বর্ষ: 2025 | ইস্যু: ১ম সংখ্যা
একাদশী: ব্রতকাল নির্ণয়,
শাস্ত্রীয় ও বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ’ গ্রন্থ থেকে
একাদশী
ব্রত সকলের কর্তব্য
একাদশী পালনের প্রসঙ্গ
এলেই কেউ কেউ মনে করেন যে, এটা কেবল ব্রহ্মণদের জন্য, কেউ মনে করেন তা বৈষ্ণবদের জন্য,
আবার কেউ মনে করেন তা কেবল বিধবাদের জন্য। আর কেউ মনে করেন, তা দীক্ষাগ্রহণের পর কর্তব্য।
কিন্তু একাদশীতে উপবাসের বৈজ্ঞানিক ও শাস্ত্রীয় কারণ তথা তা পালনের উপকারিতা অবগত
হওয়ার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই বোধগম্য হয় যে, এই ব্রত সকলেরই পালন করা প্রয়োজন। দেখা
যাক বৈদিক শাস্ত্র কী বলে?
পদ্মপুরাণে (ক্রিয়াযোগসার,
২.৮১, ৯১) — কে বৈষ্ণবা কৈটভারে কিংবা তেষাঞ্চ
লক্ষণম্ — বৈষ্ণব কারা? তাঁদের লক্ষণই বা কি?
— ভগবানের প্রতি ব্রহ্মার এ প্রশ্নের উত্তরে
ভগবান বৈষ্ণবের অনেক লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে একটি লক্ষণ বলেন — একাদশী ব্রতং যে চ ভক্তিভাবেন কুর্বতে। অর্থাৎ, যাঁরা
ভক্তিপূর্বক একাদশী ব্রত পালন করেন, তাঁরা বৈষ্ণব। তবে কি একাদশী কেবল বৈষ্ণবদের জন্য?
না। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে (শ্রীকৃষ্ণজন্মখণ্ড, ২৬.২২) বলা হয়েছে — যতীনাং বৈষ্ণবানাঞ্চ ব্রাহ্মণানাং বিশেষত। একাদশী
ব্রত সন্ন্যাসী, ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবগণের পক্ষে বিশেষ কর্তব্য। অর্থাৎ, অন্যদেরও তা বর্তব্য।
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ (ব্রহ্মখণ্ড ২৭.৮ — ১০) অনুসারে —
ন ভোক্তব্যং ন ভোক্তব্যং
ন ভোক্তব্যঞ্চ নারদ।
গৃহিভিব্রর্হ্মণৈরন্নং
সম্প্রাপ্তে হরিবাসরে ।। ৮ ।।
গৃহী শৈবশ্চ শাক্তশ্চ
ব্রাহ্মণো জ্ঞানদুব্বর্লঃ।
প্রয়াতি কালসূত্রঞ্চ
ভুক্ত¦া চ হরিবাসরে ।। ৯ ।।
কৃমিভিঃ শালমানৈশ্চ ভক্ষিতস্তত্র
তিষ্ঠতি।
বিন্মূত্রভোজনং কৃত্বা
যাবদিন্দ্রাশ্চতুর্দশ ।। ১০ ।।
“একাদশী উপস্থিত হলে
গৃহী ব্রাহ্মণ কোনো মতেই অন্ন ভোজন করবে না। গৃহী, ব্রাহ্মণ, শৈব, শাক্ত অথবা বৈষ্ণব
যে কেউ হোন না কেন, একাদশীতে অন্নাহার করলে কালসূত্র নরকে গমন করেন এবং সেখানে শালবৃক্ষ
— প্রমাণ কৃমিদের দ্বারা ভক্ষিত ও বিষ্ঠামূত্রভোজী হয়ে চতুর্দশ ইন্দ্রের আয়ুষ্কাল
পর্যন্ত যন্ত্রণা ভোগ করেন। এছাড়াও শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, রামনবমী ও শিবরাত্রি দিবসে
যিনি ভোজন করেন, তিনি তা অপেক্ষা দ্বিগুণতর পাতকী হন।”
হরিভক্তিবিলাসধৃত (১২.১৫)
বিষ্ণুস্মৃতি অনুসারে, একাদশ্যাং ভুঞ্জীত কদাচিদপি মানবঃ। অর্থাৎ, মানব কখনো একাদশীতে
ভোজন করবে না। মানব অর্থে সকল মানুষেরই তা কর্তব্য। তাই হরিভক্তিবিলাসধৃত (১২.৭৪) পদ্মপুরাণের
উত্তরখণ্ডে (২৩৪/১২ — ১৩) শিব পার্বতীকে বলেন —
বর্ণানামাশ্রমানাঞ্চ
স্ত্রীনাঞ্চ বরবর্ণিনি।
একাদশু্যপবাসস্তু কর্তব্যো
নাত্র সংশয়ঃ ।।
অর্থাৎ, “হে বরবর্ণিনি
(পার্বতী), সর্ববর্ণ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র), সর্ব আশ্রম (ব্রহ্মচারী,
গৃহস্থ, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস), এমনকি স্ত্রীগণেরও একাদশীতে উপবাস কর্তব্য, এতে শংসয়
নেই।”
একাদশ্যাং ন ভুঞ্জীত
নারী দৃষ্টে রজস্যপি।
(হরিভক্তিবিলাসধৃত
(১২.১৬) বিষ্ণুস্মৃতি)
“এমনকি নারী
রজঃস্বলা অবস্থাতেও একাদশীতে ভোজন করবে না।”
ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং
শূদ্রানাঞ্চৈব যোষিতাম্।
মোক্ষদং কুর্বতাং ভক্ত্যা
বিষ্ণোঃ প্রিয়তরং দ্বিজাঃ ।
একাদশীব্রতং নাম সব্বর্কামফলপ্রদম্।।
“ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়,
বৈশ্য, শূদ্র ও স্ত্রীলোক — তাদের মধ্যে যেকোনো
ব্যক্তি হোক, ভক্তিপূর্বক সর্বকামনা — ফলপ্রদ একাদশী ব্রত অনুষ্ঠান করলে মুক্তিলাভ
করতে পারে।” বৃহন্নারদীয় পুরাণ (২১.২ — ৩)
আবার, পদ্মপুরাণে (ক্রিয়াযোগসার, ২২.৬১) বলা হয়েছে
— মাতা হি একাদশী নৃণাং। একাদশী তিথি মানবগণের
মাতৃস্বরূপা। এখানে, ‘নৃণাং’ শব্দে সমগ্র মানবজাতিকে বোঝানো হয়েছে। আরো বলা হয়েছে
— সব্বৈর্রেকাদশী কার্যা চতুর্বর্গফলপ্রদা
(পদ্মপুরাণ, ক্রিয়াযোগসার, ২২.৫৪) । এখানে, সর্বৈ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে, ধর্ম, অর্থ,
কাম ও মোক্ষ — এই চতুবর্গফল প্রদানকারী একাদশী
ব্রত সকলেরই কর্তব্য। অনত্র বলা হয়েছে —
তস্মিন মাসে দ্বিজশ্রেষ্ঠ
পক্ষয়োঃ শুক্লকৃষ্ণয়োঃ।
ভবেদেকাদশীযুগ্মং গ্রাহং
তৎ সকলৈজ্জর্নৈঃ ।
যথা শুক্লা তথা কৃষ্ণা
বিষ্ণোঃ প্রিয়তমা সদা।
একাদশীব্রতং কার্য্যং
পক্ষয়োঃ শুক্লকৃষ্ণয়োঃ ।।
-
(পদ্মপুরাণ,
ক্রিয়াযোগসার, ২২.৫৮ — ৫৯)
“শুক্লকৃষ্ণপক্ষে দুটি
একাদশী হয়, এই উভয় একাদশীই ব্রতার্থ সকলেরই গ্রহণীয়। শুক্লা একাদশী যেমন, কৃষ্ণা
একাদশীও তেমনই শ্রীহরির প্রিয়তমা। তাই উভয় পক্ষেই একাদশী ব্রত করতে হয়।”
একাদশী
কেবল বিধবাদের জন্য নয়
ধর্মকর্ম হলো বৃদ্ধদের
জন্য — এধরনের ভ্রান্ত মতবাদ তো আমাদের সমাজে
প্রচলিত আছেই, এছাড়া, অনেকেরই ধারণা, শাস্ত্রে স্ত্রীলোকদের একাদশী ব্রত পালনের যে
নির্দেশ রয়েছে, তা কেবল বিধবাদের জন্য। এই ভ্রান্ত সংস্কার থেকে সমাজকে মুক্ত করার
জন্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শচীমাতার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন।
একদিন মহাপ্রভু তাঁর মায়ের পায়ে প্রণতি নিবেদন করে বলেছিলেন, “মা, আমাকে কি তুমি
একটি দান দেবে?” মা উত্তরে বলেছিলেন, “তুমি যা চাইবে, আমি তা — ই দেব।” তখন মহাপ্রভু
শচীমাতাকে একাদশীতে অন্ন না খাওয়ার কথা বললেন। শচীমাতা বলেছিলেন, “তুমি ভালো কথাই
বলেছ। আমি একাদশীর দিন অন্ন গ্রহণ করব না।” সেদিন থেকেই তিনি একাদশীর উপবাস করতে শুরু
করেন।
মাতা বলে — তাই দিব, যা তুমি মাগিবে।
প্রভু কহে — একাদশীতে অন্ন না খাইবে ।
শচী কহে — না খাইব, ভালোই কহিলা।
সেই হৈতে একাদশী করিতে
লাগিলা ।।
— চৈ.চ. আদি ১৫/৯ — ১০
স্মার্ত ব্রাহ্মণেরা
বলে যে, “একাদশীর দিন উপবাস করা বিধবাদের অবশ্য কর্তব্য, কিন্তু সধবাদের একাদশী — ব্রত
পালন করা উচিত নয়।” সে অনুযায়ী হয়ত মহাপ্রভুর অনুরোধের পূর্বে শচীমাতা একাদশী ব্রত
পালন করছিলেন না, যেহেতু তিনি ছিলেন সধবা। এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার যে, শচীমাতা
ভগবানের শুদ্ধভক্ত ও তাঁর নিত্য পার্ষদ। তাঁর সমস্ত কর্ম ভগবানের সন্তুষ্টিবিধানের
জন্য। তাই কোনো রকম পাপ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তদুপরি, ভগবানের ইচ্ছানুসারেই তিনি
তা করেছিলেন এবং এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জীবদের শিক্ষা দেয়া। এভাবে, বিধবা না হলেও,
অর্থাৎ, সধবাদেরও একাদশীব্রত পালন করার প্রথা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন।
কারণ, শাস্ত্রেই তার উল্লেখ রয়েছে। হরিভক্তিবিলাসধৃত (১২.৪৭) বিষ্ণুধর্মোত্তরে বলা
হয়েছে —
সপুত্রশ্চ সভার্য্যশ্চ
স্বজনৈর্ভক্তিসংযুতঃ।
একাদশ্যামুপবসেৎ পক্ষয়োরুভয়োরপি
।।
অর্থাৎ,
“পুত্র, ভার্যা (পত্নী) ও স্বজনবর্গের সহিত ভক্তিযুক্ত হয়ে উভয়পক্ষের একাদশীতে উপবাস
কর্তব্য।”
এছাড়া, শ্রীমদ্ভাগবতে
(৯.৪.২৯) বর্ণিত আছে —
আরিরাধয়িষুঃ কৃষ্ণং
মহিষ্যা তুল্যশীলয়া।
যুক্তঃ সাংবৎসরং বীরো
দধার দ্বাদশীব্রতম্ ।।
“ভগবান শ্রীকৃষ্ণের
আরাধনা করার জন্য অম্বরীষ মহারাজ তাঁরই মতো গুণবতী মহিষী (পত্নী) সহ দীর্ঘকাল যাবৎ
একাদশী এবং দ্বাদশীব্রত পালন করেছিলেন।” পদ্মপুরাণেও ক্রিয়াযোগসারে (২২.১০৫) এ প্রসঙ্গে
বলা হয়েছে —
যা নারী ভত্তৃর্সহিতা
করোত্যেকাদশীব্রতম্।
সুপ্রজা স্বামিসুভগা
সা ভবেৎ প্রতিজন্মনি ।।
“যে নারী
স্বামীর সহিত একাদশীব্রত করে, সে জন্ম জন্ম সপুত্রা ও স্বামীসুভগা হয়।”
পদ্মপুরাণের
স্বর্গখণ্ডে (৪৪.৭৬) বলা হয়েছে —
পতিসহিতা যা যোষিৎ করোতি
হরিবাসরম্।
সুপুত্রা স্বামিসুভগা
যাতি প্রেত্য হরেগৃর্হম্ ।।
“যে যোষিৎ (স্ত্রী)
পতিসহ হরিবাসর করে, সে সুপুত্রা, স্বামীসুভগা হয়, মরণান্তে হরিগৃহে যায়।”
মহাপ্রভু কতৃর্ক সধবা
শচীমাতাকে একাদশীব্রত পালনের নির্দেশ এবং উপযুর্ক্ত শ্লোকসমূহে পুত্র ও পত্নীসহ পতির
এবং পতিসহ পত্নীর একাদশী ব্রত পালনের প্রসঙ্গ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, একাদশী ব্রত
পালন শুধু বিধবাদের জন্য নয়, সন্তান, পতি ও সধবাদেরও কর্তব্য; অন্যথায় এসকল শাস্ত্রবাক্যের
কী তাৎপর্য?
‘একাদশী কেবল বিধবাদের
জন্য’ — এধরনের যে স্মার্ত মতবাদ, সে সম্পর্কে
শ্রীল সনাতন গোস্বামী হরিভক্তিবিলাসের (১২.৭৪) টীকায়* লিখেছেন যে, তা সকামকর্মী ও
অবৈষ্ণব স্ত্রীদের জন্য, বৈষ্ণবগণের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়; সেকারণেই ‘সপুত্রশ্চ
সভার্যাশ্চ স্বজনৈ-র্ভক্তিসংযুতঃ’ — অর্থাৎ
পুত্র, ভার্যা (পত্নী) ও স্বজনবর্গের সহিত ভক্তিযুক্ত হয়ে একাদশী ব্রত পালনের নির্দেশ
শাস্ত্রে রয়েছে। উল্লেখ্য যে, সকামকর্মী ও অবৈষ্ণব হয়ে থাকা কারোরই উচিত নয়; পক্ষান্তরে
সকলের কর্তব্য সবরকম জড় কামনা-বাসনা ত্যাগ করে পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তিযুক্ত
হওয়া তথা বৈষ্ণব স্তরে উন্নীত হওয়া।
তাই প্রতিটি ব্যক্তির
উচিত একাদশী পালনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বৃদ্ধ বয়সের অপেক্ষায় না থেকে বাল্যকাল থেকে
একাদশী ব্রত পালন করা। তার ফলে কেউ শাস্ত্রীয় দিক থেকে তো বটেই, শারীরিক সুস্থতার
দিক থেকেও উপকৃত হবেন।
— হরেকৃষ্ণ