ্রন্থে গুণাবতাবের তারতম্য, জীব, মায়া, জগৎ, পরিণামবাদ, বিবর্ত-সমাধান, জগৎ ও পরমাত্মার অনন্যত্ব এবং জগতের সত্যতা সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে শ্রীধর স্বামীর মত প্রদান করা হয়েছে। এই গ্রন্থে আরো বর্ণনা করা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবান যদিও সমস্ত জড় গুণরহিত, তবুও তিনি সমস্ত জড় কার্যকলাপের নিয়ন্তা। লীলাবতারেরা যে কীভাবে ভক্তের বাসনায় সাড়া দেন তার এবং ভগবানের ছয়টি ঐশ্বর্যের বর্ণনা এতে করা হয়েছে।

   চতুর্থ সন্দর্ভটির নাম ‘কৃষ্ণসন্দর্ভ’ এবং এই গ্রন্থে প্রমাণ করা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। এতে কৃষ্ণলীলাসমূহ ও গুণাবলি, পুরুষাবতারের কর্তৃত্ব আদি বর্ণিত হয়েছে। এই গ্রন্থে শ্রীধর স্বামীর মত সমর্থন করা হয়েছে। সমস্ত শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণের পরম ঈশ্বরত্ব প্রতিপাদিত হয়েছে। বলদেব, সংকর্ষণ আদি শ্রীকৃষ্ণের অন্যান্য অংশ-কলারা হচ্ছেন মহাসংকর্ষণের প্রকাশ। সমস্ত অংশ ও কলা অবতারেরা শ্রীকৃষ্ণের শরীরে নিত্য বিরাজ করেন। শ্রীকৃষ্ণের দ্বিভুজত্ব, গোলোক নিরূপণ, বৃন্দাবন আদি শ্রীকৃষ্ণের নিত্যধাম, গোলোক ও বৃন্দাবনের অভিন্নত্ব, যাদব ও গোপেরা শ্রীকৃষ্ণের নিত্য পরিকর, শ্রীকৃষ্ণের প্রকটলীলা ও অপ্রকট লীলা, প্রকট ও অপ্রকট লীলার সমন্বয়, গোকুলে শ্রীকৃষ্ণের প্রকাশ, স্বারকায় মহিষীরা তাঁর স্বরূপশক্তির প্রকাশ, তাঁদের থেকেও ব্রজগোপিকাদের উৎকর্ষ আদি বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে। এই গ্রন্থে গোপিকাদের নাম বর্ণনা করা হয়েছে এবং শ্রীমতি রাধারাণীর সর্বোৎকর্ষতা নিরূপিত হয়েছে।

   পঞ্চম সন্দর্ভের নাম ‘ভক্তিসন্দর্ভ’। এই গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে, কীভাবে সাক্ষাৎভাবে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করা যায় এবং কীভাবে অন্বয় ও ব্যতিরেকভাবে সেবা সম্পাদন করা যায়। এই গ্রন্থে সমস্ত শাস্ত্রের জ্ঞান, বৈদিক বর্ণাশ্রম-ধর্মের-আচরণ এবং ভগবদ্ভক্তি যে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম প্রভৃতি আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভগবদ্ভক্তিবিহীন ব্রাহ্মণও নিন্দনীয়। এই গ্রন্থে কর্মত্যাগ (ভগবানে অর্পিত কর্ম), অষ্টাঙ্গযোগ ও মনোধর্ম—প্রসূত জ্ঞানকে অর্থহীন পরিশ্রম বলে অনুযোগ করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজার চেয়ে ভগবদ্ভক্ত-বৈষ্ণবের পূজার উৎকর্ষ প্রতিপন্ন হয়েছে। সেখানে আলোচনা করা হয়েছে, কীভাবে এ জন্মেই জীবন্মুক্ত হওয়া যায়। দেবাদিদেব মহাদেবকে ভগবদ্ভক্তরূপে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ভক্ত ও ভক্তির নিত্যত্ব নিরূপিত হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভক্তির মাধ্যমে সবরকম সাফল্য অর্জন করা যায়, কেননা ভগবদ্ভক্তি জড় জগতের সমস্ত গুণের অতীত। সেখানে আরো আলোচনা করা হয়েছে, কীভাবে ভক্তির মাধ্যমে আত্মার প্রকাশ হয়। ভক্তির মাধ্যমে চিন্ময় আনন্দ লাভ এবং এমনকি অপূর্ণ ভগবদ্ভক্তির ফলে কীভাবে পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় লাভ করা যায় তার বর্ণনাও করা হয়েছে এবং অহৈতুকী ভক্তির প্রশংসা করা হয়েছে এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে —  ভক্তসঙ্গের প্রভাবে কীভাবে অহৈতুকী সেবার স্তরে উন্নত হওয়া যায়। সেখানে মহাভাগবত ও সাধারণ ভক্তের পার্থক্য আলোচনা করা হয়েছে এবং মনোধর্ম-প্রসূত জ্ঞানের লক্ষণ, অহংগ্রহোপাসনা বা নিজের পূজা করার লক্ষণ, ভগবদ্ভক্তির লক্ষণ, মনোকল্পিত সিদ্ধির লক্ষণ, বৈধীভক্তি স্বীকার, গুরুসেবা, মহাভাগবত (মুক্তভক্ত) এবং তাঁর সেবা, বৈষ্ণবসেবা, শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, বন্দন, পাদসেবন, দাস্য, সখ্য, আত্মনিবেদন, সেবা-অপরাধ, অপরাধের ফল —  এই সমস্ত বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। রাগানুগাভক্তি (স্বতঃস্ফূর্ত ভগবদ্ভক্তি), কৃষ্ণভক্ত হওয়ার বৈশিষ্ট্য এবং সিদ্ধির ক্রম সম্বন্ধেও আলোচনা করা হয়েছে।

   ষষ্ঠ সন্দর্ভের নাম ‘প্রীতিসন্দর্ভ’। এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ভগবৎ প্রীতির মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে জীবনের চরম উদ্দেশ্য সাধন করা যায়। এখানে সবিশেষ ও নির্বিশেষ মুক্তির পার্থক্য নিরূপণ করা হয়েছে এবং জীবন্মুক্তি ও জড় বন্ধনমুক্তির আলোচনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থে সর্বপ্রকার মুক্তির মধ্যে ভগবৎ—প্রেম জনিত মুক্তিকে সর্বোৎকৃষ্ট বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং পরমেশ্বর ভগবানকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করাকে পরম পুরুষার্থ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে সদ্য মুক্তির সঙ্গে ক্রমপর্যায়ে লব্ধ মুক্তির পার্থক্য নিরূপিত হয়েছে। ব্রহ্ম—সাক্ষাৎকার ও ভগবৎ সাক্ষাৎকারকে জীবন্মুক্তি বলে বর্ণনা করা হয়েছে, তবে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয়ভাবে ভগবৎ সাক্ষাৎকার যে সর্বশ্রেষ্ঠ তা নিরূপিত হয়েছে। ভগবৎ—উপলব্ধিকে ব্রহ্মজ্ঞানের বহু উপরের বিষয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সালোক্য, সামীপ্য ও সারাপ্য মুক্তির তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। সালোক্য মুক্তির থেকে সামীপ্য মুক্তি শ্রেয়। ভগবদ্ভক্তির মুক্তিত্ব ও উপাদেয়ত্ব আলোচনা করা হয়েছে এবং কীভাবে তা লাভ করা যায় তাও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ভগবদ্ভক্তির স্তরে অধিষ্ঠিত হলে জীব যে চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত হয়, সেই কথা এবং ভগবৎ-প্রেমের যথার্থ স্থিতি সম্বন্ধেও আলোচনা করা হয়েছে। চিন্ময় প্রেমের তটস্থ লক্ষণ, তার উন্মেষ, তথাকথিত প্রেম ও ভগবৎ-প্রেমের পার্থক্য, বিভিন্ন প্রকার রস এবং ব্রজদেবীদের কামের শুদ্ধ প্রেমত্ব সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। জ্ঞানের সঙ্গে ভক্তির মিশ্রণ, গোপীর প্রেমের চরম উৎকর্ষ, ঐশ্বর্যপর ভক্তি ও মাধুর্যপর ভক্তির পার্থক্য, গোকুলবাসীদের শ্রেষ্ঠতা, তাঁদের থেকে শ্রীকৃষের সখা গোপগণের, বাৎসল্য রসে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত গোপ-গোপীদের উৎকর্ষ এবং চরমে ব্রজগোপীদের এবং তাদের মধ্যে আবার শ্রীমতি রাধারাণীর প্রেমের উৎকর্ষ বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আরো আলোচনা করা হয়েছে, অনুকরণ করার মাধ্যমেও কীভাবে চিন্ময় অনুভূতির বিকাশ হয় এবং এই অনুভূতি জড়-জাগতিক কাম থেকে অনেক উৎকৃষ্ট। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের দিব্যভাব, ভাবের উদ্দীপন, দিব্য গুণাবলি, ধীরোদাত্ত আদি ভেদ, মাধুর্যপ্রেমের চরম আকর্ষকতা, অনুভাব, সঞ্চারী স্থায়ীভাব, পাঁচটি মুখ্যরস ও সাতটি গৌণরস সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। পরিশেষে রসাভাস, শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মাধুর্য, সম্ভোগ ও বিপ্রলম্ভ, পূর্বরাগ, মান, প্রেমবৈচিত্র্য, প্রবাস এবং শ্রীমতি রাধারাণীর মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে।  — হরেকৃষ্ণ

উৎস: শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত মধ্যলীলা ১ম পরিচ্ছেদ, শ্লোক ৪৩।

শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ
শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ
জগন্নাথের রথযাত্রা  এক বিশ্বজোড়া উৎসব
জগন্নাথের রথযাত্রা এক বিশ্বজোড়া উৎসব
সনাতন ধর্মের  মৌলিক জিজ্ঞাসা
সনাতন ধর্মের মৌলিক জিজ্ঞাসা
মহাত্মাদের উৎপীড়নের পরিণাম
মহাত্মাদের উৎপীড়নের পরিণাম
একাদশী কেবল বিধবাদের জন্য নয়
একাদশী কেবল বিধবাদের জন্য নয়
হ্যাপি  নিউ ইয়ার
হ্যাপি নিউ ইয়ার
আমাদের গুপ্তধন
আমাদের গুপ্তধন
ইস্কনের লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য কার্যর্ক্রম
ইস্কনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কার্যর্ক্রম
বৈদিক শাস্ত্রের শ্রেণিবিভাগ
বৈদিক শাস্ত্রের শ্রেণিবিভাগ
ভয় থেকে মুক্তি
ভয় থেকে মুক্তি