কৃষ্ণভাবনামৃতের উদ্দেশ্য
কৃষ্ণভাবনামৃতের উদ্দেশ্য
✍ কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
১১ জুলাই ২০২৬
বর্ষ: 2025  |  ইস্যু: ১ম সংখ্যা

কৃষ্ণভাবনামৃতের উদ্দেশ্য

কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের উদ্দেশ্য প্রতিটি মানুষকে বেঁচে থাকার উপযুক্ত করে তোলা। অর্থাৎ, এ দুঃখময় জীবন সংগ্রামের সমাপ্তি সাধন করা। কীভাবে এই জীবন সংগ্রামের সমাপ্তি সাধন করতে হয় এবং কীভাবে নিত্য আনন্দময় জীবন লাভ করা যায়, তার বিশেষ নির্দেশ শ্রীমদ্ভাগবতে এবং ভগবদ্গীতায় দেওয়া হয়েছে। তাই এই সংকীর্তন আন্দোলন হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর সুযোগ। কেবল ভগবদ্গীতা শ্রবণ করে এবং হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করে মানুষ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হতে পারে। এভাবে জীবন সংগ্রামের সমাপ্তি সাধন করে মানুষ ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে

 কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

প্রতিষ্ঠাতা — আচার্য: আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন)

 জড় জগৎ সত্ত্ব, রজ ও তম —  প্রকৃতির এই তিনটি গুণের দ্বারা পরিচালিত হয়। রজোগুণের দ্বারা সমস্ত জড় বস্তুর সৃষ্টি হয়, সত্ত্বগুণের দ্বারা পালন হয় এবং সৃষ্টি যখন অশোভনভাবে স্থিত হয়, তখন তা তমোগুণের দ্বারা ধ্বংস হয়।

এই শ্লোক (শ্রীমদ্ভাগবত ৮.৫.২৩) থেকে আমরা, বর্তমানে যে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেই কলিযুগের পরিস্থিতি হৃদয়ঙ্গম করতে পারি। কলিযুগ শুরু হওয়ার পূর্বে, দ্বাপর যুগের শেষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতরণ করেছিলেন এবং ভগবদ্গীতা রূপে তাঁর উপদেশ প্রদান করে গেছেন, যার মধ্যে তিনি সমস্ত জীবকে তাঁর শরণাগত হওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু কলিযুগের শুরু থেকেই মানুষ প্রকৃতপক্ষে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত হতে পারেনি এবং তাই প্রায় পাঁচ হাজার বছর পর, শ্রীকৃষ্ণ পুনরায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবিভূর্ত হয়েছেন সারা জগৎকে তাঁর শরণাগত হওয়ার মাধ্যমে পবিত্র হওয়ার শিক্ষা দেওয়ার জন্য।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়ার অর্থ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হওয়া। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (১৮.৬৬) বলেছেন —

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

“সমস্ত ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। সেই বিষয়ে তুমি কোনো দুশ্চিন্তা করো না।” তাই মানুষ যখন শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত হন, তখন তিনি অবশ্যই সমস্ত কলুষ থেকে মুক্ত হন।

শ্রীকৃষ্ণ যখন অবতরণ করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর আদেশ দিয়েছিলেন, এবং সেই শ্রীকৃষ্ণ যখন ভক্তরূপে অর্থাৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হন, তখন তিনি আমাদের কলিযুগের পাপের সমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়ার পন্থা প্রদর্শন করেছেন। সেটিই হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের পন্থা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন আবিভূর্ত হয়েছিলেন, তখন তিনি সংকীর্তন আন্দোলনের যুগ সূচনা করেছিলেন। বলা হয়েছে যে, দশ হাজার বছর ধরে এই যুগ স্থাপিত হবে। অর্থাৎ, কেবল সংকীর্তন আন্দোলন গ্রহণ করার ফলে এবং হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলে, কলিযুগের অধঃপতিত জীবেরা উদ্ধার লাভ করবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ৪,৩২,০০০ বছর দীর্ঘ কলিযুগের শুরু হয়। তার মধ্যে কেবল ৫,০০০ বছর গত হয়েছে। অতএব এখনও আরো ৪,২৭,০০০ বছর বাকি রয়েছে। এই ৪,২৭,০০০ বছরের মধ্যে ১০,০০০ বছর ধরে যে সংকীর্তন আন্দোলন চলবে, তার উদ্বোধন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ৫০০ বছর আগে করেছেন। এই সংকীর্তন আন্দোলন কলিযুগের অধঃপতিত জীবদের হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলে, সংসার — বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ প্রদান করছে।

হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন সর্বদাই শক্তি সমন্বিত, কিন্তু এই কলিযুগে তা বিশেষভাবে শক্তি সমন্বিত। তাই মহারাজ পরীক্ষিৎকে উপদেশ দেওয়ার সময়, শ্রীল শুকদেব গোস্বামী এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন —

কলের্দোষনিধে রাজন্নস্তি হ্যেকো মহান্ গুণঃ।

কীর্তনাদেব কৃষ্ণস্য মুক্তসঙ্গঃ পরং ব্রজেৎ।। (শ্রীমদ্ভাগবত ১২.৩.৫১)।।

“হে রাজন, যদিও এই কলিযুগ একটি দোষের সমুদ্র সদৃশ, তবুও তার একটি মহৎ গুণ রয়েছে। কেবল হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলে, মানুষ জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে।”

   যাঁরা পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র প্রচার করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তাঁদের কর্তব্য ভববন্ধন থেকে মানুষদের অনায়াসে উদ্ধার করার এই সুযোগ গ্রহণ করা। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উপদেশ অনুসরণ করা এবং অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে সারা পৃথিবী জুড়ে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করা। মানব — সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য এটিই সর্বোত্তম কল্যাণকর কার্য।

   শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন কৃষ্ণসংকীর্তন প্রচার করার আন্দোলন। পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তনম্ — “শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তনের পরম বিজয় হোক।” এই কৃষ্ণসংকীর্তন এমন জয়যুক্ত কেন? সেই কথাও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বিশ্লেষণ করেছেন। চেতোদর্পণ-মার্জনম্ —  হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তনের ফলে হৃদয় নির্মল হয়। এই কলিযুগে সত্ত্বগুণ প্রায় নেই, তার ফলে হৃদয়ের নির্মলতাও নেই এবং তাই মানুষ তাদের জড় দেহকে তাদের স্বরূপ বলে মনে করে মস্ত বড় ভুল করছে, এটিই কলিযুগের সবচেয়ে বড় বিপদ। বড় বড় দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরাও তাদের দেহকে তাদের স্বরূপ বলে মনে করে। কয়েকদিন আগে এক বিখ্যাত দার্শনিক টমাস হাক্সলির সঙ্গে আমাদের আলোচনা হচ্ছিল এবং তিনি একজন ইংরেজ হওয়ার গর্বে অত্যন্ত গর্বিত। অর্থাৎ, তিনি তাঁর দেহটিকেই তাঁর স্বরূপ বলে মনে করে দেহাত্মবুদ্ধির দ্বারা আচ্ছন্ন। সর্বত্রই আমরা মানুষকে এই ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন দেখছি। মানুষ যখন এভাবে দেহাত্মবুদ্ধি সমন্বিত হয়, তখন সে একটি কুকুর বা বিড়ালের মতো পশুতে পরিণত হয় (স এব গোখরঃ)। তাই আমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক কলুষ হচ্ছে এই দেহাত্মবুদ্ধি। এই ভ্রান্ত ধারণাবশত মানুষ মনে করে, “আমি এই শরীর, আমি ইংরেজ, আমি ভারতীয়, আমি আমেরিকান। আমি হিন্দু, আমি মুসলমান।” এই ভ্রান্ত ধারণাটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতি সাধনের সবচেয়ে

বড় প্রতিবন্ধক এবং তা দূর করা অবশ্য কর্তব্য। সেটিই ভগবদ্গীতার এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উপদেশ। প্রকৃতপক্ষে ভগবদ্গীতার শুরুতেই এই উপদেশ দেওয়া হয়েছে —

দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।

তথা দেহান্তরপ্রাপ্তি ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি।।

“দেহী যেভাবে কৌমার, যৌবন ও জরার মাধ্যমে দেহের রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী (আত্মা) এক দেহ থেকে অন্য কোনো দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনো এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না।” (ভগবদ্গীতা ২.১৩)। আত্মা যদিও দেহের ভিতরে রয়েছে, তবুও ভ্রান্তিবশত এবং পশুপ্রবৃত্তিবশত মানুষ তার দেহটিকে আত্মা বলে মনে করে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাই বলেছেন —  চেতোদর্পণমার্জনম্। ভ্রান্ত ধারণায় পূর্ণ হৃদয়কে কেবল শ্রীকৃষ্ণ — সংকীর্তনের দ্বারা পরিষ্কার করা সম্ভব। তাই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের নেতাদের কর্তব্য, অধঃপতিত জীবদের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে তাদের জড় — জাগতিক জীবনের ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত করা।

  এই জড় জগতে কেউই সুখী হতে পারে না। সেই সম্বন্ধে ভগবদ্গীতায় (৮.১৬) বলা হয়েছে —  আব্রহ্মভূবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্তিনোহর্জুন। “এই জড় জগতের সর্বোচ্চ লোক থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন লোক পর্যন্ত সবকটি স্থানই জন্ম — মৃত্যুর পুনরাবৃত্তিরূপ দুঃখ — দুর্দশার স্থান।” অতএব, চন্দ্রলোকে যাওয়ার আর কী কথা, কেউ যদি ব্রহ্মলোকেও যায়, সেখানেও সে সুখী হতে পারবে না। কেউ যদি প্রকৃতই সুখ চায়, তাহলে তাকে চিৎ — জগতে ফিরে যেতে হবে। এই জড় জগতে সকলকেই জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয় এবং যে সবচেয়ে যোগ্য, সে — ই এখানে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু এই জড় জগতের দুঃখ — দুর্দশায় জর্জরিত আত্মারা জানে না বেঁচে থাকা বলতে কী বোঝায় এবং যোগ্য কে। বেঁচে থাকার অর্থ মৃত্যুবরণ করা নয়; বেঁচে থাকার অর্থ অমৃতত্ব লাভ করে নিত্য আনন্দময় এবং জ্ঞানময় জীবন প্রাপ্ত হওয়া। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের উদ্দেশ্য প্রতিটি মানুষকে বেঁচে থাকার উপযুক্ত করে তোলা। অর্থাৎ, এ দুঃখময় জীবন সংগ্রামের সমাপ্তি সাধন করা। কীভাবে এই জীবন সংগ্রামের সমাপ্তি সাধন করতে হয় এবং কীভাবে নিত্য জীবন লাভ করা যায়, তার বিশেষ নির্দেশ শ্রীমদ্ভাগবতে এবং ভগবদ্গীতায় দেওয়া হয়েছে। তাই এই সংকীর্তন আন্দোলন হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর সুযোগ। কেবল ভগবদ্গীতা শ্রবণ করে এবং হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করে মানুষ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হতে পারে। এভাবে জীবন সংগ্রামের সমাপ্তি সাধন করে মানুষ ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে।  — হরেকৃষ্ণ।

উৎস: শ্রীমদ্ভাগবত ৮.৫.২৩ তাৎপর্য

শিক্ষার সারমর্ম
শিক্ষার সারমর্ম
কৃষ্ণভাবনামৃতের উদ্দেশ্য
কৃষ্ণভাবনামৃতের উদ্দেশ্য
অহিংসা, প্রেম ও মানবতাই শ্রীচৈতন্যদেবের আদর্শ
অহিংসা, প্রেম ও মানবতাই শ্রীচৈতন্যদেবের আদর্শ
কলিযুগে মুক্তির পথ — সংকীর্তন
কলিযুগে মুক্তির পথ — সংকীর্তন
একাদশী ব্রতের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
একাদশী ব্রতের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব
গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব
হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের অলৌকিক শক্তি
হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের অলৌকিক শক্তি
ভক্তিযোগ — জীবনের পরম পথ
ভক্তিযোগ — জীবনের পরম পথ
তার্কিকের ঈশ্বর দর্শন
তার্কিকের ঈশ্বর দর্শন
বৈদিক শাস্ত্র
বৈদিক শাস্ত্র