আজ বিশ্বজুড়ে ‘পৃথিবী দিবস’ উদযাপন করা হয়। এটি একটি বাৎসরিক রীতি যা পরিবেশ রক্ষার প্রতি সমর্থন প্রকাশ এবং প্রকৃতিকে সম্মান ও সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।
বৈদিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে পৃথিবীকে মা হিসেবে পূজিত করা হয়। সর্বপ্রথম, পৃথিবীকে একজন ব্যক্তি বা সত্তা হিসেবে স্বীকার করা বোঝায় যে, আমরা তার প্রতি উদাসীন নই, বরং তার চাহিদা ও দায়িত্বকে উপলব্ধি করি এবং তাকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান করি-যেমন একজন মাকে সমস্ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে সম্মানিত করা হয়। যেমন মা তাঁর সন্তানকে লালন—পালন করেন, তেমনই পৃথিবীও সমস্ত জীবকে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও আশ্রয় দিয়ে লালন করে, কোনো প্রকার বৈষম্য ও শর্ত ছাড়াই।
পৃথিবী, বায়ু, জল, আকাশ ও অগ্নি — এই পঞ্চভূত বৈদিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং বেদ ও পুরাণসমূহেও তা উল্লেখ আছে। প্রাচীনকাল থেকে প্রত্যেক উপাদানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য বিভিন্ন আচরণবিধি নির্ধারিত ছিল। যেমন — বলা হয়েছে চলমান নদীতে মলত্যাগ করা উচিত নয়। কিন্তু আজ সেই নীতিগুলো ভুলে গিয়ে প্রকৃতির উপর অবাধ শোষণ চলছে। দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা না ভেবে পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা আবহাওয়ার পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং নানা বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করছি।
এই জগতের সমস্যাগুলোর সমাধান আমরা বাস্তবিকভাবে করতে পারি, যদি আমরা আমাদের চেতনার সঠিক পরিশোধন করি। সমস্ত বাহ্যিক দূষণের মূল কারণ হলো দূষিত চেতনা — কারণ আমাদের মন লোভ নামক বিষাক্ততায় পূর্ণ, যা কখনোই পরিতৃপ্ত হয় না। এই লোভ মেটানোর জন্যই আমরা প্রকৃতিকে শোষণ করছি।
বৈদিক সমাধান হলো — সহজ জীবনে তৃপ্ত থাকা ও উচ্চ চিন্তা করা। আমাদের চেতনা পরিবর্তন করতে হবে; ছোট ছোট রাবণ না হয়ে আমাদের উচিত ছোট ছোট হনুমান হয়ে ওঠা —নিজের স্বার্থে পৃথিবীকে শোষণ না করে, ঈশ্বরীয় উদ্দেশ্যে তার সেবা ও সুরক্ষা করা।
এর বাইরে কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর নানা উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমরা যদি না বুঝি যে চেতনার পরিবর্তন ছাড়া এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না, তাহলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অনেক বছর আগে, আমি ভারতের পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন — সাধুদের মন্ত্রোচ্চারণে পরিবেশের কী উপকার হয়। আমি উত্তরে বলেছিলাম, এই মন্ত্র হৃদয়কে পরিশোধন করে। আপনি যদি নদী পরিষ্কার করেন, কিন্তু হৃদয় পরিষ্কার না করেন, তাহলে নদী শতবার পরিষ্কার করলেও মানুষ তা পুনরায় দূষিত করবে। তাই শুধু নদী নয়, মানুষকেও শিক্ষিত করতে হবে, যেন তারা ঈশ্বরের সরল ও পবিত্র উপহারগুলোতে তৃপ্ত থাকতে শেখে এবং তা শ্রদ্ধা করে।
মা পৃথিবীর একটি দেহ রয়েছে, যা আমাদের দেহের মতোই। যদি তার উপর সমস্যার সৃষ্টি হয়, সে নিজে থেকেই নিজেকে নিরাময় করতে পারে। কিন্তু আমাদের শরীরের মতোই, যদি তাকে বারবার শোষণ করা হয়, বিষাক্ত করে তোলা হয় এবং নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার সময় না দেওয়া হয়, তবে সে নিজেকে আর আরোগ্য করতে পারে না, ফলে দেখা দেয় নানা দুরারোগ্য ব্যাধি। মা পৃথিবী অসুস্থ হলে তার ফল হয় ভয়াবহ দুর্যোগ।
অতএব, আমাদের চেতনার পরিবেশকেও শুদ্ধ করতে হবে। আর এই চেতনা দূষণ দূর করার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম, প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, হরেকৃষ্ণ নাম সংকীর্তন। এই নামভজন আমাদের হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে প্রেম, দয়া ও অন্তর্গত তৃপ্তিতে — এটি আমাদের জীবনকে সরল করে এবং একইসঙ্গে এই পৃথিবীর সুস্থতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
— হরেকৃষ্ণ