জগন্নাথের রথযাত্রা  এক বিশ্বজোড়া উৎসব
জগন্নাথের রথযাত্রা এক বিশ্বজোড়া উৎসব
✍ সুদর্শন নিমাই দাস
১৪ জুলাই ২০২৬
বর্ষ: 2025  |  ইস্যু: ২য় সংখ্যা

জগতের নাথ ‘জগন্নাথ’। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা অন্যতম। জগন্নাথদেব স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ; রথযাত্রায় তাঁর সঙ্গে থাকেন ভ্রাতা বলদেব ও ভগিনী সুভদ্রা। ভক্তবিরহে ভগবানের করুণাঘন রূপই জগন্নাথ। সাধারণত ভক্ত ভগবানকে দর্শনের জন্য মন্দিরে যাত্রা করেন। কিন্তু মন্দিরে গিয়ে ভগবানকে দর্শনের সুযোগ বা সৌভাগ্য সকলের হয় না। জগন্নাথ এত করুণাময় যে, সবাইকে দর্শন ও কৃপাশীর্বাদ দানের জন্য তিনি দু’বাহু প্রসারিত করে নিজেই রাজপথে যাত্রা করেন। প্রতি বছর আষাঢ়ের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

রথযাত্রা ভারতে উড়িষ্যা রাজ্যের পুরী শহরের এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। বহু প্রাচীনকাল থেকে এই রথযাত্রা উৎসব কেবল সেখানেই উদ্যাপিত হতো। তবে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)—এর মাধ্যমে এটি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে এক বিশাল ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

১৯৬৫ সালে ইস্কনের প্রতিষ্ঠাতা—আচার্য শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কতৃর্ক ইস্কন প্রতিষ্ঠিত হলে, তিনি পৃথিবীজুড়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজন করতে শুরু করে। শ্রীল প্রভুপাদ মনে করতেন যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা এবং রথযাত্রার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব পৃথিবীজুড়ে পৌঁছানো উচিত। এটি ছিল তাঁর গুরুদেবের নির্দেশ। ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো ইস্কন আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে রথযাত্রার আয়োজন করে। ভারতবর্ষের বাইরে পাশ্চাত্য দেশে এটি ছিল প্রথম রথযাত্রা এবং সেই থেকেই ইস্কনের মাধ্যমে রথযাত্রার বিশ্বায়ন শুরু হয়।

ইসকন—এর রথযাত্রা এখন বিশ্বব্যাপী বহু শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর যেমন নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো, এমনকি কানাডার টরন্টো, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনেও জগন্নাথদেবের রথযাত্রা পালন করা হয়। জাপান, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, ফ্রান্স, আফ্রিকা প্রভৃতি সকল দেশের প্রায় সবকটি বড় শহরে এই রথযাত্রা এক দিব্য আনন্দের উৎসব। তাই শুধু পাশ্চাত্য নয়, পৃথিবীর উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যেও সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হয় জগন্নাথের রথযাত্রা। হাজার হাজার মানুষ এই রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করে এবং এটি এক বিশাল আধ্যাত্মিক আনন্দের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রথযাত্রার মূল উদ্দেশ্য শুধু আধ্যাত্মিক ভক্তি প্রকাশ নয়, বরং এটি একটি সবার জন্য উন্মুক্ত অনুষ্ঠান যা সামাজিক একতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার বার্তা দেয়। এখানে ধনী—দরিদ্র, সাদা—কালো প্রভৃতি জাতি—ধর্ম—বর্ণ নির্বিশেষে ভেদাভেদ ভুলে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়। ইস্কন রথযাত্রার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শান্তি, প্রেম ও সহানুভূতির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। প্রভুপাদ চেয়েছিলেন যে রথযাত্রার মাধ্যমে মানুষের মনে আধ্যাত্মিক আনন্দ ও প্রশান্তি আসুক, যা প্রতিদিনের জীবনের সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি দেওয়ার এক শক্তিশালী উপায়।

বিশ্বজুড়ে রথযাত্রার সফল আয়োজনের মাধ্যমে ইস্কন প্রমাণ করেছে যে, আধ্যাত্মিক উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নয়, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে, যা সমস্ত মানুষের মধ্যে একতা এবং সম্প্রীতি তৈরি করতে সহায়ক। আজকের দিনে, জগন্নাথদেবের রথযাত্রা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান তৈরি করেছে এবং এটি এক মহান আধ্যাত্মিক আন্দোলনের অগ্রগতির বার্তা দিচ্ছে। তাই রথযাত্রা এখন এক বিশ্বজোড়া উৎসব। আসুন, আমরা সকল হিংসা—বিভেদ ভুলে বিশ্বজোড়া এই সম্প্রীতির উৎসবে মিলিত হয়ে জীবনকে শান্তিময় ও আনন্দময় করে তুলি।

 — হরেকৃষ্ণ

শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ
শ্রীজীবের ষট্সন্দর্ভ
জগন্নাথের রথযাত্রা  এক বিশ্বজোড়া উৎসব
জগন্নাথের রথযাত্রা এক বিশ্বজোড়া উৎসব
সনাতন ধর্মের  মৌলিক জিজ্ঞাসা
সনাতন ধর্মের মৌলিক জিজ্ঞাসা
মহাত্মাদের উৎপীড়নের পরিণাম
মহাত্মাদের উৎপীড়নের পরিণাম
একাদশী কেবল বিধবাদের জন্য নয়
একাদশী কেবল বিধবাদের জন্য নয়
হ্যাপি  নিউ ইয়ার
হ্যাপি নিউ ইয়ার
আমাদের গুপ্তধন
আমাদের গুপ্তধন
ইস্কনের লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য কার্যর্ক্রম
ইস্কনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কার্যর্ক্রম
বৈদিক শাস্ত্রের শ্রেণিবিভাগ
বৈদিক শাস্ত্রের শ্রেণিবিভাগ
ভয় থেকে মুক্তি
ভয় থেকে মুক্তি