বৈদিক শাস্ত্র কী?
মানবজীবনের প্রধান উদ্দেশ্য পরমেশ্বর ভগবানকে জানা। তাঁকে জানার সর্বাপেক্ষা প্রামাণিক উৎস ‘বেদ’। সংস্কৃত বিদ্ ধাতু থেকে বেদ শব্দ এসেছে। বিদ্ ধাতুর অর্থ জানা, অনুভব করা বা জ্ঞান। যে শাস্ত্র দ্বারা ধর্ম ও ব্রহ্মতত্ত্বকে জানা যায়, তাকেই বেদ বলে। শাস্ত্র কথাটি এসেছে সংস্কৃত শাস্ ধাতু থেকে। শাস্ ধাতুর অর্থ শাসন করা। আবার, শাস্ত্র বলতে বোঝায় দেবতা বা ঋষি প্রণীত গ্রন্থ। অর্থাৎ, যে গ্রন্থের মাধ্যমে ভগবান আমাদের শাসন করেন বা পরিচালিত করেন তা — ই শাস্ত্র। অতএব, জগজ্জীবের কল্যাণের জন্য পরমেশ্বর ভগবান প্রদত্ত জ্ঞানই বেদ এবং বেদভিত্তিক শাস্ত্রই বৈদিক শাস্ত্র।
ঋগ্ যজুঃসামাথর্বঞ্চ ভারতং পঞ্চরাত্রকম্।
মূলরামায়ণঞ্চৈব শাস্ত্রমিত্যভিধীয়তে।।
যচ্চানুকূলমেতস্য তচ্চ শাস্ত্রং প্রকীর্তিতম্।
অতোহন্যগ্রন্থবিস্তারো নৈব শাস্ত্রং কুবর্ত্মতৎ।।
— (মধ্বভাষ্যধৃত স্কন্দবচন)
অর্থাৎ, ঋক্, যজুঃ, সাম, অথর্ব — এই চার বেদ এবং মহাভারত, মূল — রামায়ণ ও পঞ্চরাত্র — এসকলকে শাস্ত্র বলা হয়। এদের অনুকূল যেসকল গ্রন্থ (পুরাণ প্রভৃতি), তা শাস্ত্র মধ্যে পরিগণিত। এগুলো ব্যতীত যেসকল গ্রন্থ, তা শাস্ত্র তো নয়ই, বরং তাকে ‘কুবর্ত্ম’ বলা যায়।
বৈদিক শাস্ত্র কখন ও কীভাবে আমরা পেয়েছি?
পরমেশ্বর ভগবান অনাদি ও নিত্য। তাই তাঁর সম্পর্কিত জ্ঞানও নিত্য। সুতরাং, বেদ নিত্য বা শাশ্বত। সৃষ্টিকালে পরমেশ্বর ভগবানের নিঃশ্বাস থেকে বেদ প্রকাশিত হয়। অথর্ববেদের দশম কাণ্ডের ত্রয়োবিংশতি প্রপাঠকে চতুর্থ অনুবাকের সপ্তম সূত্রের বিংশ মন্ত্রে বলা হয়েছে —
যস্মাদৃচো অপাতক্ষন্ যজুর্য্যস্মাদপাকষন্।
সামানি যস্য লোমান্যথর্বাঙ্গিরসো মুখম্।
স্কম্ভং তং ব্রƒহি কতমঃ স্বিদেব সঃ।। — অথর্ববেদ
অর্থাৎ, সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর হতে ঋক্, যজুঃ, সাম, অথর্ব — এই চার বেদ উৎপন্ন হয়েছে। এই পরমপুরুষের বদনতুল্য অথর্ববেদ, লোমসম সামবেদ, হৃদয়সদৃশ যজুর্বেদ এবং প্রাণতুল্য ঋগ্বেদ। এমন পুরুষ কে, যাঁর থেকে বেদের উৎপত্তি হয়? উত্তরে ‘স্কম্ভ’ শব্দ দ্বারা পরমেশ্বরই নির্দিষ্ট হন।
ঋচঃ সামানি চ্ছন্দাংসি পুরাণং যজুষা সহ।
“ঋক্, সাম, ছন্দ ও যজুর মন্ত্রগুলো পুরাণ আখ্যানের সাথে সে ব্রহ্ম থেকে জাত হয়েছে।”(অথর্ববেদ কাণ্ড ১১, অনুবাক ৪, সূক্ত ৩; মন্ত্র ৪)
সযথার্দ্রৈধাগ্নেরভ্যাহিতাৎ পৃথগ্ধূমা বিনিশ্চরন্ত্যেবং বা অরেহস্য বা মহতো ভূতস্য নিঃশ্বসিতমেতদ্ যদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোহথর্বাঙ্গিরস ইতিহাসঃ পুরাণং বিদ্যা উপনিষদঃ শ্লোকাঃ সূত্রাণ্যব্যাখ্যানানি ব্যাখ্যানান্যস্যৈবৈতানি সর্বাণি নিঃশ্বসিতানি। অর্থাৎ, আর্দ্র ইন্ধন দ্বারা প্রজ্জ্বলিত অগ্নি থেকে যেমন ধেঁায়া নির্গত হয়, তেমনই ঋক্, যজুঃ, সাম ও অর্থর্ব বেদ, ইতিহাস, পুরাণ, উপনিষদ, কলাবিদ্যা, শ্লোক, সূত্র, অনুব্যাখ্যান, ব্যাখ্যান — এই সমস্তই পরমেশ্বর ভগবানের নিঃশ্বাসস্বরূপ অর্থাৎ এসকল শাস্ত্র নিঃশ্বাসের ন্যায় পরমেশ্বর ভগবান থেকে প্রকাশিত। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ২.৪.১০ ও ৪.৫.১১)।
যেহেতু বেদ স্বয়ং ভগবান থেকে প্রকাশিত, এ জগতের কোনো পুরুষের (জীবের) দ্বারা রচিত নয়, তাই বেদকে বলা হয় অপৌরুষেয়।
যো ব্রহ্মাণং বিদধাতি পূর্বং যো বৈ বেদাংশ্চ প্রহিণোতি তস্মৈ।
তং হ দেবমাত্মবুদ্ধিপ্রকাশং মুমুক্ষর্বৈ শরণমহং প্রপদ্যে।
“যে পরমেশ্বর সর্বপ্রথম (নিজ নাভিপদ্ম থেকে) ব্রহ্মাকে উৎপন্ন করেন এবং উৎপন্ন করে নিঃসন্দেহে তাঁকে সমস্ত বেদের জ্ঞান প্রদান করেন, মোক্ষাভিলাষী হয়ে আমি আত্মজ্ঞানবিষয়ক বুদ্ধিপ্রকাশক সেই প্রসিদ্ধ পরমেশ্বর ভগবানের শরণ নিচ্ছি। তিনি আমাকে সংসাররূপ বন্ধন থেকে মুক্ত করুন।” (শ্বেতাশ্বতর-৬.১৮)
শ্রীমদ্ভাগবতেও (১.১.১) বলা হয়েছে — ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়...তেনে ব্রহ্মহৃদা যো আদি কবয়ে — অর্থাৎ, আমি সেই পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবকে (তথা শ্রীকৃষ্ণকে) প্রণাম করি, যিনি সৃষ্টির প্রারম্ভে আদি কবি ব্রহ্মার হৃদয়ে সর্বপ্রথম বেদের জ্ঞান প্রদান করেন। বেদের জ্ঞান তাঁর থেকে সর্বপ্রথম ওঁকার (‘ওঁ’=অ-উ-ম) রূপে ব্রহ্মার হৃদয়ে প্রবিষ্ট হয়।
‘প্রণব’ যে মহাবাক্য-ঈশ্বরের মূর্তি।
প্রণব হৈতে সর্ববেদ, জগৎ-উৎপত্তি।
অর্থাৎ, “মহাবাক্য ‘প্রণব’ বা ‘ওঁকার’ হলো শব্দ রূপে ভগবানের প্রকাশ, সুতরাং তা ভগবানেরই মূর্তি। এই প্রণব থেকে সর্ববেদ এবং জগতের উৎপত্তি হয়েছে।” (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত আদি ৬.১৭৪)
অর্থাৎ, ওঁ — এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমস্ত বেদ। কলি যেমন পুষ্পরূপে প্রস্ফুটিত হয়, তেমনই ওঁকার — তত্ত্ব সম্যকরূপে অবগত হয়ে ব্রহ্মা চতুঃসনের (সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎ) নিকট তা একলক্ষ মন্ত্রব্রাহ্মণ সমন্বিত বেদরূপে প্রকাশ করেন। ব্রহ্মার পূর্বদিকের মুখ থেকে ঋগ্বেদ, দক্ষিণ মুখ থেকে যজুর্বেদ, পশ্চিম মুখ থেকে সামবেদ এবং উত্তর মুখ থেকে অথর্ববেদ — এভাবে চতুষ্কুমার ব্রহ্মার চার মুখ থেকে চার বেদ শ্রবণ করেন। চতুঃসন থেকে সপ্তর্ষি তা শ্রবণ করেন, তাদের থেকে মনু — আদি প্রজাপতি ও মনুষ্যগণ; এভাবে গুরুশিষ্য পরম্পরা ধারায় শ্রৌত পন্থায় এ জ্ঞান প্রবাহিত হতে থাকে। তাই বেদের আরেক নাম শ্রম্নতি। প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে দ্বাপরযুগের শেষ প্রান্তে এসে কলিযুগের অল্পায়ু ও অল্পমেধাসম্পন্ন মানুষের মঙ্গলের জন্য ভগবান তাঁর শক্ত্যাবেশ অবতার ব্যাসরূপে অবতীর্ণ হয়ে বেদের জ্ঞান লিপিবদ্ধ করেন। ব্যাসদেব তাঁর শিষ্য পৈল ঋষিকে ঋগ্বেদ, বৈশম্পায়ন ঋষিকে যজুর্বেদ, জৈমিনি ঋষিকে সামবেদ এবং সুমন্ত মুনি নামে পরিচিত অঙ্গিরা ঋষিকে অথর্ববেদ শিক্ষা দেন। তাঁরা আবার তাঁদের নিজ নিজ শিষ্যদের তা উপদেশ করেন। পঞ্চমবেদস্বরূপ ইতিহাস ও পুরাণসমূহ ব্যাসদেব রোমহর্ষণ ঋষিকে শিক্ষা দেন। এভাবে স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান থেকে গুরুশিষ্য পরম্পরাক্রমে ব্যাসদেবের মাধ্যমে অবরোহ পন্থায় আমরা বৈদিক শাস্ত্র পেয়েছি। (সূত্র: ভাগবত ১.৪.২০-২৩)
বৈদিক শাস্ত্র কত প্রকার?
বৈদিক জ্ঞান প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত — শ্রম্নতিশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্র। শ্রম্নতিশাস্ত্র প্রধানত তিন প্রকার — বেদ, উপবেদ ও বেদাঙ্গ। বেদের চারটি প্রধান শাখা — ঋক্, সাম, যজু ও অথর্ব। এই চতুর্বেদের জ্ঞান পূর্বে এক বেদেই নিহিত ছিল এবং তার নাম ছিল যজুর্বেদ। তাতে চার রকমের যজ্ঞের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তা আরো সহজভাবে অনুষ্ঠান করার জন্য ভগবান ব্যাসদেবরূপে বেদকে চার ভাগে ভাগ করেন, যাতে চার বর্ণের মানুষ তাদের বৃত্তি অনুসারে পবিত্র হতে পারে। প্রত্যেক বেদের চারটি অংশ — ব্রাহ্মণ, সংহিতা, আরণ্যক ও উপনিষদ। এগুলোর আবার একাধিক শাখা রয়েছে।
বেদের মন্ত্রভাগকে সংহিতা বলে। বৈদিক বিধি-নিষেধ, যাগ-যজ্ঞ, ইতিবৃত্ত, অর্থবাদ, উপাসনা, ব্রহ্মবিদ্যা নিবদ্ধ হয়েছে ব্রাহ্মণে, যা গদ্যে রচিত। ব্রাহ্মণেরই অংশ বিশেষকে আরণ্যক বলে। ব্রাহ্মণ অংশে যেসব আচার-ক্রিয়াদি বর্ণিত হয়েছে, আরণ্যক সেগুলোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। বেদের সার, অন্ত বা শেষভাগকে বলা হয় উপনিষদ বা বেদান্ত। ঋক্, সাম, যজু ও অথর্ব — এ চারটি মূলসংহিতায় কর্ম-যাগ-যজ্ঞ-স্তুতি-উপাসনারই আলোচনা করে অতিরিক্ত ভাগে ব্রহ্মা জ্ঞানোপদেশ করেছিলেন এবং তা-ই উপনিষদরূপে প্রচলিত হয়।
ঈশ, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক ও শ্বেতাশ্বতর — এই ১১টি প্রধান উপনিষদসহ মোট ১০৮টি উপনিষদ। মুক্তিকোপনিষদে ৩০—৩৯ শ্লোকে ১০৮টি উপনিষদের নাম উল্লেখ আছে (সূত্র: চৈ.চ. ১.৭.১০৮ ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য)। প্রত্যেক উপনিষদই চতুর্বেদের কোনো না কোনো বেদের অন্তর্গত।
উপবেদ চারটি — আয়ুর্বের্দ (চিকিৎসাবিদ্যা), ধনুর্বেদ (যুদ্ধবিদ্যা), গান্ধর্ববেদ (সঙ্গীতবিদ্যা) এবং স্থাপত্যবেদ (বাস্তুবিদ্যা বা নির্মাণশিল্প)। বিদ্বানগণের অনেকে স্থাপত্যবেদের স্থলে অর্থশাস্ত্রকে (রাজনীতি ও অর্থনীতি) উপবেদের একটি বলে বিবেচনা করেন। বেদাঙ্গ ছয়টি — শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। বেদকে বোঝার জন্য প্রথমে বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করতে হয়।
স্মৃতিশাস্ত্র প্রধানত সাত প্রকার — সংস্কার সূত্র, তন্ত্র, পঞ্চরাত্র, পুুরাণ, ইতিহাস, সংহিতা ও উপাঙ্গ। ইতিহাস ও পুরাণসমূহকে বলা হয় পঞ্চমবেদ। সংস্কার সূত্র তিন প্রকার — শ্রৌতসূত্র, গৃহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্র; এগুলোকে একত্রে বলা হয় ধর্মশাস্ত্র। তন্ত্র তিন প্রকার — সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। পঞ্চরাত্র হলো বৈষ্ণবীয় উপাসনা পদ্ধতি। পুরাণ বেদের জটিল বিষয়গুলোকে স্পষ্ট করে বেদের নিগূঢ় অর্থ বুঝতে সহায়তা করে। পুরাণ দুই ভাগে বিভক্ত — মহাপুরাণ (১৮টি) ও উপপুরাণ (১৮টি)। মহর্ষি ব্যাসদেব রচিত অষ্টাদশ পুরাণের নাম শ্রীমদ্ভাগবতে (১২.৭.২৩-২৪) উলেখ্য করা হয়েছে। যথা:
ব্রাহ্মং পাদ্মং বৈষ্ণবঞ্চ শৈবং লৈঙ্গং সগারুড়ম্।
নারদীয়ং ভাগবতমাগ্নেয়ং স্কান্দসংজ্ঞিতম্।
ভবিষ্যং ব্রহ্মবৈবর্তং মার্কণ্ডেয়ং সবামনম্।
বারাহং মাৎস্যং কৌর্মঞ্চ ব্রহ্মাণ্ডাখ্যমিতি ত্রিষট্।।
অর্থাৎ “আঠারোটি মুখ্য পুরাণ হলো — ব্রহ্ম, পদ্ম, বিষ্ণু, শিব, লিঙ্গ, গরুড়, নারদীয়, ভাগবত, অগ্নি, স্কন্দ, ভবিষ্য, ব্রহ্মবৈবর্ত, মার্কণ্ডেয়, বামন, বরাহ, মৎস্য, কূর্ম ও ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ।” এগুলো আবার তিনভাগে বিভক্ত — সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। এই আঠারো পুরাণের মধ্যে অমল পুরাণ শ্রীমদ্ভাগবতই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অধিক মাহাত্ম্যপূর্ণ, যেখানে ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাসসহ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য লীলাবিলাসের কাহিনি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং ভগবানের প্রতি নিগুর্ণা শুদ্ধভক্তি লাভের পথ প্রদর্শিত হয়েছে।
অর্থোহয়ং ব্রহ্মসূত্রাণাং ভারতার্থ — বিনির্ণয়ঃ।
গায়ত্রীভাষ্যরূপোহসৌ বেদার্থপরিবৃংহিতঃ।।(গরুড়পুরাণ) ।।
অর্থাৎ, এই শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে বেদান্তসূত্রের অর্থস্বরূপ, মহাভারতের তাৎপর্য বিনির্ণায়ক, গায়ত্রীর ভাষ্য এবং বেদার্থ পরিপুষ্ট তথা বেদের অর্থ প্রকাশক।
রামায়ণ ও মহাভারত হলো ইতিহাস। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তভুর্ক্ত (২৫-৪২) ১৮টি অধ্যায় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণী ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। তবে মহাভারতের অন্তর্গত হওয়ার কারণে একে স্মৃতিশাস্ত্ররূপে গণ্য করা হয়। কিন্তু গীতায় স্বয়ং ভগবানের মুখনিঃসৃত শাশ্বত বাণীগুলো অপৌরুষেয় এবং তা শ্রম্নতিরই অন্তর্গত। সেদিক থেকে ভগবদ্গীতা স্মৃতি ও শ্রম্নতি উভয়ই।
বেদের সারকে বলা হয় উপনিষদ, আর শ্রীশঙ্করাচার্যের গীতামাহাত্ম্য অনুসারে সমস্ত উপনিষদের সার শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, যাকে গীতোপনিষদ বলা হয়। এছাড়া শ্রীমদ্ভাগবতের কথা পূর্বে বলা হয়েছে যে, তা বেদান্তসূত্রের অকৃত্রিম ভাষ্য। সুতরাং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত হলো সমস্ত বেদের নির্যাস এবং এই দুটো গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে সমস্ত বেদের জ্ঞান উপলব্ধি করা যায়।
স্মৃতিসংহিতাগুলো সমাজব্যবস্থাপক শাস্ত্র। সংহিতা বিশটি — মনু, অত্রি, বিষ্ণু, হরিত, যাজ্ঞবল্ক্য, পরাশর, ব্যাস, উশনা, অঙ্গিরা, যম, অপস্তম্ভ, সম্বর্ত, কাত্যায়ন, বৃহস্পতি, শঙ্খ, লিখিত, দক্ষ, গৌতম, শতাতপ এবং বশিষ্ট সংহিতা। এছাড়া শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দক্ষিণভারত ভ্রমণকালে ব্রহ্মসংহিতা নামে একটি প্রাচীন সংহিতাগ্রন্থ প্রাপ্ত হন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ব্রহ্মসংহিতাকে বৈষ্ণবদের সিদ্ধান্তশাস্ত্র বলে অভিহিত করেছেন।
সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, পূর্বমীমাংসা ও উত্তরমীমাংসা (বেদান্তসূত্র) — এগুলো উপাঙ্গ। এভাবে বৈদিক জ্ঞান বহু শাখায় বিস্তৃত। পরবর্তী পৃষ্ঠায় রেখাপ্রবাহের মাধ্যমে বৈদিক শাস্ত্রের শ্রেণিবিভাগ দেখানো হয়েছে।
অতএব, বেদের জ্ঞান কেবল বর্তমান বাজারে প্রচলিত ঋক্, সাম, যজুঃ ও অথর্ব — এ চারটি সংহিতা গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ — এগুলোও বেদেরই অংশ বিশেষ। এছাড়া আছে ইতিহাস ও পুরাণরূপ পঞ্চমবেদ। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতসহ এসকল শাস্ত্রে উল্লিখিত সমস্ত জ্ঞানের সমষ্টিই বেদ বা বৈদিক জ্ঞান। — হরেকৃষ্ণ।
[তথ্যসূত্র: বেদের পরিচয়, বেদ পরিচয়, বেদান্তসূত্রম্, তত্ত্বসন্দর্ভ, শ্রীমদ্ভাগবত ও অন্যান্য]