হ্যাপি  নিউ ইয়ার
হ্যাপি নিউ ইয়ার
✍ চৈতন্যচরণ দাস
১৩ জুলাই ২০২৬
ইস্যু: ১ম সংখ্যা


নববর্ষে শুভেচ্ছা ও অভিবাদনের প্রথাটির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ

 বিশ্ব নতুন একটি বর্ষে প্রবেশ করতে চলেছে। আমরা আমাদের সম্মানিত পাঠকদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাই। আসুন আলোচনা করি, আধ্যাত্মিক — বিজ্ঞান চর্চাকারী হিসেবে আমরা শুভেচ্ছা জানানোর এই বিষয়টিকে কীভাবে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি; শুভেচ্ছা জানানোকে কীভাবে আমরা বাস্তবতায় পরিণত করতে পারি। ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বা ‘শুভ নববর্ষ’ শব্দগুচ্ছকে আমরা একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করি।

সময় আসলে কী?

বর্ষ বা বছর শব্দটি দিয়ে শুরু করা যাক। বছর হলো সময় পরিমাপের একটি একক। তাহলে সময় কী? সময়ের বাস্তবতা আমাদের জীবনে সবচেয়ে অনস্বীকার্য সত্য যাকে এমনকি বৈজ্ঞানিকভাবেও সংজ্ঞায়িত করা যায়। এমন হতে পারে, আমরা মহাজাগতিক বস্তু সমূহের স্থানান্তর পর্যবেক্ষণ করে সময় পরিমাপ করি। বৈজ্ঞানিকভাবে আমরা বলতে পারি, যে সময়ে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করে আসে, সেই সময়কে এক বছর বলে বিবেচনা করা হয়। এই প্রদক্ষিণ করার দীর্ঘ পথের কোনো একটি বিন্দুকে কি বিশেষ কিছু বলে বিবেচনা করা যায়? এই পথের কোনো বিন্দুতে নতুন বলে কিছু নেই; বরং পৃথিবী সেই পুরাতন পথ ধরেই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ভেসে চলেছে।

তাহলে ‘নিউ’, ‘নব’ বা ‘নতুন’ অর্থ কী?

জন্মগতভাবে আমারা প্রত্যকেই নতুনের প্রতি আকৃষ্ট হই। কখনো ভেবে দেখেছেন কেন? বিষয়টা এমন নয় যে, কোনো না কোনোভাবে পুরাতন সময়, ব্যক্তি বা বস্তুগুলো অব্যবহারযোগ্য বা অসন্তোষজনক। পুরাতন জীবনব্যবস্থা, সম্পর্ক বা পুরাতন চাকরী; এ সবই আমাদের মধ্যে অসম্পূর্ণতার একটা বোধ জাগ্রত করে। আমরা তাই নতুনের প্রতি আগ্রহ বোধ করি, আর প্রত্যশা করি নতুন কোনোকিছু হয়তো আমাদের সফলতা দেবে। কিন্তু যা কিছু আমরা নতুন বলে বিবেচনা করছি, তা কি আসলেই নতুন কিছু? বাইরের অবয়বটি পরিবর্তন করলেই কি কোনো কিছু নতুন হয়ে যায়? বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, এই মহাবিশ্বের সবকিছুই পরমাণু দিয়ে তৈরি। যা কিছু আমরা চাকচিক্যপূর্ণ, ঝকঝকে নতুন হিসেবে দেখি তা প্রকৃতপক্ষে পদার্থের আণবিক গঠনের পরিবর্তনের কারণেও নয়। ব্যবহারের সময় খুব সামান্য গঠনগত পরিবর্তন করে দিলেই একটি বস্তুকে নতুন বলে প্রতীয়মান হয়। কোটি কোটি বছর আগে তৈরি হওয়া সেই একই পরমাণুতে সেই একই ইলেকট্রন নিরন্তর ঘুরে চলেছে। আমরা শুধু তার ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে পারি মাত্র। তাহলে কি এমন বস্তু আছে যা একজন মানুষ সম্পূর্ণ নতুন বিবেচনায় গ্রহণ করতে পারে? ‘জীবনসঙ্গী’ হতে পারে! কিন্তু তার অর্থও তো, এমন একজনের কাছে যাওয়া যার ত্বকের গঠন হয়ত একটু আলাদা! আর ব্যক্তিত্বের আলোচনা তো একেবারেই অবৈজ্ঞানিক। তাই পদার্থের এই অতি সামান্য ভৌত গঠনগত পার্থক্যের কারণে নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, নতুন জীবন সঙ্গী, নিত্য নতুন ব্যবহার্য জিনিসপত্র; এগুলো কি আসলেই অসার চিন্তা নয়? নতুন বছরে সবকিছু নতুন হবে —  এটা কি আসলেই অলীক কল্পনা নয়? 

সুখের পরস্পর-বিরোধী ধারণা

সুখের ধারণাটিও আমাদের জীবনের আরেকটি মৌলিক বাস্তবতা যা আসলে বৈজ্ঞানিক ধারণার বাইরে। বিষয়টিকে বোঝার সুবিধার জন্য বিজ্ঞানীরা বলেন যে, আনন্দ বা ব্যথার অনুভূতি আসলে আর কিছুই নয়, এটা আসলে আমাদের শরীরে একটা নির্দিষ্ট অংশে সি — ফাইবার বা ডি — ফাইবারের প্রবাহ। তাই বিজ্ঞানও সুখের ধারণার অনিত্যতা স্বীকার করে নিয়ে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে পরিশেষে আসলে সুখী হতে চায়!

বিজ্ঞানই কি সবকিছু?

আমরা জানি নববর্ষের শুভেচ্ছাবার্তাগুলো বেশিরভাগ সময় আন্তরিকভাবেই দেওয়া হয়ে থাকে। তাহলে এগুলোর কি কোনো অর্থই নেই? সমসাময়িক বিজ্ঞান এসব বিষয়গুলোর ওপরই দৃষ্টিপাত করে থাকে। তাহলে, জীবনে সবকিছুই কি বৈজ্ঞানিক। অর্থাৎ, সব কিছুই কি বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? একজন বিজ্ঞানী কি বিবাহের উপহারস্বরূপ তার স্ত্রীকে বুনসেন বার্নার উপহার দেবেন? যদি একজন নিউরোলজিস্ট দেখেন যে, তার স্ত্রী তার ওপর রাগ করেছেন, তাহলে কি তিনি তার স্ত্রীর ব্রেইন স্ক্যান করে কোথায় কি সমস্যা আছে তা খুঁজে দেখবেন? আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু খুব সাধারণ। আমাদের জীবন শুধু কিছু পরমাণু বা যৌগিক পদার্থের সম্মিলনও নয়, আবার আমরা একটা অনুভূতিপ্রবণ জীবমাত্রও নই। এটা একটা অসামান্য সুপার কম্পিউটার।

সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ

চলুন, আমরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আলোচনার একটি ভিন্ন মাত্রায় আরোহণ করি। বৈদিক জ্ঞান থেকে আমরা জানতে পারি যে, আমরা প্রত্যেকে একেকজন বোধশক্তিসম্পন্ন, শাশ্বত, প্রশান্ত, আশীর্বাদপুষ্ট, চিন্ময় আত্মা এবং আমাদের প্রত্যেকেরই সেই পরমেশ্বর ভগবান ও অন্যান্য জীবসত্তার সাথে পরমাত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। বৈদিক শাস্ত্রসমূহ আশা করে, আমরা যেন প্রকৃত অর্থে নববর্ষ পালন করি। শাস্ত্র অনুযায়ী, আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই নতুন এবং আনন্দময় হওয়া উচিত। শুধু তাই নয়, এই শাস্ত্র আমাদের আরো গভীর আত্মোপলব্ধির জন্য একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি প্রদর্শন করে, যা আমাদের এই উদ্দেশ্যটিকে বাস্তবতায় পরিণত করে। আসুন, একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখি।

   আনন্দময় হওয়ার জন্য বেদাদি শাস্ত্রসমূহও আমাদের নতুন কিছু করতে উপদেশ দেয়। কিন্তু শাস্ত্রসম্মত নতুনত্বের ধারণা আর নতুনত্বের সাধারণ ধারণার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

একটি পারমার্থিক বা আধ্যাত্মিক মাত্রার সন্ধান 

বৈদিক শাস্ত্রসমূহ ব্যাখ্যা করে যে সমস্ত প্রাণীই আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বস্তুত নিম্নতর প্রাণীরা এই চারটি কর্মের বাইরে কিছু করেই না। আবার আমাদের তথাকথিত আধুনিক মানুষেরাও এই একই কর্ম করে চলেছে, হয়তো কিছুটা উন্নত পদ্ধতিতে। এমনকি সমস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটে চলেছে এই চারটি প্রাথমিক চাহিদা পুরণের জন্যই। কীভাবে? পরমাণুর ভিতরের শক্তি উদ্ঘাটনের পরে মানুষ কী করলো? পারমাণবিক বোমা তৈরি করলো। বহিঃশক্তির ভয়ে প্রতিরক্ষার নামে স্মরণাতীত কালের ভয়াবহ মানব বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি হলো।

   তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে তৈরি হলো ইন্টারনেট পরিষেবা যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে পণোর্গ্রাফি দেখার মাধ্যম হিসেবে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং — এর কল্যাণে অধিক পরিমাণে মাংস উৎপাদন এবং বিষাক্ত হাইব্রিড শাকসবজি ফলমূল উৎপাদন হচ্ছে। তাহলে খাওয়ার চাহিদা মেটানো ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কি? তৈরি হচ্ছে ডানলপ বেড অথবা ওয়াটার বেড এর মতো ভোগ বিলাসের হাজারো নিত্য নতুন পণ্য; নিশ্চিতভাবেই ঘুমকে আরো আরামপ্রদ করার জন্য। একটু ভাবলে যে কেউ বুঝতে পারবে, সমস্ত তথাকথিত অ্যাডভান্স কর্মকাণ্ড আসলে আজকের মানুষের আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুনের প্রবণতাকে আরো বৃদ্ধি করার প্রয়াস ছাড়া আর কিচ্ছু না। এসবের মধ্যে নতুনত্বেরও কিছু নেই; তা বাহ্যিকভাবে আপনি যা বা যেভাবেই করুন না কেন। ভাগবতে এসবকে বলা হয় চর্বিত চর্বণ।

   মানুষের মতো উন্নত একটি প্রজাতির তো এভাবে আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুনের প্রবণতাকে পুঁজি করে বাঁচার কথা নয়; তার আরো অনেক উন্নত চেতনার অধিকারী হওয়ার কথা যা প্রকৃতই চির নতুন; আর তা হলো আধ্যাত্মিকতা। একটি কুকুর শরীর ও আত্মার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না বা ঈশ্বরের আরাধনা অথবা মন্ত্র-ধ্যান করতে পারে না। কিন্তু মানুষ পারে। আর আধ্যত্মিকতা কোনো দৈবী ক্ষমতা নয়, এটা মানুষের জন্মগত অধিকার। কারণ প্রতিটি মানুষের শরীরেই এটাকে ধারণ করার মতো সক্ষমতা রয়েছে।

   তাই বৈদিক সাহিত্য আমাদের চেতনাকে চিরনতুন এক আধ্যাত্মিক জগতের দিকে পরিচালনা করতে উৎসাহিত করে। “অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা” —  বেদান্ত সূত্রের এই প্রথম কথাটিই সমস্ত পাঠকদের এই পরিষ্কার বার্তা প্রদান করে, যার অর্থ —  “অতএব এখন জীবনের উচ্চতম মাত্রার খোঁজ করো।” বিস্ময়ের ব্যাপার; একটি পুস্তকের শুরুই হচ্ছে ‘অতএব’ দিয়ে। মানুষের উদ্দেশ্যে লিখিত এই বাক্যের অর্থ হচ্ছে, “হে চিন্ময় আত্মা, তুমি একটি মানুষের শরীর ধারণ করেছ। অতএব, নিম্নতর প্রাণীবৈশিষ্ট্য —  আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুনের প্রবণতা থেকে বের হও। তোমাকে উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা প্রদান করা হয়েছে। অতএব, তুমি উচ্চতর সত্যের সন্ধান করো।”

প্রকৃত শুভ নববর্ষ

এই উচ্চতর সত্যের অন্বেষণ আরাম-কেদারায় বসে করা কোনো নিষ্ফল আলোচনা নয়। বৈদিক শাস্ত্রসমূহ আমাদের একটি ব্যবহারিক পথ প্রদর্শন করে, যা একজন উচ্চতর সত্য সন্ধানীকে চিন্ময় সত্যের জগৎ থেকে নিরন্তর আনন্দ প্রদান করে। আর এই বৈদিক সমাজের লক্ষ্যই হলো —  “সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ”। সকলে যেন স্থায়ী সুখ লাভ করে। সকলে যেন সফলতা লাভ করে। ইন্দ্রিয় সুখ নয়, বরং পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময়, চিরন্তন ও গভীরতম সেবায় নিয়োজিত থাকার মাধ্যমে ঐকান্তিক সুখ লাভ করে।

   আধ্যাত্মিক জীবনের উদ্দেশ্য পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি আসক্তি, প্রেম ও ভক্তি জন্মানো। পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভালোবাসা সমস্ত প্রাণীকুলের প্রতিও সহোদর — সুলভ ভালোবাসা তৈরি করে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা বিবর্জিত ভালোবাসা ভক্তের নিজের হৃদয়কেও সন্তুষ্ট করে, আবার অন্য ভক্তকেও নিজের মতো সর্বজন হিতৈষী করে গড়ে তুলতে চায়। ভগবানের প্রতি ভালোবাসাই আমাদের প্রকৃত প্রবণতা। কিন্তু জড়জাগতিক বিষয়ের প্রতি দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে আমরা আমাদের আমাদের প্রকৃত প্রবণতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বিস্মৃত হয়ে পড়ি, আর বিভিন্ন জড়জাগতিক বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি। বৈদিক সমস্ত আধ্যাত্মিক চর্চার উদ্দেশ্য হলো পরমেশ্বরের সাথে আমাদের হৃদয়ে সেই শাশ্বত — সনাতন কিন্তু আপাত সুপ্ত সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত করা। পরমেশ্বর ভগবান হলেন চিরনতুন, শাশ্বত ও অসীম। তাই তাঁর প্রতি প্রেম ও ভক্তিও একটি চিরনতুন ও সুখময় অভিজ্ঞতা। আর ঠিক এভাবেই পরমেশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তির উন্মেষ-ই আমাদের শুভ নববর্ষের প্রকৃত উদ্যেশ্য বাস্তবায়িত করতে পারে।

Happy New Year !!! — হরেকৃষ্ণ

ভাষান্তর: সুদীপ দাস

হ্যাপি  নিউ ইয়ার
হ্যাপি নিউ ইয়ার
আমাদের গুপ্তধন
আমাদের গুপ্তধন
ইস্কনের লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য কার্যর্ক্রম
ইস্কনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কার্যর্ক্রম
বৈদিক শাস্ত্রের শ্রেণিবিভাগ
বৈদিক শাস্ত্রের শ্রেণিবিভাগ
ভয় থেকে মুক্তি
ভয় থেকে মুক্তি
বিধ্বংসী মন্ত্রণা
বিধ্বংসী মন্ত্রণা
শিক্ষার সারমর্ম
শিক্ষার সারমর্ম
কৃষ্ণভাবনামৃতের উদ্দেশ্য
কৃষ্ণভাবনামৃতের উদ্দেশ্য
অহিংসা, প্রেম ও মানবতাই শ্রীচৈতন্যদেবের আদর্শ
অহিংসা, প্রেম ও মানবতাই শ্রীচৈতন্যদেবের আদর্শ