ইস্যু: ১ম সংখ্যা
আমাদের হৃদয়ে গুহ্যতম জ্ঞান কীভাবে উন্মোচন করতে
হবে তা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জ্যোতিষী ও দরিদ্র মানুষের এক দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে আমাদের
শিক্ষা দিয়েছেন।
আপনি
কি জানেন যে, আপনি এক অসীম সৌভাগ্যের উত্তরাধিকারী?
আপনার হৃদয়ে পরম গূহ্যতম
সম্পদ সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে এবং আপনাকে শুধু জানতে হবে যে, আপনি কীভাবে তা লাভ করতে
পারেন।
এই আশ্চর্যজনক শিক্ষাটিই
হলো সনাতন গোস্বামীর প্রতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষার সারমর্ম, যেটি শ্রীচৈতন্য
— চরিতামৃতে (মধ্য — লীলা ২০/১২৭ — ১৩৫) বর্ণিত রয়েছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হলেন পরমেশ্বর
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং, যিনি তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তের মাধ্যমে কৃষ্ণভক্তির বৈজ্ঞানিক
ব্যাখ্যা প্রদান করতে প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে বাংলায় আবিভূর্ত হয়েছিলেন। অর্থাৎ
ভগবান হয়েও তিনি ঠিক একজন ভক্তের মতো আচরণ করে অন্যদের শিখিয়েছেন যে, কীভাবে ভক্ত
হতে হয়, যেন জীবসকল জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে এবং অসীম পারমার্থিক আনন্দ
লাভ করতে পারে। সনাতন গোস্বামী, মহাপ্রভুর শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম, যিনি নিম্নলিখিত
দৃষ্টান্তটি শ্রবণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
জ্যোতিষী
ও দরিদ্র ব্যক্তি
একসময় সর্বজ্ঞ নামে
এক জ্যোতিষী এক দরিদ্র ব্যক্তির গৃহে এসেছিলেন। লোকটির দুর্ভাগ্য দেখে অবাক হয়ে তিনি
জিজ্ঞেস করলেন যে, তার পিতা এত বিশাল ধনরাশি রেখে যাওয়ার পরও কেন সে অসুখী এবং সে
কেন দরিদ্রতায় নিঃশেষ হয়ে গেছে? দুর্ভাগ্যবশত লোকটির পিতা দূরদেশে দেহ রেখেছিল এবং
তার সম্পদের অবস্থান প্রকাশ করেননি। এজন্য লোকটি তার ন্যায্য উত্তরাধিকার সম্পর্কে
অজ্ঞতা হেতু দরিদ্রতার যন্ত্রণা ভোগ করছিল। সেই জ্যোতিষীর গুপ্তধন শনাক্ত করার ক্ষমতা
ছিল এবং তা উদ্ধার করার উপায়ও তার জানা ছিল।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সনাতন গোস্বামীকে বললেন যে,
এই জ্যোতিষী বৈদিক শাস্ত্রসমূহের প্রতিনিধিত্ব করছে, যা মানুষকে তার সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য
ভগবানের প্রতি প্রেমভক্তি লাভের দিকে পরিচালিত করে। ঠিক যেমন জ্যোতিষীর সুসংবাদ দরিদ্র
ব্যক্তির সমস্যা সমাধান করেছে, বৈদিক শাস্ত্র আমাদের বৃহৎ সমস্যা সমাধান করতে পারে।
এই ক্ষণস্থায়ী ভৌতিক জগতে আমাদের পারমার্থিক দরিদ্রতাই সকল দুঃখের কারণ। বৈদিক শাস্ত্র
ও তার প্রতিনিধিগণ
(শুদ্ধ ভক্তবৃন্দ) আমাদের ভক্তিমার্গ অনুসরণ করার নির্দেশ করেন, যেন আমরা আমাদের পারমার্থিক
পিতা, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে পারি ।
ঠিক যেমনটি জ্যোতিষীর জ্ঞান দরিদ্র ব্যক্তির সাথে
তার গুপ্তধনের সংযোগ স্থাপন করেছিল, বৈদিক শাস্ত্রসমূহ পরম সম্পদ কৃষ্ণের সাথে আমাদের
সংযোগ স্থাপন করে। প্রভুপাদের মত অনুসারে, এই সংযোগ প্রতিস্থাপনের জন্য সর্বপ্রথমে
আমাদের নিজেদের অধঃপতিত অবস্থাকে শনাক্ত করতে
হবে, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত জড় প্রকৃতির পদাঘাত ভোগ করতে বাধ্য হচ্ছি। প্রতিটি জন্মে
আমরা বারংবার ভিন্ন ধরনের দেহ ধারণ করি এবং জড় জগতে জন্ম, মৃত্যু, জড়া, ব্যাধির মাধ্যমে
কষ্ট ভোগ করি। আমরা যদি নিজেদের জড় জাগতিক দুঃখ — কষ্ট সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি, তবে
আমরাও আমাদের সচ্চিদানন্দ স্বরূপের অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবো। আমাদের
প্রকৃত স্বরূপ যে পারমার্থিক, জড় জাগতিক নয় তা উপলব্ধি করাতে, শাস্ত্রসমূহ এবং মুক্ত
আত্মাগণ আমাদের সহযোগিতা করেন। আমরা এই ক্ষণস্থায়ী দেহ নই, আমরা চিন্ময় আত্মা এবং
আমাদের পরম সুখ অন্তর্নিহিত রয়েছে পরমাত্মারূপ শ্রীকৃষ্ণের সাথে আমাদের চিন্ময় প্রেমময়
সম্পর্ক উপলব্ধি করার মধ্যে।
দৃষ্টান্তের লোকটি তার
পিতা এবং তার পিতার অজ্ঞতার কারণে কষ্ট পেয়েছিল, তেমনই, আমরা আমাদের পরম পিতা সম্পর্কে
অজ্ঞান থাকার কারণে কষ্ট পাচ্ছি।
স্ফুলিংগ যেমন আগুনের অংশ, সূর্যরশ্মি যেমন সূর্যের
অংশ, তেমনই আমরাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভগবান হলেন সৎ, চিদ্ ও আনন্দময়।
তিনি চিন্ময় জ্ঞান ও আনন্দে পরিপূর্ণ এবং আমরাও তা-ই। যাহোক, আমরা অস্থায়ী জড় জগতের
সাথে নিজেদের মিথ্যে পরিচয়কে আশ্রয় করে আছি এবং আমাদের সেই প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে
গেছি। পরম বৈভবশালী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের পরমপিতা; আমরা সেই ধনী ব্যক্তির সন্তান।
কিন্তু আমরা আমাদের প্রকৃত অবস্থান, কৃষ্ণের অপার আশীর্বাদ সম্পর্কে অজ্ঞতা হেতু পুনর্জন্ম
এবং মৃত্যু, দুঃখ ও ভোগান্তিকে গ্রহণ করেছি।
আমাদের
প্রকৃত গুপ্তধন কী এবং আমরা কীভাবে একে উন্মোচন করতে পারি?
শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতায়
(৯.১৮) কৃষ্ণ বলেছেন, তিনিই জীবনের পরম লক্ষ্য এবং সমস্ত ধর্ম এবং শাস্ত্রের সারাতিসার।
শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, শুদ্ধ কৃষ্ণ ভাবনামৃত (কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় জ্ঞান ও কৃষ্ণভক্তি)
হলো আমাদের জন্মগত অধিকার (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.১.৫ তাৎপর্য)। সুতরাং, আমাদের পরম সম্পদ
হলো পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর প্রতি শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা। কিন্তু শুধু এটুকু
জানাই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়; আমাদের শুধু লক্ষ্যকে শনাক্ত করলেই হবে না, অবশ্যই সেখানে
পৌঁছানোর পন্থাও জানতে হবে। জ্যোতিষী শুধু দরিদ্র লোকটিকে তার গুপ্তধন সম্পর্কে অবগত
করেননি, তাকে এটি খুঁজে পেতে একটি মানচিত্রও দিয়েছিলেন। এই প্রচেষ্টাটি বিপর্যয়ের
দিকে যেতে পারে মনে করেই, প্রতিশ্রম্নতিশীল হয়ে তিনি উল্লেখযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা
প্রদানের মাধ্যমে তাকে সতর্ক করেছিলেন। এই দরিদ্র লোকটির ধনটি তার বাড়ির নিচে সমাহিত
ছিল, কিন্তু সে বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম অথবা উত্তর ভাগে খনন করে পেঁৗছতে পারত না। এই
ভুল জায়গাগুলো একজন উৎসুক গুপ্তধন সন্ধানকারীর জন্য হতাশাজনক হবে। তবে বাড়ির পূর্ব
ভাগে স্বল্প প্রয়াসেই অকল্পনীয় এই পুরষ্কারটি লাভ করা সম্ভব।
দক্ষিণ
ভাগ: কর্ম কাণ্ড
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর
শিক্ষায়, তিনি সনাতন গোস্বামীকে এই নির্দেশসমূহের প্রতি স্পষ্টরূপে গুরুত্ব আরোপ করতে
বলেছেন। জ্যেতিষী দরিদ্র লোকটিকে বলেছিলেন যে, বাড়ির দক্ষিণ ভাগটি কতগুলো উগ্র ভীমরুল
এবং পুরুষ মৌমাছির দ্বারা পরিপূর্ণ। বাংলা ভাষায়, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ‘দক্ষিণা’ শব্দটি
ব্যবহার করতেন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে পুরোহিতকে দান করা অর্থে।
দৃষ্টান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ ভাগটি আচার অনুষ্ঠানের
মাধ্যমে জাগতিক লাভের আশা করার উপস্থাপনা করে। এর অর্থ এই যে, নিছক আচার-অনুষ্ঠানের
প্রতি আসক্তি, চূড়ান্ত পারমার্থিক লক্ষ্য লাভের প্রতিবন্ধক। যদি আমরা কর্মকাণ্ডের
দ্বারা প্রকৃত ফলপ্রসূ পন্থাটি উপলব্ধি করতে চাই, আমরা নেতিবাচক কর্মফলরূপ বিষাক্ত
পোকার দ্বারা দংশিত হবো এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো না। প্রত্যেক ক্রিয়ারই
কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যখন আমরা পাপ করি, আমরা শাস্তি পেতে বাধ্য। ভীমরুল
এবং মৌমাছির হুল এই শাস্তিগুলোকে নির্দেশ করে। কিন্তু তারপরও আমরা যদি ধর্মীয় কাজ
করি এবং আনুপাতিক হারে উপার্জন করি, আনন্দপূর্ণ কর্মফল (যেমন উচ্চতর গ্রহে উন্নত হয়ে
অপ্রাকৃত আনন্দ এবং দীর্ঘায়ু লাভ) করি, তখনও আমরা জড় আসক্তি থেকে মুক্ত নই, আমরা
জন্মে জন্মে এ জগতে কষ্ট ভোগ করতে বাধ্য হবো। আমাদের পরম সম্পদ নাগালের বাইরেই থেকে
যাবে।
পশ্চিম
ভাগ: জ্ঞান কাণ্ড
জ্যোতিষী লোকটিকে বাড়ির
পশ্চিম ভাগও খনন করতে সাবধান করেছিলেন, যেখানে তার হাত গুপ্তধনকে স্পর্শও করতে পারবে
না। কারণ সেখানে ভূতপ্রেত অগ্নিকুণ্ড দ্বারা এটি পাহারা দিয়ে রেখেছে।
ভূতপ্রেতগুলো মানসিক
অশান্তিকে নির্দেশ করে যা আমাদের মনোযোগ বিঘ্নিত করে এবং সংকল্পকে বিক্ষিপ্ত করে। বাড়ির
পশ্চিম ভাগটি জ্ঞান কাণ্ডকে নির্দেশ করে। এটি দার্শনিক জল্পনামাত্র, যা শুধু পরম সম্পদ
লাভেই ব্যর্থ করে না, আমাদের সাধনা থেকেও বিচ্যুত করে।
আমাদের কোনো প্রকারের পাণ্ডিত্য, গবেষণা কৃষ্ণকে
বুঝতে সহোযোগিতা করবে না, কারণ তিনি চিন্ময়, সকল পার্থিব জ্ঞানের ঊর্ধ্বে। শ্রীল প্রভুপাদের
গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর একদিন কান্না করে বলেছিলেন, “স্বয়ংপ্রভ
শুদ্ধভক্তির পথ, মূর্খ লোকের যুক্তি তর্কের লক্ষ লক্ষ কাঁটা দ্বারা আবৃত।” (বৃন্দাবনে
প্রবচন, ১৯২৮)
এখানে এই মূর্খ, যুক্তি
ও তর্ক ভূতপ্রেতের আকার ধারণ করেছে, যা প্রকৃত সম্পদ শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় গ্রহণ
লাগিয়ে রেখেছে।
উত্তর
ভাগ: দিব্য যোগ
জ্যোতিষী দরিদ্র লোকটিকে
একটি বৃহৎ সর্পের থেকেও সাবধান করেছিলেন যা বাড়ির উত্তর ভাগে অবস্থান করছে। যদি সে
ঐদিকে খনন করে, এটি তাকে গিলে ফেলবে। হতে পারে, এটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। এই দিকটি রহস্যময়
দিব্য ধ্যান যোগকে নির্দেশ করে। এই কালসর্পটি মুখ হা করে বসে আছে, যা একটি দৈবিক ফাঁদ,
কাছে যাওয়া মাত্রই গিলে ফেলতে প্রস্তুত।
দার্শনিক তত্ত্ব ভগবানকে নিরাকার শূন্য বলে মনে
করে এবং যে কেউ নিরাকার ব্রহ্মে লীন হয়ে নিজে ভগবান হতে পারে বলে উত্থাপন করে। যেখানে
ভক্তিমূলক সেবা ভক্ত এবং ভগবানের পারস্পরিক প্রেম বিনিময়ের ওপর ভিত্তি করে আছে, সেখানে
এই মিথ্যে যুক্তিটি সম্পূর্ণ এর নীতিবিরুদ্ধ। এধরনের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যতীত, না
কোনো প্রেম, না কোনো আনন্দ বিনিময় হতে পারে। নিরাকারবাদ আসলে ছদ্মবেশে নাস্তিক্যবাদের
অনুশীলন, যার ফলাফল পারমার্থিক আত্মহত্ম্যা এবং এটি ভক্তিমূলক সেবার সবচেয়ে বড় শত্রু।
পূর্ব
ভাগ: সঞ্চিত ধন
প্রকৃত যোগ মানে পরমেশ্বর
ভগবানের সাথে সংযোগ স্থাপন করা, অস্তিত্বে বিলীন হয়ে যাওয়া নয়। অর্থাৎ, ভগবান ও
তাঁর ভক্তের মধ্যে প্রেম বিনিময়ের একটি চিন্ময় সংযোগ স্থাপন করা। এভাবে, অবশেষে জ্যোতিষী
সফল হওয়ার সঠিক পন্থাটি উত্থাপন করলেন — “যদি আপনি পূর্ব দিকে খুব স্বল্প পরিমাণও মাটি খনন
করেন, আপনার হাত খুব সহজেই গুপ্তধনের পাত্রকে স্পর্শ করতে পারবে।” পূর্ব ভাগটি ভক্তিযোগকে
নির্দেশ করে। ভক্তিমূলক সেবার মার্গে খুব স্বল্প প্রয়াসেই পরম সম্পদ লাভ করা যাবে।
একমাত্র পূর্ব দিকের অর্থাৎ ভক্তিমূলক সেবার মার্গেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর
যোগ্যতা লাভ করা যাবে। শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভাবদ্গীতায় (১৮.৫৫) নং শ্লোকে বলেছেন
ভক্ত্যা মামভিজানাতি
যাবান্ যশ্চাম্মি তত্ত্বতঃ।
ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা
বিশতে তদনন্তরম্ ।।
অর্থাৎ ভক্তির দ্বারা
কেবল স্বরূপত আমি যে রকম হই, সেরূপে আমাকে কেউ তত্ত্বত জানতে পারেন। এই প্রকার ভক্তির
দ্বারা আমাকে তত্ত্বত জেনে, তার পরে তিনি আমার ধামে প্রবেশ করতে পারেন। অভক্তেরা পরম
পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে কখনই জানতে পারে না। মনোধর্ম — প্রসূত জল্পনা — কল্পনার
দ্বারাও তাঁকে জানতে পারা যায় না। কেউ যদি পরম পুরুষোত্তম ভগবানকে জানতে চায়, তা
হলে তাকে শুদ্ধ ভক্তের তত্ত্বাবধানে শুদ্ধ ভক্তিযোগের পন্থা অবলম্বন করতে হবে। তা না
হলে, পরম পুরুষোত্তম ভগবান সম্বন্ধীয় তত্ত্বজ্ঞান তার কাছে সর্বদাই আচ্ছাদিত থেকে
যাবে।
রূপক দৃষ্টান্তটি শেষ
করার পর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধ থেকে বললেন (১১.১৪.২০ — ২১)
ন সাধয়তি মাং যোগো ন
সাংখ্যং ধর্ম উদ্ধব।
ন স্বাধ্যায়স্তপস্ত্যাগো
যথা ভক্তির্মমোর্জিতা ।।২০।।
অর্থাৎ, প্রিয় উদ্ধব,
আমার প্রতি আমার ঐকান্তিক ভক্তের অর্পিত সেবা আমাকে তাদের বশীভূত করে। অষ্টাঙ্গযোগ
সাধন, সাংখ্য দর্শন, পুণ্য কর্ম, বেদ অধ্যয়ন, তপস্যা বা বৈরাগ্য এসবের কোনওটির দ্বারাই
আমি তেমন বশীভূত হই না।
ভক্ত্যাহমেকয়া গ্রাহ্যঃ
শ্রদ্ধয়াত্মা প্রিয়ঃ সতাম্।
ভক্তিঃ পুনাতি মন্নিষ্ঠা
শ্বপাকানপি সম্ভবাৎ ।।২১।।
অর্থাৎ, পূর্ণ বিশ্বাস
সহকারে ঐকান্তিক প্রেমময়ী ভগবৎ — সেবার মাধ্যমেই কেবল আমাকে লাভ করা যায়। আমি আমার
ভক্তের নিকট স্বাভাবিকভাবেই প্রিয়। তাই তারা আমাকেই তাদের প্রেমময়ী সেবার একমাত্র
লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করে। এইরূপ শুদ্ধ ভগবৎ — সেবায় রত হয়ে, এমনকি চণ্ডালও তার নীচকুলে
জন্মের কলুষ থেকে শুদ্ধ হতে পারে।
কেউ হয়তো তার অষ্টাঙ্গযোগের
লক্ষ্য হিসাবে শ্রীকৃষ্ণকে গ্রহণ করতে পারে, সাংখ্য দর্শনেও তা হতে পারে। কিন্তু তা
সত্ত্বেও প্রত্যক্ষ ভগবৎ — সেবার মতো তা ভগবানকে সন্তুষ্ট করতে পারে না।
অতএব, যে কেউ ভক্তি
যোগ অনুশীলনের মাধ্যমে পারমার্থিক স্তরে উন্নত হতে পারে।
এভাবে ভগবান নিজেই (শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীচৈতন্য উভয়
রূপে) ভগবানকে লাভ করার জন্য শুদ্ধ ভক্তির মহিমা কীর্তন করেছেন। এমনই খাঁটি, অপ্রতিহত
অথবা নির্মল ও অনন্ত ভক্তিমূলক সেবা। জড় জাগতিক সম্পত্তি অথবা জড় জাগতিক আসক্তি থেকে
মুক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়, তবে ভক্তিমূলক সেবার দ্বারা পারমার্থিক আনন্দ লাভ করাই আমাদের
জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। (চৈ.চ.২০.১৪২ মধ্যলীলা।
দারিদ্র্য — নাশ, ভবক্ষয়,
প্রেমের ‘ফল’ নয়।
প্রেমসুখ — ভোগ — মুখ্য
প্রয়োজন হয়।।
শুদ্ধ ভক্ত শ্রীপ্রহ্লাদ
মহারাজ তাঁর মিত্রকে শিক্ষা প্রদান করেছেন যে, “একমাত্র অনন্ত শুদ্ধ ভক্তির দ্বারাই
ভগবানকে সন্তুষ্ট করা যায়। নৈষ্ঠিক ভক্তিমূলক সেবা ব্যতীত, সবকিছুই লোক দেখানো।”
(শ্রীমদ্ভাগবত ৭.৭.৫২)।
ন দানং ন তপো নেজ্যা
ন শৌচং নব্রতানি চ।
প্রীয়তেহমলয়া ভক্ত্যা
হরিরন্যদ্ বিড়ম্বনম্ ।।
শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা
আমাদের পরম লক্ষ্য অর্জনের উপায়ই নয়, এটি স্বয়ং মূল্যবান সম্পদ। উন্নত স্তরে কৃষ্ণের
প্রেমময়ী সেবা এবং শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। যেভাবে শ্রীচৈতন্য
মহাপ্রভু বর্ণনা করেছেন যে, বৈদিক শাস্ত্রসমূহে কৃষ্ণ সর্বাকর্ষক এবং তাঁর প্রতি সেবাই
আমাদের প্রবৃত্তি। কৃষ্ণ প্রেম অর্জন করাই আমাদের জীবনে চূড়ান্ত লক্ষ্য। তাই শ্রীকৃষ্ণ,
কৃষ্ণ সেবা এবং কৃষ্ণ প্রেম জীবনের ৩টি পরম সম্পদ। (চৈ:চ: মধ্যলীলা ২০.১৪৩)
পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি শুদ্ধ ভক্তি জীবের স্বাভাবিক
প্রবণতা, কিন্তু এটি অজ্ঞানতার প্রভাবে ঢাকা পড়ে যায়, ঠিক যেমন দীপ্তিমান সূর্য মেঘের
দ্বারা আবৃত হয়ে পড়ে। বিশুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা এই মেঘগুলোকে দূরীভূত করে দেয় এবং
দিব্য জ্ঞানের দ্বারা আমাদের সুপ্ত ভগবদ্ভক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করে। হৃদয় আত্মার গৃহস্বরূপ;
দরিদ্র লোকটির সমাহিত গুপ্তধন, হৃদয়ে সমাহিত সুপ্ত ভগবদ্ভক্তির প্রতিরূপ। যেমনটি চৈতন্য
মহাপ্রভু বলেন — নিত্য সিদ্ধ কৃষ্ণ প্রেম সাধ্য
কভু নয়। শ্রবণাদি শুদ্ধচিত্তে করয়ে উদয়। অর্থাৎ শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেমরূপ গুপ্তধন সুপ্তভাবে
জীবের হৃদয়ে নিত্য বিদ্যমান; শ্রবণ — কীর্তনাদি ভক্তি অনুশীলনের দ্বারা তাকে উদয়
করাতে হবে। (চৈ.চ. মধ্যলীলা ২২.১০৭)।
অর্থাৎ, সেই গুপ্তধন আমাদের সঙ্গেই আছে। কিন্তু
আমরা কেন তা উপলব্ধি করতে পারি না? জড়জগতে বিভিন্ন যোনীতে লক্ষ লক্ষ বছর ভ্রমণ করার
ফলে, জড়ের সঙ্গে আমাদের প্রকৃত সত্ত্বা মিশে গিয়ে আমরা যে শুধু গুপ্তধনই
হারিয়ে ফেলেছি তা নয়, এর অস্তিত্বকেই
ভুলে গেছি। সবকিছুর পরমভোক্তা শ্রীকৃষ্ণকে
ভুলে স্বতন্ত্রভাবে ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনা করা মানে পরম সম্পদকে আমাদের হৃদয়ে স্তূপাকৃতির
নোংরা আবর্জনার নিচে সমাহিত হওয়া। যখন আমরা স˜গুরুর তত্ত্বাবধানে ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলন
করি, আমাদের হৃদয় জড় জাগতিক আসক্তিরূপ আবর্জনার দূষণ থেকে মুক্ত হয় এবং ভগবানের
প্রতি আমাদের সুপ্ত প্রেম পুনরায় জাগ্রত হয়।
সবচেয়ে
ফলপ্রসূ ভক্তি অনুশীলন
মহাপ্রভুর দেয়া এই
দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, শুধু ভক্তিমূলক সেবার মাধ্যমে আমরা সেই গুপ্তধনকে পুনরুদ্ধার
করতে পারি, যা সুদীর্ঘ সময় ধরে অপ্রকট রয়েছে। কলহ — কপটতায় পরিপূর্ণ কলিযুগে ভগবানের
দিব্য নাম — হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ
হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। জপ করার মাধ্যমে ভগবানের অহৈতুকী প্রেম
লাভ করা যায়। এযুগে শাস্ত্রে উল্লেখিত নববিধা ভক্তি অর্থাৎ ভক্তির প্রধান নয়টি অঙ্গের
মধ্যে শ্রবণ, কীর্তন বা জপ সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা। যেভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর
শিক্ষাষ্টকমের প্রথম পঙ্ক্তিতে নিশ্চিত করেছেন যে, “ভগবানের দিব্য নাম জপ করার মাধ্যমে
একইসাথে বহু বছরের চিত্তরূপ দর্পণে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার হয় এবং পুনঃ পুনঃ জন্ম
মৃত্যুর চক্রের নির্বাপণ হয়।” এভাবে, আমরা আমাদের প্রকৃত সম্পদ, আমাদের গুপ্তধন, শুদ্ধ
ভগবদ্ভক্তি উন্মোচন করতে পারি। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে (মধ্যলীলা ২.৮১) বলেছেন —
আপনে করি’ আস্বাদনে, শিখাইল ভক্তগণে,
প্রেমচিন্তামণির প্রভু
ধনী ।
নাহি জানে স্থানাস্থান, যারে তারে কৈল দান,
মহাপ্রভু — দাতা — শিরোমণি।।৮১।।
এভাবেই ভগবান ও তাঁর
শুদ্ধ ভক্তের কৃপার মাধ্যমে আমরা কৃষ্ণের প্রেম ভক্তির পরম সুকৃতি অর্জন করতে পারি।
এরপর জ্যোতিষীর মতো আমরাও সকলকে গুপ্তধন উদ্ধারের রহস্য বলতে পারবো।
ভাষান্তর: ডা. তিথি দত্ত