পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মমত প্রচলিত আছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা একজনই। তাঁকে একেকজন একেক নামে সম্বোধন করছেন। সেই পরম স্রষ্টার সঙ্গে জীবের যে নিত্য সম্বন্ধ, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সেবা নিবেদনের যে প্রবৃত্তি, তা-ই সমস্ত জীবের সনাতন ধর্ম,
যা সকল জাতি-বর্ণের ঊর্ধ্বে
সনাতন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়?
প্রত্যেকের কাছে নিজ নিজ ধর্মমতই সঠিক ও শ্রেষ্ঠ। তবে নিরপেক্ষভাবে ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করতে হলে, ধর্মীয় দর্শন ও জ্ঞানের গভীরতা, সংস্কৃতি, আচার — অনুষ্ঠান, শিক্ষা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রভৃতি বিচার করে দেখতে হবে। তাছাড়া, আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, জীবের ধর্ম স্রষ্টার সেবা করা। কিন্তু এই সেবা কার্যটি করার আগে আমাদের জানতে হবে — আমাদের প্রকৃত স্বরূপ কী? আমাদের স্রষ্টা কে? তিনি কেমন? কোথায় থাকেন? কী করেন? তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক কী? কীভাবে তাঁর সেবা করা যায়? কীভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করা যায় প্রভৃতি। সেই ধর্মই শ্রেষ্ঠ বলে গ্রহণ করা উচিত, যেখানে স্রষ্টা ও ধর্মতত্ত্ব (যেমন, ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি, কর্ম ও কাল প্রভৃতি) সম্পর্কে এজাতীয় প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে যৌক্তিক ও স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় এবং সবচেয়ে উন্নত জ্ঞান লাভ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ —
পৃথিবীতে প্রচলিত প্রায় সব ধর্মমতেই কিছু সাধারণ জ্ঞান থাকে। যেমন — ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, তিনি মহান, তিনি সবকিছুর স্রষ্টা, তাঁর আরাধনা করা উচিত, তাঁর নির্দেশ অমান্যকারীর শাস্তিভোগ করতে হয় এবং তাঁর অনুসারী হলে শান্তি লাভ করা যায় প্রভৃতি। এগুলো দিয়ে ধর্মের শ্রেষ্ঠতা বিচার করা যুক্তিসঙ্গত নয়। ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করতে হবে আরো সূক্ষ্ম জ্ঞানের মাধ্যমে। যেমন — পৃথিবীতে প্রচলিত অনেক ধর্মমতই বলে — “ঈশ্বর নিরাকার”। একটু চিন্তা করুন; যার আকারই নেই, তার থাকার নির্দিষ্ট স্থানও থাকতে পারে না, তার রূপের ধারণাও এখানে অস্পষ্ট এবং তার কার্যকলাপও সীমিত। তাছাড়া, রূপ ধারণ করতে না পারা ঈশ্বরের অপারগতা, যা তাঁর ‘সর্বশক্তিমান’ গুণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া, স্রষ্টার হাত নেই, পা নেই, চোখ — কান নেই বলার মাধ্যমে তাঁকে পঙ্গু, অন্ধ, বধির প্রমাণিত করা স্রষ্টার প্রতি অবমাননা। অথচ সনাতন ধর্ম বলে — “এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর তিনভাবে উপলব্ধ হন — নিরাকার ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবান। ষড় — ঐশ্বর্যপূর্ণ সাকার ‘ভগবান’ রূপে তিনি তাঁর ধামে সর্বদা বিরাজমান; সেখানে তিনি তাঁর অন্তরঙ্গ শুদ্ধভক্ত ও নিত্যমুক্ত জীবদের সেবাগ্রহণ করেন। সর্বশক্তিমত্তাবলে সেখানে থেকেও তিনি বহুরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। তাঁর দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটাই ‘নিরাকার ব্রহ্ম’-রূপে সর্বত্র বিরাজমান। আবার তিনিই ‘পরমাত্মা’-রূপে প্রত্যেক জীবের হৃদয়ে অবস্থান করেন; পরমাত্মারূপে তিনি জীবের সমস্ত কর্মের সাক্ষী, অনুমোদনকর্তা ও ফলদাতা।” এই দর্শন ও জ্ঞান, “ঈশ্বর নিরাকার” — এই সাধারণ জ্ঞান অপেক্ষা নিঃসন্দেহে গভীর ও উন্নততম। তাই নয় কি? সনাতন ধর্ম বলে — “পরমেশ্বরের প্রাকৃত বা জড় রূপ নেই, কিন্তু তাঁর অপ্রাকৃত বা চিন্ময় রূপ রয়েছে। তাঁর জড় রূপ নেই এবং আমাদের জড় চক্ষু দ্বারা তাঁর চিন্ময় রূপ আমরা দেখতে পাই না; তাই বেদে তাঁকে অরূপ বলা হয়েছে। আবার, বেদে একই সাথে তাঁকে দিব্যরূপসম্পন্নও বলা হয়েছে। তিনি দ্বিভুজ, শ্যাম বর্ণ, পীতবসন পরিহিত, পদ্মপাপড়ির মতো তাঁর দুটো চোখ, তিনি চির তরুণ পরমপুরুষ।” স্রষ্টা সম্পর্কে এত স্বচ্ছ ধারণা ও গভীর জ্ঞান প্রদান করে সনাতন ধর্ম।
ধর্মের চারটি স্তম্ভ — দয়া, তপ, সত্য ও শৌচ; এগুলো যথাক্রমে মাংসাহার, নেশা, দ্যূতক্রীড়া (জুয়া) ও অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক — এই চারটি পাপকর্মের কারণে নষ্ট হয়। এই চারটি বিধি-নিষেধ সবচেয়ে কঠোর ও সুচারুভাবে পালনের শিক্ষা দেয় সনাতন ধর্ম।
অন্যান্য ধর্মে যেখানে নিজের জাগতিক দুঃখ-নিবৃত্তির জন্য মুক্তি লাভ অথবা পরকালে নির্বিঘ্নভাবে ইন্দ্রিয় সম্ভোগকেই জীবনের পরম লক্ষ্য বলা হয়েছে, সেখানে নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনা, এমনকি মুক্তিলাভের বাসনাও সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে কেবল ভগবানের সন্তুষ্টির জন্য তাঁর সেবাকেই জীবনের পরম লক্ষ্যরূপে শিক্ষা দেয় সনাতন ধর্ম।
এছাড়া, শুধু মানুষ নয়, সমস্ত জীবের প্রতি সম্মান, দয়া, অহিংসা, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার সর্বোত্তম শিক্ষা দেয় সনাতন ধর্ম। বেদ বলে —
সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ।
সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু মা কশ্চিৎ দুঃখভাগ্ভবেৎ।
অর্থাৎ, “জগতে সকলে সুখী হোন, নিরোগ হোন এবং শান্তি লাভ করুন, কেউ যেন দুঃখ ভোগ না করে।”
অন্যান্য ধর্মে আত্মা সম্পর্কে খুব সামান্য ধারণা রয়েছে — যেমন, আত্মা স্রষ্টার আদেশ মাত্র বা শক্তি মাত্র প্রভৃতি; কিন্তু সনাতন ধর্মে তা রয়েছে বিশদভাবে — আত্মা কী, তার আয়তন, বৈশিষ্ট্য, কীভাবে আত্মা দেহান্তরিত হয় প্রভৃতি। ভগবান ও দেবদেবী সম্পর্কেও সনাতন ধর্মে সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে — ভগবান পরম আরাধ্য, দেবদেবীগণ তার আজ্ঞাবহ।
মৃত্যুপরবর্তী জীবন তথা জন্মান্তর ও কর্মফলের বিষয়ে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ও বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান প্রদান করে সনাতন ধর্ম। ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি, কর্ম ও কাল সম্পর্কে সবচেয়ে গভীর ও উন্নত জ্ঞান প্রদান করে সনাতন ধর্ম। দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রসে ভগবানের সেবা করার পথ প্রদর্শন করে সনাতন ধর্ম। সনাতন ধর্মের উৎকর্ষের এমন আরো অসংখ্য বিষয় রয়েছে (এই ধারাবাহিকে একে একে এসকল বিষয়ে আলোচনা করা হবে)। অতএব, সনাতন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব কোথায় তা আশা করি সুধী পাঠকবৃন্দ বিচার করতে সক্ষম হবেন।
সনাতন ধর্মে শাক্ত, শৈব, সৌর, গাণপত্য, বৈষ্ণব মত বলতে কী বোঝায়?
পরমেশ্বর ভগবান সর্বশক্তিমান। যারা তাঁর শক্তির (তথা দুর্গা, কালী প্রমুখ দেবীর) উপাসনা করে, তাদের বলা হয় শাক্ত। শিবের উপাসকদের বলা হয় শৈব; সূর্যদেবের উপাসকদের সৌর; গণেশের উপাসকদের গাণপত্য এবং কৃষ্ণ বা বিষ্ণুর উপাসকদের বলা হয় বৈষ্ণব। কৃষ্ণের উপাসকদের কেউ কেউ কাষ্ণর্ বলে থাকেন; তবে যেহেতু বিষ্ণু ও কৃষ্ণ অভিন্ন, তাই তারাও বৈষ্ণব।
সনাতন ধর্মে শাক্ত, শৈব, সৌর, গাণপত্য, বৈষ্ণব, দেবোপাসনা, নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা — এত মতপথ কেন?
সাধারণ দোকানে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য পাওয়া যায়, কিন্তু সুপার মার্কেটে প্রায় সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায় এবং ক্রেতারা তাদের পছন্দ বা প্রয়োজন অনুসারে পণ্য ক্রয় করেন। তেমনই সনাতন ধর্ম সকল ধর্মের মূল এবং এর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। তাই এখানে প্রত্যেকে তাদের বাসনা অনুসারে ধর্ম অনুশীলন করে। মানুষের পছন্দ ও প্রয়োজন তথা বাসনা যে ভিন্ন ভিন্ন হয়, তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে। কেউ স্বর্গে গিয়ে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করতে চায়, কেউ পৃথিবীতেই বিপুল ঐশ্বর্য লাভ করতে চায়, কেউ বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞানের অধিকারী হতে চায়; কেউ জড় জগতের দুঃখ-কষ্ট থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করতে চায়; আবার কেউ এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে কেবল ভগবানের সেবা করতে চায়। যদিও কেবল ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের উপাসনার দ্বারা সবকিছুই লাভ করা যায়, কিন্তু এই বোধ-উদয় সবার সহজে হয় না। কারণ সত্ত্ব, রজো ও তম — প্রকৃতির এ তিন গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জীব তার কৃত কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ এবং অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন থাকে। যেমন, ঘোর তমোগুণে আচ্ছন্ন ব্যক্তির পক্ষে শুদ্ধসত্ত্ব স্তরের জ্ঞান বুঝতে পারা সহজসাধ্য নয়। তাই বৈদিক শাস্ত্রে বিভিন্ন লক্ষ্যে, নিকৃষ্ট তমোগুণের আরাধনা থেকে শুদ্ধসত্ত্ব বা গুণাতীত স্তরের আরাধনা পর্যন্ত বিভিন্ন আরাধনার পথ প্রদর্শিত হয়েছে, যেন কোনো না কোনোভাবে মানুষ আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং ক্রমান্বয়ে কোনো না কোনো সময় তারা যেন ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হয়ে জীবনের পরম সিদ্ধি লাভ করতে পারে। এ কারণেই সনাতন ধর্মে এত মতপথ।
তবে অনেক মতপথ থাকলেও বেদে সর্বদেবের আরাধ্য বিষ্ণুর উপাসনাকেই পরম বা সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে — তদ্ বিষ্ণো পরমং পদং (ঋগ্বেদ)। শ্রীকৃষ্ণই বিষ্ণুরূপে জগৎ পালন করেন, শিবরূপে সংহার করেন, সমস্ত শক্তি তাঁরই অধীন, তাঁরই দ্বারা শক্ত্যাবিষ্ট হয়ে গণপতি সিদ্ধি প্রদান করেন। তাঁর উপাসনার দ্বারা সমস্ত ফল তথা সর্বসিদ্ধি লাভ হয়। তিনিই সর্বকারণের পরম কারণ — বাসুদেব সর্বম্ (গীতা)। মহাভারত বলে —
যে চ বেদবিদো বিপ্রা যে চাধ্যাত্মবিদো জনাঃ।
তে বদন্তি মহাত্মনং কৃষ্ণং ধর্মং সনাতনম্ ।
“যিনি সঠিকভাবে বেদ অধ্যয়ন করেছেন, যিনি প্রকৃত বিপ্র অথবা বেদজ্ঞ এবং যিনি আধ্যাত্মিক জীবন সম্বন্ধে অবগত, তিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী অনুসরণ করাকেই জীবের সনাতন ধর্ম বলে বর্ণনা করেন।”
অতএব, বৈদিক শাস্ত্রে বহু দেবদেবী এবং ভগবানের বহু রূপের উল্লেখ থাকলেও একেশ্বরবাদই সনাতন ধর্মের চরম উপদেশ — একোমেবমদ্বিতীয়ম্ — ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।
সনাতন ধর্মে এত ধর্মগ্রন্থ কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর যত বড় হয়, সেখানে জ্ঞানচর্চার জন্য বিভাগের সংখ্যাও তত বেশি হয়। সনাতন ধর্মেও তাই এত বৈচিত্র্য, এত ধর্মগ্রন্থ। শিশুদের জন্য বাংলা, গণিত, ইংরেজি প্রভৃতির জন্য একটি বই থাকে; যেমন একের ভেতর তিন। কিন্তু সেই শিশুরাই বড় হলে এই প্রত্যেক বিষয় আলাদা আলাদা বই থেকে অধ্যয়ন করে। তেমনই সনাতন ধর্মে রয়েছে বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার; বিভিন্ন বিষয়ের জন্য রয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থ। চেতনার বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাদের রুচি ও প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করে। তাই সনাতন ধর্মে এত ধর্মগ্রন্থ।
‘হিন্দু’ ধর্ম নয়, ‘সনাতন’ ধর্ম; তাহলে হিন্দু নামটি কীভাবে এলো?
‘হিন্দু’ শব্দটি একটি জাতি বা সম্প্রদায়কে নির্দেশ করে। কিন্তু ধর্ম কোনো দেশ বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়; উপরন্তু তা স্বাভাবিক বৃত্তি। ‘হিন্দু’ কোনো সংস্কৃত শব্দ নয়। বৈদিক সাহিত্যের কোথাও এই হিন্দু শব্দটি পাওয়া যায় না। জানা যায় যে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট সর্বপ্রথম সিন্ধু নদকে ইন্দো বলে পরিচিতি দান করেন। কারণ, গ্রিকদের জন্য ‘স’ উচ্চারণ করাটা কিছুটা কঠিন ছিল। ঠিক যেমনটা আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাই — উত্তরবঙ্গের কিছু কিছু এলাকার
অধিবাসীরা ‘র’ উচ্চারণ করতে পারে না, তারা রংপুরকে অংপুর বলে; আবার নোয়াখালী অঞ্চলের অধিবাসীরা ‘পানিকে বলে ‘হানি’। এভাবে দেখা যায় যে, কিছু কিছু অঞ্চলের তাদের নিজস্ব ভাষাগত কিছু দিক রয়েছে। তেমনই গ্রিকরা সিন্ধু নদ না বলে ইন্দু নদ বলত। সেই সময়টা ছিল ৩২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আলেকজান্ডারের সৈন্যরা সিন্ধু নদের তীরবর্তী অঞ্চলকে ইন্ডিয়া বলত। পরবর্তীকালে আফগানিস্তান এবং পারস্যদেশের (বর্তমান ইরান) আক্রমণকারীরা সিন্ধু নদকে হিন্দু নদ বলত। তখন থেকে ভারতের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সিন্ধুনদের অববাহিকায় বসবাসরতদের তারা হিন্দু বলে ডাকত এবং ঐ সকল স্থানকে হিন্দুস্থান বলত। কারণ সংস্কৃত ‘স’ ফার্সি ভাষায় ‘হ’ উচ্চারিত হয়। কিন্তু তখনকার সময়ে সিন্ধুতীরবর্তী মানুষেরা তাদের হিন্দু বলে পরিচয় দিত না। কেবল পারস্যরা সেই জনগোষ্ঠীর অবস্থান এবং ধর্মীয় মনোভাবকে নির্দেশ করার জন্য তাদের হিন্দু বলে ডাকত।
কিন্তু মূল সমস্যাটা শুরু হলো তখন, যখন ভারতীয় বা ইন্ডিয়ানদের হিন্দু বলে সম্বোধন করা শুরু হয়। ব্রিটিশরা ভারতীয় এবং মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত করার জন্য ভারতীয়দের হিন্দু বলে সম্বোধন করত। এটা মূলত ভারতবর্ষে বিভাজন তৈরির মাধ্যমে তাদের আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল ছিল।
অতএব, হিন্দু শব্দটি একটি দৈহিক ও আঞ্চলিক পরিচয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কালক্রমে একশ্রেণির লোকের প্রদত্ত নামই এখন পুরো ভারতবর্ষে বৈদিক সংস্কৃতি পালনকারীদের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে নামের সাথে বৈদিক ইতিহাসের কোনো সংযোগ নেই।
এই বৈদিক পরমার্থ অনুশীলনের পন্থাকে সনাতন ধর্ম বলা হয়, যা কোনো দেহগত পরিচয় নয়, বরং জীবের নিত্য সত্তা পরমেশ্বরের দাস হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের পুনঃস্থাপন করতে পারি। এটাই বৈদিক জ্ঞানের উদ্দেশ্য। বৈদিক সাহিত্য তথা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, উপনিষদ, পুরাণসমূহ কেবল হিন্দুদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জগতের সকলের কল্যাণের জন্য। পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মমত প্রচলিত আছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সকলের এক। তাকে একেকজন একেক নামে সম্বোধন করছেন। সেই পরম স্রষ্টার সঙ্গে জীবের যে নিত্য সম্বন্ধ, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সেবা নিবেদনের যে প্রবৃত্তি, তা — ই জীবের সনাতন ধর্মর্, যা সকল জাতি — বর্ণের ঊর্ধ্বে। — হরেকৃষ্ণ