মনে পড়ে, যখন ছোট ছিলাম, বাবা-মায়েরা আমাদের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতো। সেই গল্পগুলো খুবই মজাদার আর ধর্মীয়ভাবসম্পন্ন ছিল। সেগুলোতে রোমাঞ্চকর ও দুঃসাহসিক অভিযানের কাহিনিও ছিল, তবে গল্পগুলোতে সবসময় কোনো একটি শিক্ষা থাকতো, যা উচ্চমূল্যবোধ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ও নীতিমূলক ধারণা দিতো। আমাদের চারপাশে যে লোভ, হিংসা ও অহংকারের ছড়াছড়ি, তার বাইরেও রয়েছে সহানুভূতি, সহনশীলতা ও সততার মতো উচ্চতর মূল্যবোধ, এগুলো মায়েরা আমাদের সামনে তুলে ধরতেন। সেসব মূল্যবোধের কথা যখন শিশুদের বোঝানো হয়, তখন তা তাদের উর্বর চেতনার মধ্যে একটি সুস্থ মানসিকতা এবং নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
পিতামাতার কর্তব্য
সন্তানের কাছে পিতামাতা গুরুর মতো, যাদের তারা বিশ্বাস করতে পারে। শিশুরা যদি তাদের পিতামাতাকে মূল্যবোধসম্পন্ন জীবনযাপন করতে দেখে, তবে তাদের মধ্যে তা খুব শক্তিশালী একটি ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু তারা যদি এই মূল্যবোধের কথা কেবল শুনতে পায়, পিতামাতার মধ্যে এর বাস্তবিক প্রতিফলন না দেখে বরং বিরুদ্ধাচরণ দেখে, তারা এটিকে ভণ্ডামি বা প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তারা এসব মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
সুতরাং, পিতামাতার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কর্তব্য হলো প্রথমে নিজের মধ্যে সত্যিকারের মূল্যবোধকে লালন করা এবং তারপর তাদের সন্তানদের জন্য একজন যথাযথ এবং স্নেহশীল পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করা।
মূল্যবোধের প্রতি অবিচল আনুগত্যের মাধ্যমে সন্তানরা হৃদয়ের প্রকৃত সন্তুষ্টি খুঁজে পেতে পারে — এই শিক্ষাটিই হতে পারে সন্তানের প্রতি পিতামাতার ভালোবাসার সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ। শিশু যখন পিতামাতার ইতিবাচক প্রভাব দ্বারা পুষ্ট হয়, তখন সে বিশ্বের জন্যও একই ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়।
মূল্যবোধের গুরুত্ব
মূল্যবোধ একটি ভবনের ভিত্তির মতো। আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য যেসমস্ত পেশাদারী জ্ঞান প্রদান করি, যেমন গণিত, প্রকৌশল, বিজ্ঞানসহ আরো অনেক কিছু, এগুলো মূলত সেই ভবনটির মূল্যমান আরো বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু মূল্যবোধ হলো ভিত্তি। একটি সুন্দর ভবন দেখে, কেউ বলে না, “এই ভবনটির ভিত্তি কী চমৎকার!” সুন্দর আসবাবপত্র ও স্থাপত্যশৈলীই মুলত আমাদের নজর কাড়ে। কিন্তু শক্তিশালী ভিত্তি ছাড়া, কেবল ক্ষণস্থায়ী একটি ঝড়েই এসব ধ্বংস হতে পারে এবং এই পৃথিবীটা এমন ভীষণ ঝড়ে পরিপূর্ণ; যা প্রত্যেকের জন্যই অনিশ্চয়তায় ভরা এক রাস্তার মতো। এখানে সর্বদাই ভীষণ ভয় ও প্রলোভন থাকবে। আমরা রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ বা স্বামীজি যা-ই হই না কেন, আমাদের এসব অবস্থান সর্বদা পরিবর্তনশীল।
এভাবে প্রতিটি শিশুর এমন একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, যা তাদের জড়বিজ্ঞানে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধসম্পন্ন হতেও সহায়তা করবে। এভাবে উভয়ের সমন্বয়ে জীবন চালিত হলে, এমনকি চলার পথ দুর্গম হলেও তারা তাদের দায়িত্বে স্থির থাকতে পারবে। আমি মনে করি, শিক্ষকদের নিয়মিতভাবে শিক্ষার প্রকৃত অর্থ নিয়ে আলোচনা করা এবং আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
পিতামাতার প্রভাব
শিশুদের শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে পিতামাতার শিক্ষিত হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পিতামাতাই সন্তানের সবচেয়ে কাছের ও বিশ্বস্ত অভিভাবক। তাই সন্তানের পড়াশোনা, মূল্যবোধ প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের জীবনে পিতামাতার ব্যাপক প্রভাব থাকে। তাই আমাদের গোপাল’স গার্ডেন স্কুল — এ আমরা অভিভাবকদের জন্য কিছু কর্মশালার আয়োজন করে থাকি। এগুলো যদিও বাধ্যতামূলক নয়, তবে অনেক অভিভাবকই এই অনন্য সুবিধাগুলো গ্রহণের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বেশ আগ্রহী ও প্রাণবন্ত থাকেন। আমরা বলি, শিক্ষার ক্ষেত্রে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সহানুভূতির বিকাশ ঘটানো অত্যন্ত আবশ্যক; এটি অবহেলার বিষয় নয়। নৈতিক নিয়মগুলোকে হালকা করে দেখা হলে এই বিশ্বের কী হবে ভাবুন তো? বিশ্বের ভবিষ্যৎ নেতাদের যদি সব ক্ষমতা থাকে, কিন্তু সংবেদনশীলতা না থাকে, তাহলে তখন লাগামহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোতে নীতি-নৈতিকতার কথা যদি উল্লেখ করা হয়ও, তা নামমাত্র। তাই আমাদের সন্তানের চরিত্রকে সংস্কারের জন্য সময় দেওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি ।
অভিভাবক হিসেবে পিতামাতারা যদি সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি জীবনের উচ্চতর নীতিগুলোর ওপর জোর দেন, তবে প্রতিটি শিশু সর্বোচ্চ ফল পাবে এবং তারা আগামী প্রজন্মকে এই গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ প্রদান করতে পারবে। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ শিক্ষা প্রবাহিত হবে।
সর্বজনীন মূল্যবোধ = সর্বজনীন সমৃদ্ধি
হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি, শিখ, জৈন, পার্সি ইত্যাদি যেকোনো ধর্মের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, এসমস্ত ধর্মের ভিত্তি হলো সর্বজনীন মূল্যবোধ। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠতে হলে আমাদের শিশুদের এই নীতিগুলো শিখতে হবে। ভগবদ্গীতায় আমরা শিখি যে প্রকৃত জ্ঞান হলো প্রত্যেক প্রাণীকে সমান দৃষ্টিতে দেখা।
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শীনঃ।। (ভগবদ্গীতা ৫.১৮)।।
অর্থাৎ, যথার্থ জ্ঞানী বা পণ্ডিত বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গাভী, হস্তি, কুকুরভোজী চণ্ডাল সকলের প্রতি সমদর্শী। তিনি প্রত্যেককে আত্মারূপে দর্শন করেন, যা আমাদের জীবনীশক্তি ও চেতনার উৎস। তিনি আমেরিকান, ভারতীয়, পুরুষ, মহিলা, হিন্দু, মুসলিম, কালো, সাদা ইত্যাদি দেখেন আত্মার বিভিন্ন বাহ্যিক প্রকাশ হিসেবে। আমরা যখন নিজেদের মধ্যে সেই প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারি, তখন যেখানেই প্রাণ আছে, সেখানেই সেই চিন্ময় সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারি। আর স্বাভাবিকভাবেই তখন প্রতিটি প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা আসে, মমতা আসে। আর এরূপ উপলব্ধির ফল জানতে চান? এর ফলে নিজের চারপাশের প্রতিটি জীবের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসার জন্ম হয়। তখন প্রত্যেককেই আপন মনে হয়। আমরা সবাই একই গ্রহে বসবাস করি। বর্তমান সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিশ্বায়নের যুগে এসে, এই নীতিটি বোঝা খুবই জরুরি। যখন ১৯২৯ সালে ওয়াল স্ট্রিটে স্টক মার্কেটে ধস নামে, তখন এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যার ভুক্তভোগী হয়েছিল সারা বিশ্ব। যখন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার আক্রমণ করা হয়েছিল, তখন এটি সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল। তাই আজকাল কোথাও যা ঘটুক না কেন, এর প্রভাব সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সবকিছু বর্তমানে অঙ্গাঙ্গিভাবে নির্ভরশীল। তাই এমন একটি চেতনার জাগরণ এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যার মাধ্যমে আমরা বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে যে সকলই আত্মীয় তা উপলব্ধি করতে পারবো।
প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের ধর্ম যা-ই হোক না কেন, মন্দ ধারণা থেকে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ রাখা। সেজন্যই আমরা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস, প্রার্থনা, আচার-আচরণ, মূল্যবোধ এবং নীতিগুলোর মাধ্যমে আমরা সেই সমদর্শী চেতনা এবং ফলস্বরূপ বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলি। ব্যবসা, রাজনীতি, পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি সবকিছুতেই বিশ্বমানবতা ও বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে লালন করে, আমরা আমাদের সন্তানদের সমৃদ্ধি এবং ফলস্বরূপ আগামী বিশ্বের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারি। — হরেকৃষ্ণ
ভাষান্তর: শ্যামমুরলী দাস