অতি দক্ষ সাঁতারুও যদি মাঝসমুদ্রে পতিত হয়, তবে তিনি কেবল নিজ প্রচেষ্টায় সেখান থেকে উত্তীর্ণ হতে পারবেন না, তার অন্য কারো সাহায্য প্রয়োজন। তেমনই এই ভবসমুদ্রে পতিত জীব কেবল নিজ চেষ্টায় এখান থেকে উত্তীর্ণ হতে পারবে না, কিন্তু ভগবানের শরণাপন্ন হলে ভগবান কৃপা করে আমাদের এখান থেকে মুক্ত করবেন।
আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন — জীবের এই চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি হলো ভয়। বিপদসংকুল এ জড়জগতে প্রতিটি জীব ভয়যুক্ত। ভয় কারা করে? যাদের রক্ষণাবেক্ষণের কেউ থাকে না, তারাই ভয়ে ভীত হয়। শাস্ত্রে বলা হয়েছে — ভয়ম্ দ্বিতীয় অভিনিবেশম্। দ্বিতীয় অভিনিবেশ বলতে বোঝানো হচ্ছে, ভগবান ব্যতীত অন্য কারোর ওপর নির্ভরশীল হওয়া। সেই নির্ভরশীলতা চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। নির্ভরশীলতার সেই জায়গাটা যখন কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তখন আমাদের জীবনে ভয় নেমে আসে। যতটা না বাহ্যিক সমাজ আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে, তার থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে অন্তরে থাকা ভয়। তাই ভয়কে জয় করা দরকার।
অতি দক্ষ সাঁতারুও যদি মাঝসমুদ্রে পতিত হয়, তবে তিনি কেবল নিজ প্রচেষ্টায় সেখান থেকে উত্তীর্ণ হতে পারবেন না, তার অন্য কারো সাহায্য প্রয়োজন। তেমনই এই ভবসমুদ্রে পতিত জীব কেবল নিজ চেষ্টায় এখান থেকে উত্তীর্ণ হতে পারবে না, কিন্তু ভগবানের শরণাপন্ন হলে ভগবান কৃপা করে আমাদের এখান থেকে মুক্ত করবেন। তাই সকল পরিস্থিতিতে আমাদের ভগবানের প্রতি শরণাগত থাকতে হবে।
শিশু তার পিতার সান্নিধ্যে যখন থাকে, তখন সে নির্ভয়ে খেলতে শুরু করে। সে যেখানেই যাক, চরকিতে উঠুক, ট্রেনে, বাসে কোথাও তার কোনো ভয় থাকে না। কারণ সে ভাবে, যেকোনো পরিস্থিতিতে তার পিতা পাশে আছেন, তিনি তাকে সুরক্ষা প্রদান করছেন। ঠিক তেমনই কৃষ্ণভক্তরা যখন কৃষ্ণের সঙ্গে তাদের একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলেন, সম্পর্ক আরো উন্নত করেন, তখন তারা কৃষ্ণের উপস্থিতি অনুভব করতে পারেন। ফলে তাদের তখন কৃষ্ণের প্রতি ভরসার মাত্রাটা এমন হয় যে, তাদের ভেতরে আর কোনো ভয় থাকে না। ঠিক সেই শিশুর মতো। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এজগতে লীলাবিলাসকালে বসুদেব ও দেবকীকে তাঁর পিতামাতারূপে গ্রহণ করেছিলেন। মাতুল কংস তাদের কম নির্যাতন করেনি; বিনা অপরাধে তাদের কারাগারে বন্দী করে রেখেছিলেন। কংসের অত্যাচারের ফলে কারাগারের পরিস্থিতি কিন্তু কম ভিতীকর ছিল না। আর সেখানেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হলেন।
তবে শ্রীকৃষ্ণের পিতা-মাতা কিন্তু সাধারণ জীব ছিলেন না। তারা পিতামাতারূপে শ্রীকৃষ্ণের লীলায় কেবল সহায়তা করেছেন; তারা তাঁর শুদ্ধ ভক্ত। তা সত্ত্বেও তারা কংসদ্বারা পীড়িত ছিলেন। তথাপি সেই অবস্থায়ও তারা কিন্তু ভয়ভীত ছিলেন না। কেন? কারণ তাদের ভরসা ছিল, যিনি সকলের রক্ষাকর্তা পরমেশ্বর, তিনি আসবেন, আর এসে দুবৃর্ত্ত কংসকে বধ করে তাদের মুক্ত করবেন। ভগবানের প্রতি এই ভরসায়ই তারা নির্ভয়ে ছিলেন।
আবার, যদি আমরা ব্রজবাসীদের কথা চিন্তা করি, তাদের ওপর কিন্তু বিভিন্ন অসুরের উপদ্রব ছিল, কিন্তু তারা কোনো প্রকার ভয়ে ভীত ছিলেন না। তবে, তারা ভয় পেত — কৃষ্ণের কোনো ক্ষতি হয় কি না। কৃষ্ণ পরমেশ্বর, তিনি অজ, অমর। তবু কৃষ্ণের প্রতি অপার ভালোবাসার কারণেই তারা কৃষ্ণের অনিষ্ট হবার আশঙ্কা করতেন। কিন্তু নিজেদের জন্য তাদের কোনো ভয় ছিল না। ব্রজে প্রতিকূল পরিবেশেও গোপবালকেরা আনন্দে খেলা করতে পারতো, কারণ তাদের শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভরসা ছিল। যেমন, মা যশোদা রক্ষা মন্ত্র পড়তেন কৃষ্ণের সুরক্ষার জন্য। তার মানে এই নয় যে, মা যশোদা ভয় পেতেন। কৃষ্ণের প্রতি স্নেহ বা প্রীতিবসত মা যশোদা তা করতেন, এটা আলাদা প্রসঙ্গ।
একইভাবে, আমরা যদি ধ্রুব মহারাজের জীবনী আলোচনা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই, ধ্রব মহারাজ পাঁচ বছরের শিশু অবস্থায় অন্ধকারাচ্ছ গভীর বনে প্রবেশ করেছেন, কৃষ্ণকে পাবেন, কৃষ্ণকে তপস্যার দ্বারা লাভ করবেন — সেই অভিলাষে। সেজন্য তিনি এতটা দৃঢ়সংকল্প ছিলেন যে, তিনি ভয়ংকর বনের মধ্যে, যেখানে হিংস্র পশুরা ছিল, সেখানেও তিনি কোনো প্রকার ভয়ে ভীত ছিলেন না। তিনি শুধু শ্রীহরিকে অন্বেষণ করছিলেন — কোথায় তাকে পাওয়া যাবে। তারপর তিনি বৃন্দাবনের মধুবনে ভগবানকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন।
প্রহ্লাদ মহারাজের জীবনীতে দেখা যায়, তিনি তার পিতার মতাদর্শী না হওয়ার কারণে, পিতার জন্যই কত প্রকার অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তার পিতা ভোগবাদী মতাদর্শের মানুষ ছিলেন, আর তিনি ছিলেন পরম ভোক্তা পরমেশ্বর ভগবানের মতাদর্শী। তাই একই মতাদর্শী না হওয়ার দরুন, তার নিজের পিতা তার জন্য অনেক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন। আমাদেরও বিপদের শেষ নেই, কে যে কীভাবে আমাদের জন্য বিপদ তৈরি করছে বা বিপদ সৃষ্টি হচ্ছে, কার যে হিংসার শিকার হচ্ছি আমরা, তা বলা দুষ্কর।
যেমন হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদের জন্য বিপদ সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনই আমাদের জীবনেও একের পর এক বিপদ আসছে। কিন্তু প্রহ্লাদ মহারাজ এ অবস্থায় কী করেছিলেন? তিনি একমাত্র ভগবানের শরণাগত ছিলেন এবং তিনি ভগবানের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখতেন যে, ভগবান আমাকে অবশই রক্ষা করবেন। যেমন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন —
তুমি তো মারিবে যারে, কে তারে রাখিতে পারে!
তব ইচ্ছা বশ ত্রিভুবন।
অর্থাৎ, “হে ভগবান, তুমি যাকে মারবে, কেউ তাকে রাখতে পারবে না; আর তুমি যাকে রাখবে, কেউ তাকে মারতে পারবে না। সারা জগৎ তোমারই নিয়ন্ত্রণাধীন।” শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর অন্যত্র বলেছেন —
অশোক-অভয়-অমৃত-আধার তোমার চরণদ্বয়।
তাহাতে এখন বিশ্রাম লভিয়া ছাড়িনু ভবের ভয়।
কৃষ্ণ ভক্তগণ কোনো প্রকার ভয়ে ভীত নয়। কারণ তাদের কৃষ্ণের সঙ্গে যে নিত্য সম্পর্ক আছে, সেই সম্পর্কের কারণে তারা জানেন — অবশ্য রক্ষিবে কৃষ্ণ বিশ্বাস পালন; কৃষ্ণ আমাদের সর্বক্ষণ রক্ষা করছেন। যদি আমাদের জীবনে কিছু বিপদ হয়েও থাকে, সেগুলো আমাদের প্রতি কৃষ্ণের অনুগ্রহ, যাতে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে এজগৎ কত দুঃখময়, এটি আমাদের থাকার জায়গা নয়; এটা উপলব্ধি করে যাতে আমারা তারাতারি কৃষ্ণের কাছে ফিরে যেতে পারি।
যেমন কারাগারে যদি সুখের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া হয়, তাহলে তো মানুষ কারাগার থেকে বাইরে যেতে চাইবে না। আবার অপরাধ করবে, আবার কারাগারে যেতে চাইবে, কারাগারটাকে ইচ্ছা করেই সরকার অত্যন্ত দুঃখদায়ক করেছেন, যাতে কারাগারে থাকা মানুষগুলো সংশোধিত হয়ে পুনরায় আর কারাগারে যেতে না চায় এবং কারাগার থেকে যেন শীঘ্রই সে ভালো হয়ে, সভ্য হয়ে আবার তার আনন্দময় স্বাধীন জীবনে ফিরে আসতে পারে। ঠিক তেমনই জড়জগৎ একটা কারাগার, সেই কারাগারে ভগবান ইচ্ছে করেই এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছেন। কারণ আমরা যেন এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে না চাই, আমাদের যেন এই বোধের উদয় হয় যে, আমাদেরকে আমাদের প্রকৃত আলয়ে ফিরে যেতে হবে। সেখানে যাবার জন্য বৈদিক শাস্ত্রে সবচেয়ে সহজ পন্থা হিসেবে কলিযুগে ভগবানের দিব্য ‘নাম-সংকীর্তন’ — এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে — হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। এই নাম-সংকীর্তন যদি আমরা শ্রদ্ধাপূর্বক নিয়মিত করি, তাহলে ঠিক যেমন ভগবানের অভয় চরণে শরণাগত হবার ফলে আমরা ভয় থেকে মুক্ত হতে পারি, তেমনই আমরা আনন্দের সঙ্গে নৃত্য করতে করতে গোলোকবৃন্দাবন তথা ভগবানের ধামে ফিরে যেতে পারি। — হরেকৃষ্ণ