বিধ্বংসী মন্ত্রণা
ভুল তথ্য ও অপপ্রচার: ছড়ায় বিভ্রান্তি, আনে বিধ্বংস
বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আমাদের বুদ্ধিকে আরো তীক্ষè করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা খোলসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে স্পষ্টতই উপলব্ধি করতে পারবো। ভক্তিযোগ অনুশীলন এবং ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন আমাদের চিন্তাশক্তিকে স্থির করে এবং বুদ্ধিকে সজীব রাখে। ভক্তিসহকারে কৃষ্ণের স্মরণ আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিপূর্ণতা দান করে যা নিম্নমানের বিষয় থেকে বেরিয়ে আসার সাহস যোগায়
রামায়ণের একটি লীলা আমাদের শিক্ষা দেয় কারো ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মানুষ কীভাবে আমাদের ব্যবহার করতে পারে এবং তাদের থেকে কীভাবে আমরা নিজেদের রক্ষা করব।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হলো ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে রামচন্দ্রের বনবাস। ভক্তিমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে এটি আমাদেরকে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে বিচ্ছেদেও দিব্য প্রেমের অনুভবের শিক্ষা দেয়। সেই সাথে নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে বোঝা যায়, ভুল তথ্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ কীভাবে বিভ্রান্ত হয়। যেহেতু আমরা এমন একটি পরিবেশে বাস করি যেখানে মানুষ নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ভুল তথ্য প্রচার করে, সেহেতু রামায়ণের এই লীলা আমাদের ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে দূরদৃষ্টি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
দক্ষভাবে চলার কৌশল
এই লীলাটি সূর্যবংশীয়দের রাজধানী অযোধ্যায় সংঘটিত হয়েছিল। রাজা দশরথ বহু বছর ধরে সততার সাথে রাজ্য পরিচালনা করছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামচন্দ্রের কাছে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন বলে মন স্থির করেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন প্রদেশের প্রজাদের নিয়ে একটি বিরাট সভা ডেকেছিলেন।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রামচন্দ্রের রাজা হওয়ার এবং পরদিন সকালে রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান আয়োজন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। এমন একটি সর্বজনীন পটভূমি থেকে রামায়ণের কাহিনি মোড় নেয় রাজা দশরথের দ্বিতীয় পত্নী কৈকেয়ীর দিকে। কৈকেয়ী তার সৌন্দর্যের কারণে দশরথের প্রিয় পত্নীতে পরিণত হয়েছিলেন এবং তিনি জ্যেষ্ঠ রাণী কৌশল্যার স্থান দখল করেছিলেন। এমন ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও পরিবারটিতে সৌহাদ্যর্ ছিল। কৌশল্যা বা কৈকেয়ী কেউই কারো প্রতি বিদ্বেষী ছিলেন না। তাদের পুত্রগণ — রাম, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন সবাই ভ্রাতৃত্বপূর্ণভাবে বসবাস করতেন।
এই পারিবারিক সম্প্রীতি রাতারাতি নষ্ট হয়ে গেল এক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির কুপরামর্শে। সেই প্ররোচনা দিয়েছিলেন কৈকেয়ীর একজন বয়স্কা দাসী, মন্থরা। এই কুপরামর্শ রানীদের মধ্যে সম্পর্কের বিপর্যয় ঘটায় যা পুরো অযোধ্যাকে দুঃখের সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল।
দাসী ও রানীর মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তা বিপর্যের সূত্রপাত করেছিল। মন্থরা প্রথমে কৈকেয়ীকে যখন রামচন্দ্রের রাজা হওয়ার খবরটি দিয়েছিলেন, তাতে কৈকেয়ী এত খুশি হয়েছিলেন যে তিনি তাকে তার একটি মুক্তার হার উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু মন্থরা সেই হার মাটিতে ছুড়ে ফেলে কৈকেয়ীকে বললেন তিনি বোকা, তাই কী ঘটছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
দাসীর দুঃসাহস দেখে কৈকেয়ী আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। সে রাজভবনে রাজার প্রিয় রানীর দাসী হিসেবে তার অবস্থান ধরে রাখতে চেয়েছিল। সে ভয়ে ছিল যে, রামচন্দ্র রাজা হলে তার মাতা কৌশল্যার অবস্থান সবার্গ্রে থাকবে এবং কৈকেয়ীর অবস্থান হবে পরিবারের অন্যান্য সব সদস্যের মতো। এটি মন্থরাকে অন্যান্য দাসীদের পর্যায়ে নামিয়ে আনবে। মন্থরা ছিলো কুঁজো, তাই তাকে নিয়ে অনেকসময় রসিকতা করা হতো। যদিও সেই রসিকতা বিদ্বেষপূর্ণ ছিলো না, তবুও এটি তার কাছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। বিশিষ্ট রাজকর্মচারীর পদে আসীন হওয়ার দরুন তাকে নিয়ে এ ধরনের রসিকতা বন্ধ হয়। সেই অবস্থান থেকে পতনের ভয়ে সে কৈকেয়ীর ওপর তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, যেন তিনি কোনোভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর বন্ধ করেন।
মন্থরা কৈকেয়ীকে বলে, ভরতের অনুপস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে পরের প্রজন্মকে দায়িত্ব দেওয়া মানে ভরতকে বঞ্চিত করা। ভরত তখন বাড়িতে ছিলেন না। কিন্তু রাজা দশরথ তখন ভেতর থেকে অনুভব করলেন তার অবসর নেওয়ার বিষয়ে এবং সে অনুসারেই তিনি কাজ করলেন; অর্থাৎ শ্রীরামের রাজ্যাভিষেকের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাছাড়া ভরত রামের অনুজ হওয়ায় রাজ্যভার তার কাছে যাওয়ার কোনো কারণই ছিলো না, রামচন্দ্র জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়ায় তাঁরই রাজা হওয়ার কথা। তা সত্ত্বেও মন্থরা ভরতের অনুপস্থিতির ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে কৈকেয়ীর মনে সন্দেহের বীজ বপন করে। রাতে সেই বীজে মন্থরা আবার জল সিঞ্চন করে। সতীনদের মধ্যে স্বভাবতই যে ঈর্ষা থাকে, তাকে কাজে লাগিয়ে মন্থরা বলেন, রামচন্দ্র রাজা হলে কৈকেয়ী হবেন কৌশল্যার দাসী এবং রামচন্দ্র ভরতকে মৃত্যুদণ্ড না দিলেও কারাবন্দী করে রাখবেন। এভাবে তিলকে তাল বানিয়ে মন্থরা ভরত ব্যতীত অন্যান্য সকলের প্রতি কৈকেয়ীর মনকে বিষিয়ে তোলে এবং এক পর্যায়ে ভ্রান্তিবশত কৈকেয়ী তার এবং তার পুত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল মনে করে তা থামাতে উদ্যত হলেন। তার দাসী তাঁকে পরামর্শ দিল, একবার রাজা দশরথ তাকে দু’টি বর দিয়েছিলেন তা চেয়ে নিতে — প্রথমত, ভরতকে রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনয়ন এবং দ্বিতীয়ত, চৌদ্দ বছরের জন্য রামচন্দ্রের বনবাস। মন্থরা আরো বলল, রামচন্দ্রের বনবাসের বিষয়ে রাজা তীব্রভাবে বিরোধিতা
করলেও কৈকেয়ী যেন তার অবস্থানে দৃঢ় থাকেন, কারণ রামচন্দ্র রাজ্যের বাইরে অবস্থান করলেই কেবল ভরত শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে সিংহাসন দখল করতে সক্ষম হবেন।
কঠোর হৃদয় অন্যদের হৃদয় ভাঙ্গার কারণ
এরপর দশরথ ও কৈকেয়ীর মধ্যকার হৃদ্যতা নষ্ট হয়েছিলো। প্রিয় পুত্র রামের রাজ্যাভিষেকের জন্য রাজার উল্লাস দেখে কৈকেয়ীর হৃদয় বজ্রকঠোর হয়েছিল, কারণ তিনি মনে করেছিলেন ভরতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তাঁদের দু’জনের অন্তকোন্দলের কারণে রাজার মন ভেঙ্গে গেল। রাজ্যাভিষেকের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করে রাজা যখন তার প্রিয় পত্নীর কক্ষে এলেন, তখন রানী তাকে দেওয়া পূর্বের দু’টি বরের কথা বললেন। রাজা তার দেওয়া কথার প্রতিশ্রম্নতি রাখতে চাইলেন। কিন্তু রানীর কণ্ঠে তার দু’টো ইচ্ছের কথা শুনে রাজা হতবাক হয়েছিলেন এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। জ্ঞান ফিরে এলে তখন রাজা বুঝতে পারলেন তাঁর দুঃস্বপ্ন সত্যি; তখন তিনি তাঁর স্ত্রী’র নির্মম ইচ্ছা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেন। অবশেষে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং তার স্ত্রী’র পায়ে ধরে ক্ষমা ভিক্ষা করলেন। তবুও কৈকেয়ী তার স্বামীর অনুরোধ রাখলেন না। বরং তিনি তার চাওয়া বরের স্বপক্ষে যুক্তি দেখালেন।
রাজা তাঁর প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ থাকার কারণে কৈকেয়ীর ইচ্ছা পূরণ করতে বাধ্য হলেন। রাজার শত অনুরোধ সত্ত্বেও কৈকেয়ী তার সিদ্ধান্তে দৃঢ় ছিলেন। তার হৃদয় এতো কঠোর হয়ে গিয়েছিলো যে সেখানে দাম্পত্য স্নেহের কোনো জায়গা ছিলো না, সৎ পুত্র রামচন্দ্রের প্রতি মাতৃস্নেহের জায়গা ছিলো না, পুত্রবধু সীতার জন্য নারীসুলভ ব্যবহারের কোনো স্থান সেখানে ছিলো না, শ্রদ্ধেয় রাজপুরোহিত বশিষ্ঠের প্রতি শ্রদ্ধার অবকাশ ছিলো না, জনসাধারণ (প্রজাগণ) যে তার নিন্দা করবে এমন ভয়ও তার ছিলো না। রামচন্দ্রের বনবাসের পর পুরো অযোধ্যা শোকের সাগরে নিমজ্জিত হলেও সেই সাগরের এক বিন্দু জলও কৈকেয়ীর হৃদয় স্পর্শ করেনি। দশরথের কাছে তাঁর প্রিয় পুত্র রামচন্দ্রের বিরহ অসহ্য হয়ে উঠেছিলো। এমনকি আরো বেদনাদায়ক ছিল এই বিষয়টি যে, যে শাস্তি সবচেয়ে গুরুতর অপরাধীদের দেওয়া হয়, রামচন্দ্রকে কোনো অন্যায় না করেও সেই শাস্তি পেতে হলো, তাও সেই সাজা রাজা দশরথকে নিজের হাতে দিতে হলো। এই যন্ত্রণায় তার হৃদয় ভেঙ্গে গেল এবং তা সহ্য করতে না পেরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। যে স্বামী এতকাল তাকে তাঁর প্রিয় পত্নীরূপে লালন করলেন, সেই স্বামীর মৃত্যুতেও কৈকেয়ীর হৃদয় বিগলিত হলো না।
কাল্পনিক ভরত বনাম বাস্তব ভরত
জ্ঞানী, দয়ালু ও ভদ্র কৈকেয়ীর বোকা, নিষ্ঠুর ও কঠোর কৈকেয়ীর রূপান্তর ছিল অবিশ্বাস্য। কথিত আছে যে, তিনি সহজাতভাবে মন্দ স্বভাবের ছিলেন না, তাহলে এতো জঘন্য একটা কাজ তিনি কীভাবে করলেন! তিনি ভেবেছিলেন ভরতের অনুপস্থিতিতে তাকে যে বঞ্চিত করা হচ্ছিল, তার সে স্বার্থ রক্ষা করার জন্য একমাত্র তিনিই ছিলেন, অন্য কেউ ছিলো না। তার কাছে মাতৃত্বটা এতটাই যৌক্তিক ছিলো যে, অন্য কোনোকিছু — কারো কথা, কারো আবেগ তার সংকল্প নষ্ট করতে পারেনি।
রাজার মৃত্যুর পর এবং রাজকুমারদের অনুপস্থিতে বশিষ্ঠ মুনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ভরতকে জরুরি তলবের ভিত্তিতে অযোধ্যায় আসতে বলেন। ভরত উদ্বিগ্নভাবে অযোধ্যায় ফিরলেন। অযোধ্যায় পৌঁছে তিনি দেখলেন হৈচৈপূর্ণ ও প্রফুল্ল শহরটি ভুতুড়ে ও নির্জন দেখাচ্ছিল। গভীর দুশ্চিন্তায় তিনি তার মায়ের কক্ষে ছুটে গেলেন। তার মাকে প্রণাম জানিয়ে পিতার কুশল জিজ্ঞেস করলেন। তখন কৈকেয়ী তাকে সব খুলে বললেন — কীভাবে সবার ষড়যন্ত্র থেকে তিনি ভরতের অধিকার রক্ষা করেছেন। সব শুনে তার কাছে মনে হলো তীক্ষè বাণ তার হৃদয় ভেদ করেছে। পিতার মৃত্যু ও ভাইয়ের নির্বাসন তাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। তিনি শুনলেন এসব বিপর্যয় তার নিজের মা ঘটিয়েছেন, তাও আবার তারই স্বার্থে। তার মায়ের কথাগুলো শুনে তার ক্ষত্রিয়ধর্ম অবজ্ঞা করতে ইচ্ছা করলো। যেখানে বলা আছে নারীর গায়ে হাত তোলা নিষেধ। তিনি কোনোরকমে নিজেকে সামলালেন। তিনি তার মাকে বললেন — তিনিই তাঁদের রাজবংশ ধ্বংসের কারণ।
মন যা চায়, সেই প্ররোচনার স্বীকার সবসময় হওয়া যাবে না। কৈকেয়ী যে ভুলগুলো করেছিলেন তা সাবধানতার সাথে আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত।
কৈকেয়ী তার পুত্রের করা নিন্দা বিশ্বাস করতে পারেননি এবং তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তার কল্পনায় তিনি একটি ভরত তৈরি করেছিলেন যে তার কাজের প্রশংসা করবেন। যখন বাস্তবিকপক্ষে ভরত তার নিন্দা করেছিলেন, তখন তিনি তার সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছিলেন, তিনি বুঝেছিলেন যে ভরতের কথা তিনি ভেবেছিলেন তিনি আসলে তার কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি অনুতপ্তবোধ করে ভরতের কাছে ক্ষমা চাইলেন, এমনকি ভরতের সাথে বনেও যান রামচন্দ্রকে ফিরিয়ে এনে পুনরায় সিংহাসনে বসাতে। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে — তখন আর কোনোকিছু ফিরে পাওয়া সম্ভব ছিলো না।
কৈকেয়ী কীভাবে তার মহান পুত্রকে তার কল্পনার সাথে গুলিয়ে ফেললেন! মন্থরার পরামর্শ কোনো বিচার ছাড়াই বিশ্বাস করা তার ভুলকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি একজনের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, অন্য সকলের পরামর্শ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আধুনিক যুগের মন্থরা
রামায়ণের মন্থরা চরিত্র বর্তমান সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিক। সমাজে এক শ্রেণির মন্থরা আছে যারা সর্বদা তাদের মন্দবুদ্ধির দ্বারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে লিপ্ত থাকে। বিভিন্ন ঘটনার প্রকৃত চরিত্র আড়াল করে গুজব ছড়িয়ে তারা মন্থরার ন্যায় সমাজে মানুষকে উসকে দেয়ার মাধ্যমে বিভেদ তৈরি করে এক পক্ষকে আরেক পক্ষের প্রতি বৈরী করে তোলে। সুস্থ সমাজব্যবস্থা ও তথ্যের সঠিকতা যাচাই না করে কৈকেয়ীর মতো ভুল পথে পরিচালিত হলে দশরথের রাজ্যের ন্যায় আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা্র বিপন্ন হবে। তাই সর্বস্তরের মানুষের উচিত এধরনের মন্থরাদের সঙ্গ বর্জন করা এবং গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে সঠিক পথে পরিচালত হওয়া; তবেই সমাজে শান্তি ও পরস্পর সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
আজকের উন্নত প্রযুক্তির বিশ্বে একই তথ্যের জন্য একাধিক ওয়েবসাইট
অ্যাক্সেস দেওয়া হয় — এধরনের প্রবেশাধিকারের অর্থ এটাই, যেন মানুষ ভুল তথ্যকে সত্যি বলে মনে করে ভুল না করে।
তবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে আগ্রহী মানুষেরা এই চ্যানেলগুলো নিজেদের অপপ্রচার বাড়ানোর জন্য এবং ভুল তথ্যে মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখার জন্য ব্যবহার করতে পারে। এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভয়ঙ্কর ব্যবহার।
আধ্যাত্মিক ক্ষমতায়ন
বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আমাদের বুদ্ধিকে আরো তীক্ষ্ম করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা খোলসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে স্পষ্টতই উপলব্ধি করতে পারবো। উন্নত নৈতিকতা থাকলে আমরা মানসিক শান্তি অনুভব করবো যা বিভ্রান্তির দোদুল্যমান পরিস্থিতি থেকে আমাদের রক্ষা করবে। ভক্তিযোগের প্রক্রিয়া আমাদের নৈতিকতা বাড়াতে সাহায্য করে ও মনকে প্রফুল্ল রাখে। ভক্তি শাস্ত্র অধ্যয়ন আমাদের চিন্তাশক্তিকে স্থির করে এবং বুদ্ধিকে সজীব রাখে। ভক্তিসহকারে কৃষ্ণের স্মরণ আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিপূর্ণতা দান করে যা নিম্নমানের বিষয় থেকে বেরিয়ে আসার সাহস যোগায়।
দুর্ভাগ্যবশত বিভ্রান্তি বা অপপ্রচার এতো ভয়ঙ্কর যে, তা আমাদের ভক্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আধ্যাত্মিক সম্পর্ক অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্য আধ্যাত্মিক সংগঠনের বিরুদ্ধে আমাদের পবিত্র বিশ্বাসকে আঘাত করতে পারে। তাই ভক্তবিরোধী প্রচারকদের সঙ্গ আমাদের এড়িয়ে চলতে হবে। কিন্তু তারপরও যদি এসব কথা আমাদের কানে পৌঁছে যায়, তাহলে কোনো আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের একক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিশ্বস্ত আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতার কাছ থেকে স্পষ্টকরণ চাওয়ার মাধ্যমে আমরা ভগবদ্ভক্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে পারবো। ভুল তথ্য আমাদের শুধু বাহ্যিকভাবেই ক্ষতি করে না, আভ্যন্তরীণভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আমরা যদি অযোধ্যাকে হৃদয়ের সাথে তুলনা করি তাহলে মন্থরা হচ্ছে মনের মতো। মন হচ্ছে সন্দেহ ও বাসনার কর্মক্ষেত্র: সন্দেহ আমাদের ভক্তির ক্ষতি করে, আর বাসনা নতুন বাসনার জন্ম দেয়। মনের দ্বারা বিপথগামী হয়ে আমরাও কৈকেয়ীর মতো আমাদের হৃদয় থেকে ভগবানকে নির্বাসিত করে দেই। মনের দ্বারা কল্পিত প্ররোচনাকে মোকাবেলা করার জন্য কৈকেয়ী যে দু’টি ভুল করেছিলেন, সেই দু’টি ভুল আমাদের এড়িয়ে চলতে হবে।
প্রথমত মন যা বলে সেটি এড়িয়ে চলতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত মন সর্বক্ষণই আমাদের সাথে থাকে, তাই আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মনের দ্বারা যদি আমাদের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা দোদুল্যমান অবস্থায় পর্যবসিত হয়, তাহলে সাধু, শাস্ত্র ও গুরুবাক্য দিয়ে তার মোকাবিলা করতে হবে। এই দুটোই সম্ভব সর্বদা ভক্তিমূলক সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার মাধ্যমে। এমন আধ্যাত্মিক সেবায় যুক্ত থাকার মাধ্যমে মনের বিভ্রান্তিকে অগ্রাহ্য করতে পারব এবং জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারবো।
— হরেকৃষ্ণ