ভারতের উত্তর প্রদেশে সরযূ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে শ্যামল শস্যে পরিপূর্ণ কোশল নামক এক বিশাল ও সমৃদ্ধ ভূখণ্ড রয়েছে। এই বিশাল ভূখণ্ডের মধ্যে মানবজাতির শাসক বৈবস্বত মনুর অভিলাষ অনুসারে অযোধ্যা নামে এক বিখ্যাত নগর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ত্রেতাযুগে অযোধ্যার রাজা ছিলেন দশরথ।
মহারাজ দশরথ সমগ্র পৃথিবীর স¤্রাট এবং মহান রাজর্ষিই ছিলেন না, তিনি মহর্ষির পর্যায়ে বিবেচিত হতেন। তিনি ছিলেন একজন দুর্জয় যোদ্ধা এবং একাই অগণিত প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে যুদ্ধ করতে সমর্থ ছিলেন। তিনি ও তাঁর প্রজাগণ প্রত্যেকেই ছিলেন ধার্মিক, অযোধ্যা নগরী ছিল সম্পূর্ণ আদর্শ বৈদিক সভ্যতার নিদর্শন।
যদিও মহারাজ দশরথ চমৎকার বিভূতি ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তারপরও তিনি অসুখী ছিলেন। কারণ, অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বংশ রক্ষার জন্য তিনি কোনো পুত্রসন্তান লাভ করতে পারেননি। সে উদ্দেশ্যে তিনি এক অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করলেন।
তখন ঋষ্যশৃঙ্গ মহারাজ দশরথের কাছে গিয়ে বললেন, “প্রিয় রাজন, আপনি নিশ্চিত চারটি সুমহান পুত্রসন্তান লাভ করবেন। তাই, আমি প্রস্তাব করছি যে, এ উদ্দেশ্যে পুত্রেষ্টি নামক একটি ভিন্ন যজ্ঞ সম্পন্ন করা হোক।” মহারাজ দশরথ সানন্দে সম্মতি জ্ঞাপন করলে শীঘ্রই এ যজ্ঞানুষ্ঠানও শুরু হলো।
ইতোমধ্যে, উচ্চতর গ্রহলোকের প্রধান দেবতাগণ সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নিকট এসে বললেন, “হে পিতামহ, আপনার বরে রাবণ এতই শক্তিশালী হয়েছে যে, সে ইচ্ছামতো সকলকেই উদ্বিগ্ন করছে। এমনকি আমরা দুষ্ট রাক্ষসদেরও পরাস্ত করতে পারছি না। সেজন্য আপনার প্রতি অনুরোধ, আপনি ব্যক্তিগতভাবে তাকে বধের পরিকল্পনা করুন।”
সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা পরিস্থিতি বিবেচনা করে উত্তর দিলেন, “বর চাওয়ার সময় রাবণ মানুষদের তুচ্ছ জ্ঞান করে তাদের হাতে মৃত্যু না হওয়ার কথা উল্লেখ করেননি।”
ব্রহ্মা যখন রাবণের মৃত্যু বিষয়ে ভাবছিলেন, ঠিক তখনই ভগবান বিষ্ণু গরুড়ের পিঠে চড়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। অসংখ্য সূর্যের মতো দীপ্তিমান, অত্যুজ্জ্বল পীত বসন, শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী চতুভূর্জরূপী ভগবান বিষ্ণুকে দেবতারা ভক্তিসহকারে প্রণতি নিবেদন করলেন। তারপর ভগবানকে অনুরোধ করে বললেন, “হে জগতের নাথ পরমেশ্বর ভগবান, রাবণকে বধ করার উদ্দেশ্যে এবং আমাদের মুক্ত করতে কৃপাপূর্বক নিজেকে চার অংশে প্রকাশ করে মহারাজ দশরথের পুত্ররূপে অবতরণ করুন।” ভগবান বিষ্ণু উত্তর দিলেন, “আপনারা নিশ্চিত থাকুন, আর কোনো ভয়ের কারণ নেই। আমি খুব শীঘ্রই অবতরণ করে রাক্ষসদের রাজা ও আপনাদের শত্রুকে বধ করে এগারো হাজার বছর রাজ্য শাসন করব।” আশ্বাসবাণী শুনে দেবতাগণ উৎফুল্ল হয়ে ভগবানের দিকে তাকিয়ে থাকলে ভগবান বিষ্ণু সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।
এদিকে মহারাজ দশরথের যজ্ঞাগ্নি থেকে সর্বশুভকর, ঘন কৃষ্ণবর্ণের এক অসাধারণ শরীরবিশিষ্ট ব্যক্তির আবির্ভাব হলো। এই ব্যক্তি অসীম শক্তির অধিকারীরূপে প্রকাশিত, চিন্ময় অলংকারে বিভূষিত এবং তাঁর হাতে ছিল একটি স্বর্ণের সুবৃহৎ মিষ্টান্ন—পাত্র। তিনি মহারাজ দশরথকে বললেন, “আমি ভগবান বিষ্ণুর দূত।” রাজা করজোড়ে উত্তর দিলেন, “হে বিষ্ণুদূত, আমি আপনার কী সেবা করতে পারি, কৃপাপূর্বক আমাকে আদেশ করুন।”
ভগবান বিষ্ণুর সেবক বললেন, “এই মিষ্টান্ন—পাত্রটি আপনার সম্পাদিত যজ্ঞ দুটির পুরস্কার। আপনার তিন রানীকে এটি ভোজন করতে দিন। এর ফলে আপনি চার পুত্রসন্তান লাভ করবেন, যারা আপনার সুনামকে চিরকাল অক্ষয় রাখবে।”
মহারাজ দশরথ সানন্দে মিষ্টান্ন—পাত্র গ্রহণ করে বিষ্ণুদূতকে প্রদক্ষিণ করলেন। বিষ্ণুদূত প্রস্থান করলে মহারাজ দশরথ দ্রুত রানীদের মধ্যে মিষ্টান্ন বণ্টন করলেন যেন তাঁর পুত্রসন্তান লাভের অভিলাষ পূর্ণ হয়। তিনি কৌশল্যাকে সমস্ত মিষ্টান্নের অর্ধেক, সুমিত্রাকে এক—চতুর্থাংশ এবং কৈকেয়ীকে এক—অষ্টমাংশ মিষ্টান্ন প্রদান করলেন। তারপর কিছুক্ষণ বিবেচনার পর অবশিষ্ট এক—অষ্টমাংশ তিনি সুমিত্রাকে প্রদান করলেন। সন্তান লাভ সুনিশ্চিত হওয়ায় তিন রানীর সবাই আনন্দে আত্মহারা হলেন। তিন রানীই পরম আগ্রহে মিষ্টান্ন ভোজনের পর তাঁরা তাঁদের গর্ভে দিব্য সন্তানের উপস্থিতি উপলব্ধি করলেন। যখন মহারাজ দশরথ শুনলেন, রানীদের সবাই গর্ভবতী হয়েছেন, তখন তিনিও খুবই আনন্দিত হলেন।
ব্রহ্মা দেবতাদের আদেশ দিলেন, “ভগবান বিষ্ণুর আবির্ভাব আসন্ন, তাঁকে সহায়তা করার জন্য আপনারা আপনাদের অংশ—প্রকাশরূপ সন্তান উৎপাদন করুন। বানর শরীররূপী আপনাদের উৎপাদিত সন্তানেরা (অপ্সরা, স্ত্রী বানর, যক্ষপত্নী, নাগ, বিদ্যাধরসহ অন্যান্য প্রজাতির সংযোগে জন্মলাভ করে) অবশ্যই তাদের ইচ্ছামতো যে—কোনো রূপ ধারণ করতে সক্ষম হবে। তদুপরি, তারা হবে অত্যন্ত
বুদ্ধিমান, অস্ত্র পরিচালনায় অত্যন্ত পারদর্শী, ভগবান বিষ্ণুর ন্যায় পরাক্রমশালী এবং দিব্য দেহের অধিকারী।”
ব্রহ্মার আদেশে ইন্দ্র বালি, সূর্য সুগ্রীব, বৃহস্পতি তারক, কুবের গন্ধমাদ, বিশ্বকর্মা নল, বরুণ, সুষেণ এবং বায়ু হনুমানের জন্ম দিলেন। ভগবান বিষ্ণুকে সহায়তা করার জন্য এই প্রধান প্রধান বানরগণ ছাড়াও হাজার হাজার বানর জন্মগ্রহণ করে। তারা সকলেই পর্বতের মতো বিশালদেহী এবং রাবণের সাথে যুদ্ধ করতে উদগ্রীব ছিল। জন্মদাতা দেবতাদের ন্যায় এসব বানরেরাও গর্ভধারণের সাথে সাথেই জন্মগ্রহণ করে। তারা এতই শক্তিশালী ছিল যে তারা তাদের অভেদ্য শক্তির দ্বারা সমুদ্রকেও আন্দোলিত করতে পারতো। এই জীবসমূহ তিন ধরনের ছিল — ভল্লুক, বানর ও গাভির লেজের ন্যায় লম্বা লেজবিশিষ্ট বানর (হনুমান)। এক কোটির বেশি হনুমান ও ভল্লুক ছিল এবং যখন তারা বনে ঘোরাফেরা ও ফলমূল আহার করত, তখন পৃথিবী যেন কম্পিত হতো।
দ্বাদশ মাস গর্ভধারণের পর চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমীর দিন কৌশল্যা একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিলেন। এই দিব্য শিশুটি ছিল রক্তিম অধর ও চক্ষুবিশিষ্ট এবং সুদীর্ঘ বাহুসহ সবরকম মঙ্গলসূচক লক্ষণে বিভূষিত। তিনি শৌর্য—বীর্য ও শক্তিমত্তায় ভগবান বিষ্ণুর অর্ধাংশের প্রতিনিধিত্ব করতেন।
তার পরপরই, কৈকেয়ী শৌর্য-বীর্যে ভগবান বিষ্ণুর এক—চতুর্থাংশ প্রতিনিধিত্বকারী এক পুত্রসন্তান জন্ম দিলেন। ভগবান রামচন্দ্র আবির্ভাবের দুই দিন পরই, সুমিত্রা যমজ পুত্র-সন্তানের জন্ম দিলেন, যাদের প্রত্যেকেই ছিল শৌর্য—বীর্যে ভগবান বিষ্ণুর এক ষষ্ঠাংশের সমান। নবজাতক চার শিশুর পরস্পরের মধ্যে সাদৃশ্য ছিল এবং প্রত্যেকেই দেখতে অত্যন্ত দীপ্তিমান ও মনোমুগ্ধকর ছিল। মহারাজ দশরথের চার পুত্রের আবির্ভাবের সময় দেবতাগণ স্বর্গ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন, গন্ধর্বগণ গান গেয়েছিলেন, বাদ্য বাজিয়েছিলেন এবং অপ্সরাগণ নৃত্য করেছিলেন। অযোধ্যায় মহাসমারোহে উৎসব হয়েছিল এবং সেখানে গায়ক, নৃত্যশিল্পী ও অভিনেতারা রাজপথে সমবেত হয়ে সবার আনন্দবিধান করেছিল, প্রজাগণ সবাই আনন্দ উৎসবে যোগ দিয়েছিল।
কৌশল্যার সন্তান আবির্ভাবের তের দিন অতিবাহিত হলে মহারাজ দশরথের রাজপুরোহিত বশিষ্ঠমুনি নামকরণ সংস্কার সম্পাদন করেন। তিনি কৌশল্যার পুত্রের নাম রাখেন রাম আর কৈকেয়ীর পুত্রের নাম রাখেন ভরত, সুমিত্রার দুই পুত্রের নাম রাখেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন।
তারপর, বশিষ্ঠ মুনি মহারাজ দশরথের চার পুত্রের উপনয়ন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং যজ্ঞোপবীত ধারণ সংস্কার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা সমাপ্ত করেন। বশিষ্ঠ মুনির তত্ত্বাবধানে থেকে চার ভাই বৈদিক জ্ঞান ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং তাদের মধ্যে ভগবদ্ গুণাবলির সমন্বয় ঘটে।
জন্মের পর থেকেই রাম সবদিক থেকে অন্য ভাইদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি মহারাজ দশরথের প্রিয়তম পুত্রে পরিণত হন। একইভাবে, বাল্যকাল থেকেই লক্ষ্মণ রামের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। অনুরূপভাবে, রামও লক্ষ্মণকে ছাড়া কোনো কিছু খেতে এমনকি ঘুমাতেও চাইতেন না। রাম যখন শিকারে বের হতেন, লক্ষ্মণও সর্বদা তাঁর সঙ্গে যেতেন। অপরদিকে ভরত ও শত্রুঘ্ন ছিলেন একে অপরের খুবই প্রিয় ও অবিচ্ছেদ্য। — হরেকৃষ্ণ
[এভাবে পরমেশ্বর ভগবান তাঁর অংশ প্রকাশসহ শ্রীরামচন্দ্র রূপে আবিভূর্ত হয়ে পৃথিবীকে ধন্য করেছিলেন]
দয়ে বললেন, তিনি একজন ব্রাহ্মণের সাথে যুদ্ধ করবেন না।
ফলাফল: সমানে সমান, কিন্তু এপর্যন্ত অর্জুন — ১, কর্ণ — ০
৪। তখন পাণ্ডবরা বনবাস কাটাচ্ছিলেন। কর্ণের পরামর্শে প্রচুর ধন সম্পদ প্রদর্শন করে দুর্যোধন পাণ্ডবদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিলো। সেসময় কিছু গন্ধর্ব সেই এলাকা দিয়ে বিহার করছিলেন। তারা দুর্যোধনের পথরোধ করেন, আর সম্মুখ সমরে কৌরবদের পরাজিত করেন। আহত কর্ণ পালিয়ে যান, দুর্যোধন বন্দী হন। তখন কিছু কৌরবসেনা পাণ্ডবদের সহায়তা কামনা করলে অর্জুন সেই একই গন্ধর্বদের পরাজিত করেন, যারা কর্ণকে পরাজিত করেছিল এবং এভাবে অজুর্ন দুর্যোধনকে মুক্ত করেন।
ফলাফল: অর্জুন আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন — অর্জুন-২, কর্ণ-০
৫। বিরাট যুদ্ধের সময়, অর্জুন একা হাতে সমগ্র কৌরব সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে তিনি কর্ণ সহ কৌরবদের সকল মহারথীকে পরাস্ত করেন। মহাভারতে এই ঘটনাটি ছিল যুদ্ধের সর্বোত্তম একক প্রদর্শনী। অনেকেই বলবেন এই যুদ্ধে তাদের প্রকৃত শক্তির পরীক্ষা হয়নি, কারণ সেদিন কর্ণের কাছে তার শক্তিশেলগুলো ছিলো না। কিন্তু কর্ণের অস্ত্র বহন না করার দায় আসলে কার ওপর বর্তায়? অবশ্যই কর্ণের নিজের? একজন ধনুর্ধরের ওপর কি যুদ্ধের সময় তার নিজ অস্ত্র নিজে বহনের দায় দায়িত্ব বর্তায় না? বিশ্বকাপ ফাইনালে একজন ব্যাটস্ম্যান শূন্য রানে আউট হওয়ার পরে কি ব্যাখ্যা দিতে পারেন, “ওহ্হো, আমি আমার সেরা ব্যাটটি ক্রিজে আনতে ভুলে গিয়েছিলাম”? আর অর্জুন তার দিব্যাস্ত্রগুলো কারোর কাছ থেকে উপহার স্বরূপ পাননি। হিমালয়ে কঠিন তপস্যায় দেবতাদের সন্তুষ্ট করে অত্যন্ত কঠোর সাধনার দ্বারা তিনি সেগুলো অর্জন করেছিলেন।
ফলাফল: অজুর্ন-৩, কর্ণ-০
তাই এমনকি যুদ্ধের ১৭তম দিনেও অর্জুন তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখেছিলেন।
কর্ণ কি অর্জুনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন না? তিনি তো দুর্যোধনের জন্য একাই দেশ জয় করেছিলেন; যেখানে যুধিষ্ঠিরের জন্য জয় করতে অজুর্নের চার ভাইকে প্রয়োজন হয়েছিলো?
এই প্রশ্নে কিছু বিচার্য বিষয় রয়ে গেছে। একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা যাক। যুধিষ্ঠির যেমন রাজসূয় যজ্ঞে তার চার ভাইকে চতুর্দিক জয় করতে পাঠিয়েছিলেন, তেমনই পাণ্ডবরা বনবাসে থাকাকালে কর্ণ পৃথিবীর সমস্ত রাজাকে পরাজিত করে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপঢৌকন দিয়ে দুর্যোধনের জন্য উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। এই ঘটনাগুলো কি কর্ণের মাহাত্ম্য প্রকাশ করে? না। কারণ, যেমন পূর্বদিকে অভিযাত্রায় ভীম যখন অঙ্গ রাজ্যে এসে পড়েন এবং এর রাজাকে পরাজিত করেন। তখন অঙ্গ রাজ্যের রাজা কে ছিলেন? অবশ্যই কর্ণ। ভীম তো আর অর্জুনের মতো মহান ধনুর্ধর ছিলেন না। তা সত্ত্বে¡ও ভীম কর্ণকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন, তবে কর্ণ কোন বিচারে অর্জুনের চেয়ে মহান ধনুর্ধর হতে পারেন?
প্রশ্ন হতে পারে তবে অর্জুন কি একাকী কর্ণের মতো বিশ্বজয়ী হতে পারতেন? প্রকৃতপক্ষে অর্জুন তার থেকে অনেক বেশিই করতে পারতেন। আসুন নিম্নোক্ত ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করি।
১। পৃথিবীর রাজাদের কথা ছাড়-ন, খাণ্ডব-বন দহনের সময় অর্জুন দেবতাদেরও পরাজিত করেছিলেন। একবার কর্ণ সামান্য কিছু গন্ধর্বের কাছেই পরাজিত হয়েছিলেন, অর্জুনের এই মহান কর্মের কাছাকাছি সক্ষমতাও তার ছিল না।
২। অর্জুন একা হাতে নিবাতকবচ নামক ভয়ংকর রাক্ষসদের বিশাল সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন যাদের দেবতারা পর্যন্ত দীর্ঘদিন পরাজিত করতে পারেননি। পক্ষান্তরে কর্ণ একবার ঘটোৎকচ-এর সামনাসামনি হয়েছিলেন এবং নাস্তানাবুদ হয়েছিলেন।
প্রশ্ন হতে পারে, অর্জুন যদি একাই যুধিষ্ঠিরের পক্ষে পৃথিবী জয় করতে পারতেন, তবে তিনি তা করলেন না কেন? কারণ, চার ভাইয়ের প্রত্যেকে তাদের জ্যেষ্ঠকে সহায়তা করার সুযোগ চেয়েছিলেন, তাই অর্জুন কোনো ভাইকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে চাননি।
তবে কি কর্ণ অর্জুনের পরে দ্বিতীয় মহান ধনুর্ধর ছিলেন? না।
কারণ অন্তত আরো দুই জন যোদ্ধা কর্ণকে পরাজিত করেছিলেন।
১। অভিমন্যু: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ১৩তম দিনে অভিমন্যু চক্রব্যূহ ভেদ করে কৌরব বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু করেছিলেন। কর্ণকে তিনি দুই বার সামনে পেয়েছিলেন, একবার তো অজ্ঞানই করে ফেলেছিলেন, আর পরের বার কর্ণ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। কর্ণ বুঝতে পেরেছিলেন যে অভিমন্যুকে পরাজিত করা তো দূরের কথা, তিনি অভিমন্যুর সম পর্যায়ের যোদ্ধাও নন। তাই এই বিস্ময় বালককে পরাস্ত করার উপায় বের করতে কর্ণ দুর্যোধনকে গুরু দ্রোণকে নির্দেশ দিতে বলেছিলেন।
২। ভীম: দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমও কর্ণের চেয়ে সেরা ছিলেন। যেমনটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে; যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের জন্য ভীম নিজের পূর্বদিকে অভিযাত্রাকালে কর্ণকে পরাস্ত করেছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলাকালেও কর্ণ ও ভীম বেশ কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছিলেন। যুদ্ধের চতুর্দশ দিনে যখন অর্জুন সূর্যাস্তের পূর্বেই জয়দ্রথকে হত্যার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, কর্ণ অর্জুনের পথরোধ করেছিলেন। অর্জুনের পথ পরিষ্কার করতে ভীম কর্ণকে যুদ্ধে আবাহন করে। ভীম কর্ণকে ব্যস্ত রাখেন, অন্যদিকে অর্জুন জয়দ্রথের দিকে এগিয়ে যান।
যুদ্ধের ১৬তম দিনেও ভীম কর্ণের পথরোধ করে। এসময় কর্ণ কৌরবদের সেনাপতি ছিলেন। ভীম দুঃশাসনকে আক্রমণ করেন। কর্ণের চোখের সামনে ভীম দুঃশাসনকে হত্যা করেন। ভীমের শক্তি আর ক্রোধ প্রত্যক্ষ করে কর্ণের হাত থেকে ধনুক মাটিতে পড়ে যায়। একইভাবে কর্ণের চোখের সামনে ভীম কৌরবদের অনেক ভাইকে হত্যা করেন। কর্ণের ভাই ও ছেলেকেও ভীম হত্যা করে, আর কর্ণ কিছুই করতে পারেননি।
কর্ণ একবার ভীমকে ধনুর্যুদ্ধে পরাজিত করেন, আর ধনুক দিয়ে তাকে স্পর্শ করে তাকে মোটা খাদক বলে উপহাস করেন। তখন ভীম কর্ণকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেন, কিন্তু কর্ণ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ভীম কর্ণকে নিজের মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের প্রহারেই হত্যা করতে পারতেন, কিন্তু কর্ণকে হত্যা করতে অর্জুনের প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করতেই ভীম স্থান ত্যাগ করেন। এই ঘটনাটিকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যায়। কর্ণ মাতা কুন্তীর কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে, অর্জুন ছাড়া তিনি তার অন্য
কানো সন্তানকে হত্যা করবেন না এবং তিনি নিজের প্রতিজ্ঞার কথা দৃঢ় চিত্তে স্মরণে রাখেন। আবার ভীমও কর্ণকে হত্যা করার সুযোগ হাতছাড়া করে অর্জুনের প্রতিজ্ঞার প্রতি সম্মান জানিয়েছিলেন। তাই, ভীম—কর্ণ দ্বন্দ্বও ভীমের পক্ষেই থেকে যায়। কর্ণ নিঃসন্দেহে এক মহান যোদ্ধা ছিলেন, কিন্তু তিনি অর্জুনের চেয়ে কোনোভাবেই উত্তম ছিলেন না।
অর্জুনের পিতা ইন্দ্রদেব ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে সূর্যদেব প্রদত্ত কর্ণের কবচ কুণ্ডল ভিক্ষা হিসেবে চেয়ে নিয়ে কি অন্যায়ভাবে কর্ণকে দুর্বল করেননি?
১। সূর্যদেব প্রদত্ত কর্ণের কবচ কুণ্ডল থাকা সত্ত্বেও কর্ণ অনেকবার রাজা ধ্রুপদ, গন্ধর্ব, বিরাটরাজা ও অর্জুনের দ্বারা আহত ও পরাজিত হয়েছে। অতএব, দিব্য ওই কবচ—কুণ্ডল থাকলেও কর্ণ কোনোভাবেই অপরাজেয় হতেন না।
২। যখন ইন্দ্রদেব ব্রাহ্মণের বেশে কর্ণের কাছে কবচ—কুণ্ডল চেয়ে নিয়েছিলেন, তার বদলে তিনি কর্ণকে মহাশক্তিশালী এক অস্ত্র প্রদান করেন। অস্ত্রের এই অদল বদল কি কর্ণের ভবিতব্যে কোনো প্রভাব রেখেছিলো? কর্ণের কবচ—কুণ্ডল তাকে পূর্বেও রক্ষা করতে পারেনি। এটা হয়তো যুদ্ধের ১৪তম দিনেও রক্ষা করতে পারতো না, যখন ঘটোৎকচ কর্ণ ও কৌরবপক্ষের সবাইকে হত্যা করার ভয়াবহ সংকল্পে যুদ্ধ করছিলো।
তখন ইন্দ্রের প্রদত্ত অস্ত্র কর্ণের প্রাণ রক্ষা করেছিলো। তাই একথা বলা যেতেই পারে যুদ্ধাস্ত্রের ওই অদল—বদল প্রকৃতপক্ষে কর্ণকে অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী অস্ত্রের বিনিময়ে মহা শক্তিশালী অস্ত্র প্রদান করেছিলো যা কর্ণের জীবন বাঁচিয়েছিল।
ইন্দ্রদেব কতৃর্ক কৌশলে কর্ণের কবচ—কুণ্ডল হরণ কি কর্ণের জন্য ক্ষতির কারণ ছিলো? আপনিই সিদ্ধান্ত নিন।
কর্ণ কি একজন মহান যোদ্ধা, বীর, ধার্মিক এবং দয়ার্দ্র দানবীর ছিলেন না?
হ্যাঁ, কর্ণের অনেক ভালো গুণ অবশ্যই ছিলো। তিনি কলুষিত চরিত্রের ছিলেন না, কিন্তু তাকে তার প্রকৃত চরিত্রের চেয়ে অতিরিক্ত মহান হিসেবে উপস্থাপন করারও প্রয়োজন নেই।
এই কর্ণই দৌপদীকে টেনে হিঁচড়ে রাজসভায় নিয়ে আসার মন্ত্রণা দিয়েছিলেন; সকলের সামনে তার বস্ত্রহরণের মতো অত্যন্ত গর্হিততম কাজের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কর্ণই দ্রৌপদীকে সকলের সামনে বেশ্যা বলেছিলেন। এই কর্ণই দুর্যোধনকে সদ্য নির্বাসিত পাণ্ডবদের সামনে তাদেরই সম্পদ উড়িয়ে দেওয়ার কুপরামর্শ দিয়েছিলেন। যদিও গন্ধর্বদের হস্তক্ষেপে এই পরিকল্পনা কর্ণের দুঃখের কারণে পর্যবসিত হয়েছিলো।
কর্ণের বারবার নিজের ক্ষমতা জাহির করার প্রবণতাই দুর্যোধনকে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দিকে চালিত করে। ছয়জন মহারথীকে সাথে নিয়ে কর্ণই অসীম সাহসী মহাবীর কিশোর অভিমন্যুকে হত্যা করেন। এক্ষেত্রেও দুর্যোধনকে প্রথম উত্তেজিত করে তোলে সেই কর্ণ। শল্যরাজার সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সময় কর্ণ শল্যদেশের নারীদের নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন।
সুতরাং, যদিও কর্ণের কিছু ভালো গুণ ছিলো, কিন্তু তাকে নিয়ে অকারণ প্রশস্তি গাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। — হরেকৃষ্ণ
[লেখক: ইস্কন সন্ন্যাসী ও দীক্ষাগুরু]