বর্তমান সময়ের খুব পরিচিত একটি টার্ম “হিন্দু মিথলজি”।
বিষয়টি আধুনিকতার দিক থেকে অত্যন্ত সুন্দর মনে হলেও সম্প্রতি এর প্রয়োগ সুধী সমাজে
এক শঙ্কার সৃষ্টি করছে। কারণ, যে প্রসঙ্গে এ শব্দটির ব্যবহার করছেন, সেই প্রসঙ্গের
গভীরতা, প্রামাণিকতা বা মর্মার্থ উপলব্ধি না করেই তথাকথিত আধুনিকতার নামে এই শব্দটির
প্রয়োগ করা হচ্ছে। হিন্দু মিথলজি বলতে তারা বোঝাতে চাইছেন, “হিন্দু তথা বৈদিক সনাতন
ধর্মশাস্ত্রে উল্লিখিত বিষয় বা কাহিনীসমূহ কেবলই সাহিত্যিকের রচিত কাল্পনিক রূপকথা,
সেসমস্ত ধর্মগ্রন্থ কোনো একজন ব্যক্তির মনগড়া চিন্তাভাবনার প্রকাশ। ঠিক যেমনটি একজন
সাহিত্যিক তার রচনায় করে থাকেন।”
পাঠকগণের প্রতি অনুরোধ, আপনারা “হিন্দু মিথলজি” শব্দটি প্রয়োগের পূর্বে একবার সে সম্বন্ধে একটু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখুন, তা কি শুধুই কাল্পনিক রূপকথা নাকি অভ্রান্ত সত্য, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য দিকনির্দেশক সংবিধানস্বরূপ। এ প্রবন্ধে বৈদিক শাস্ত্রের প্রামাণিকতা ও সর্বজনগ্রাহ্যতা বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
প্রথমেই আলোচনা করা যাক, কেন আপনি শাস্ত্রকে প্রমাণ বলে মনে করবেন। অনেকেই বলে থাকেন, আমি কেন কারো ব্যক্তিগত রচনাকে ঈশ্বর প্রদত্ত নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করব? যদি কোনো নির্দেশ গ্রহণ করতেই হয়, তবে যা স্বয়ং ভগবান দিয়েছেন তা-ই গ্রহণ করব।
এ প্রসঙ্গে জ্ঞান লাভের তিনটি পন্থা বিষয়ে সংক্ষেপে
আলোচনা করব, কেন আপনাকে কোনো জ্ঞান লাভ করার জন্য ব্যক্তির উপর নির্ভর করেই তা জানতে
হয়? মানুষ সাধারণত প্রত্যক্ষণ, অনুমান ও শব্দ- এই তিনটি মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করে থাকে।
কিন্তু কোন পন্থায় যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়, তা আমাদের অনুধাবন করা দরকার। নি¤েœ এ
তিনটি পন্থার মধ্যে কোন পন্থায় যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়, সে সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো
:
প্রত্যক্ষণ
বা ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায় কি?
অনেকেই
বলে থাকেন- ‘যা দেখি না দু’নয়নে তা বিশ্বাস করি না গুরুর বচনে (ঝববরহম রং ইবষরবারহম)’;
কিন্তু আমাদের চোখ দিয়ে আমরা কতটা যথার্থ দেখি, তা প্রমাণ করা দরকার-
☞
সূর্যকে তো আমরা ঠিক একটি ঝকমকে রূপোর থালার মতো দেখি, কিন্তু আসলে কি সূর্য সেরকম
কিছু? (চিত্র-১); আবার সূর্যকে যে মানুষ পূর্বদিকে উদিত হতে দেখে, আসলে কি সূর্য পূর্বদিকে
ওঠে? জ্যোতির্বিজ্ঞান মতে সূর্য পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১৩ লক্ষ গুণ বড় এবং পৃথিবী সূর্যের
চারদিকে ঘোরে।
☞
পিচঢালা রাজপথ ও মরুভূমিতে প্রচ- রোদের সময় চললে আমরা যে জল (মরীচিকা) থৈ থৈ করতে দেখি,
তার অস্তিত্ব আছে কি? (চিত্র-২) দেখা যায় সামনে জল, কিন্তু এগিয়ে গেলে কি তা পাওয়া
যায়?
☞
লক্ষ্য করুন, পাশের চিত্রে (চিত্র-৩) চোখে দেখা গেলেও সাদা ত্রিভুজের অস্তিত্ব বাস্তবে
আেেছ কি?
এমনকি খালি চোখে তাকালে আমাদের হাতে আমরা কয়েকটি
রেখা ছাড়া আর কিছু দেখতে পাই কি? কিন্তু শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখলে
তো সে পরিষ্কার হাতেই কত বিচিত্র ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস আদি জীবাণু চোখে পড়বে।
এখন প্রত্যক্ষণের দ্বারা যদি নিজের হাতের মতো কাছের
কোনো বস্তুকে দেখেও আমরা সে সম্বন্ধে যথার্থ ধারণা লাভ করতে না পারি, তবে অসীম দূরবর্তী
কোনো বস্তু সম্বন্ধে আমরা কীভাবে জ্ঞান লাভ করতে পারব? সঙ্গত কারণেই, শাস্ত্রে বলা
হয়েছে যে, ছয় প্রকার প্রত্যক্ষণ; যথা- ঘ্রাণ, রাসন, শ্রবণ, দর্শন, স্পর্শন ও মানস দ্বারা
পরম সত্য বস্তুকে কখনোই জানা যায় না। কারণ, জড় ইন্দ্রিয়গুলোর সীমাবব্ধতা রয়েছে, আমাদের
সবকটি ইন্দ্রিয়ের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি রয়েছে।
অনুমানের
মাধ্যমে যথার্থ জ্ঞান লাভ হয় কি?
অনু
অর্থ পশ্চাৎ এবং মান অর্থ জ্ঞান; সুতরাং অনুমান অর্থ পশ্চাৎ-জ্ঞান। প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়ানুভূতির
দ্বারা প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে যে জ্ঞান লাভ হয়, তাই
‘অনুমান প্রমাণ’। জল্পনা-কল্পনার জন্য যে তথ্যাদির ওপর নির্ভর করতে হয়, তা তো এ ত্রুটিপূর্ণ
ইন্দ্রিয়ানুভূতি থেকেই আসে। তাই অনুমান ব্যক্তিভেদে তো বিচিত্র হয়ই, এমনকি একজন ব্যক্তিই
অসংখ্য অনুমান করতে পারে। যদিও তার একটিও সত্য নাও হতে পারে।
প্রত্যক্ষণ
ও অনুমানের দ্বারা পরম সত্যকে জানা যায় না
এর
মাধ্যমে পরম সত্যকে জানা যায় না, বরং প্রত্যেকেই নিজের ইন্দ্রিয়ানুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি
ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য বা জ্ঞান আহরণ করে, যা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন
হয়। তাই দেখা দেয় মতভিন্নতা, মতদ্বৈততা বা বিতর্ক। কেউ কারোটা সম্পূর্ণরূপে মেনে নিতে
পারে না, যতক্ষণ না প্রত্যেকেই পরম সত্যকে জানতে পারছে। নিচে এ বিষয়ের ওপর একটি গল্প
তুলে ধরা হলো:
অন্ধের
হাতি দর্শন
ছয়
অন্ধ ব্যক্তি একবার এক মেলায় গিয়েছিল। সেখানে ঘুরতে ঘুরতে তারা শুনতে পেল আশপাশের লোকজন
হাতি আসছে, হাতি আসছে বলে চিৎকার করছে। তখন ছয় অন্ধ ব্যক্তি পরস্পরকে জিজ্ঞেস করে জানতে
চাইল, তারা কেউ হাতি দেখেছে কি না। প্রত্যেকেই জানাল, তারা কেউই কখনো হাতি দেখেনি।
তাই ছয়জনই সিদ্ধান্ত নিল এবার হাতি দেখবে। একে একে সবাই হাতির কাছে গিয়ে একেক জন হাতির
একেক অঙ্গ স্পর্শ করল। যে হাতির শূঁড় ধরেছিল সে বলল, হাতি হলো বড়সড় সাপের মতো; যে হাতির
দাঁত ধরেছিল সে বলল, হাতি বল্লমের মতো; যে হাতির পেট ধরেছিল, সে বলল হাতি দেয়ালের মতো;
যে কান ধরেছিল, সে বলল হাতি বড় পাখার মতো; যে পা ধরেছিল সে বলল, হাতি গাছের গুড়ির মতো
এবং যে লেজ ধরেছিল সে বলল, হাতি দড়ির মতো। এভাবে একেক জন একেকভাবে হাতির বর্ণনা দিতে
লাগল। কিন্তু কারোটা কেউ মেনে নিতে পারছিল না; বরং প্রত্যেকেই প্রত্যেককে অবিশ্বাস
করতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে তর্কযুদ্ধ থেকে হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল।
মর্মকথা
: ছয় অন্ধ কেবল তাদের স্পর্শেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে একই হাতির বিভিন্ন অংশ সম্বন্ধে ধারণা
লাভ করেছিল মাত্র, সম্যকভাবে হাতিকে দেখতে ও জানতে পারেনি। এ কারণে তাদের মধ্যে মতবিরোধও
দেখা দিয়েছিল। ঠিক তেমনি, আমাদের অপূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত ইন্দ্রিয় এবং অনুমানের দ্বারা
কখনোই পরম সত্যকে জানা সম্ভব নয়।
◑
শব্দ প্রমাণ : (তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তির কাছে শ্রবণ)
উক্ত
ছয় অন্ধ ব্যক্তি যদি নিজেরা তর্ক না করে চক্ষুষ্মান তত্ত্বজ্ঞ কোনো ব্যক্তির কাছে হাতি
সম্বন্ধে জানতে চায়, তবেই হাতি সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান তারা লাভ করতে পারে। ঠিক যেমন,
যে ব্যক্তি এখনো আমেরিকা দেখেনি, সে আমেরিকা সম্বন্ধে জানতে পারবে যারা সেখানে গেছেন
তাদের মুখে শুনে অথবা বই-পত্রিকা পড়ে বা অন্য কোনো মাধ্যমে।
আবার যদি কেউ তার পিতার পরিচয় জানতে চায়, তবে তাকে
তার মায়ের কাছে শুনতে হবে। যদি কেউ ডিএনএ টেস্টের কথা বলে, তবে জগতের কত জনের ডিএনএ
টেস্ট করা সম্ভব? অনেক ক্ষেত্রে পিতা ইতোমধ্যে মারাও যেতে পারেন। প্রত্যক্ষ ও অনুমান
বা প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে কি কেউ নিজের জন্ম-তারিখ, জন্মক্ষণের কথা জানতে পারে? নিজের
জন্মক্ষণ নিজে জানার কোনো উপায় আছে কি? নাকি মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন বা নির্ভরযোগ্য
কারো কাছ থেকে শুনেই বিশ্বাস করতে হয়? আবার যদি কেউ নিজের মৃত্যুক্ষণের কথা স্বয়ং জানতে
চায়, তা কখনো সম্ভব কি?
অধিকন্তু, পরিবর্তনশীল এ জগতের ক্ষুদ্রতম কণা পরমাণুকেও
যখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সম্যকভাবে জানা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ইন্দ্রিয়াতীত, অজড়
বস্তুকে কীভাবে জানা সম্ভব? সুতরাং, তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তির কাছ থেকে শ্রবণই হলো যথার্থ
জ্ঞান লাভের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পন্থা।
তবে যে ব্যক্তি যে বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞ সে বিষয়ে জানার
জন্য আমরা সাধারণত সেই ব্যক্তিরই শরণাপন্ন হই, তার কাছ থেকে সে বিষয়ে শুনে জ্ঞান লাভ
করি। যার-তার কথা শুনেই তা সত্য বলে ধরে নিতে পারি না। নিজের বিচারবোধকেও কাজে লাগাতে
হয়। ‘চিল কান নিয়ে গেছে’- এমন কথা কেউ বললেই আমরা সাথে সাথে তা বিশ্বাস করতে যাব না;
কান কানের জায়গায় আছে কি না, তা অবশ্যই দেখব। সুতরাং, পরম সত্য সম্পর্কে জানার জন্য
অবশ্যই এমন কারো কথা শুনতে হবে, যার মধ্যে উল্লিখিত চারটি ত্রুটি থাকবে না, যিনি পরম
সত্যকে সম্যকভাবে জানেন, অর্থাৎ যিনি পরম তত্ত্বজ্ঞ।
তাই
পরম তত্ত্ব সম্বন্ধে কারো কাছ থেকে শ্রবণের পূর্বে যাচাই করতে হবে, নি¤েœাক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ
তাঁর মধ্যে আছে কি না-
-যিনি
ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা ও কর্ণাপাটব- এ চারটি ত্রুটি থেকে মুক্ত।
-যিনি
জড় জগতের তিনটি গুণ- সত্ত্ব, রজ ও তম থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।
-যাঁর
সিদ্ধান্ত বা কথাই চরম এবং তা কখনোই পরিবর্তিত হয় না।
-যাঁর
কথা স্থান-কালের সাপেক্ষে পরীক্ষিত এবং কালের প্রভাব থেকে মুক্ত।
-যিনি
পরম নিরপেক্ষ, কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব তাঁর মধ্যে নেই।
-যাঁর
কথা বা প্রদত্ত জ্ঞান প্রতিনিয়তই বাস্তব জগতে সংঘটিত ও প্রতিপাদিত হয়।
একমাত্র পরমেশ্বর ভগবানই উক্ত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
তিনিই সর্ববেত্তা, সর্বজ্ঞ। তাই তিনি যা বলেছেন, যে জ্ঞান প্রদান করেছেন, তা-ই পরম
ও চরম সত্য এবং সরাসরি তাঁর কাছ থেকে অথবা তাঁর কোনো শুদ্ধ প্রতিনিধির কাছ থেকে শ্রবণের
মাধমেই আমরা সেই পরম পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারি।
শব্দ
প্রমাণ (বেদ) সম্বন্ধে শাস্ত্রের কথা
‘আপ্তোপদেশঃ
শব্দ’ (ন্যায়দর্শন ১/১/৭) আপ্ত, অর্থাৎ যথার্থ বক্তার উপদেশই শব্দ প্রমাণ। যে বাক্যের
তাৎপর্য জড়-জাগতিক অন্য প্রমাণ দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় না, তাই শব্দ প্রমাণ। বাক্য দুই
প্রকার, যথা: বৈদিক ও লৌকিক। বৈদিক বাক্য ভগবানের দ্বারা কথিত হওয়ায় তার সকল অংশ প্রমাণ।
সুতরাং, ভগবানের স্বয়ংসিদ্ধ মহাবাক্যসমষ্টিই ‘শব্দ প্রমাণ’ বা বেদ। বেদ ভগবানের অনাদিসিদ্ধ
মহাবাক্য। খ- অথবা মহাপ্রলয়ের সময় তা ভগবদ্ধামে অন্তর্হিত হয় এবং সৃষ্টির পর ভগবানের
কাছ থেকে পুনরায় অপৌরুষেয় বাক্যরূপে আবির্ভূত হয় মাত্র।
বেদশাস্ত্র সম্বন্ধে বেদে বলা হয়েছে- ‘অজ্ঞাত জ্ঞাপনং
হি শাস্ত্রম্’, অর্থাৎ অজ্ঞাত অচিন্ত্য বস্তুকে যা জ্ঞাপন করে, তাই শাস্ত্র। জড়া প্রকৃতির
অতীত অপ্রাকৃত চিন্ময় বস্তুকে ইন্দ্রিয়নির্ভর পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা কখনোই জানা
যায় না। এজন্য তাকে বলা হয় অচিন্ত্য। অচিন্ত্য বস্তুকে যুক্তি-তর্ক, জল্পনা-কল্পনা
বা অনুমানের দ্বারা কখনো জানা যায় না- একমাত্র শব্দ প্রমাণ বা বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমেই
তা জ্ঞাত হওয়া যায়, যা শব্দব্রহ্মরূপে সরাসরি ভগবান থেকে প্রকাশিত। ভগবদ্গীতাতেও একথা
ঘোষিত হয়েছে যে, বেদ অক্ষর বা পরমেশ্বর ভগবান থেকে প্রকাশিত। (৩/১৫) এ সম্বন্ধে অথর্ববেদে
(গোপালতাপনী উপনিষদ ১/২৪) বলা হয়েছে-
‘যো
ব্রহ্মাণং বিদধাতি পূর্বং
যো
বৈ বেদাংশ্চ গাপয়তি স্ম কৃষ্ণঃ।’
অর্থাৎ
যে ব্রহ্মা পুরাকালে জগতে বৈদিক জ্ঞান প্রদান করেছিলেন, তিনি যাঁর কাছ থেকে সে জ্ঞান
প্রাপ্ত হন, তিনি শ্রীকৃষ্ণই। তাই শ্রীমদ্ভাগবতের শুরুতেই বলা হয়েছে- ‘তেনে ব্রহ্ম
হৃদা যো আদি কবয়ে’- ‘তিনিই আদি কবি ব্রহ্মার হৃদয়ে সর্বপ্রথম বৈদিক জ্ঞান প্রদান করেন।’
সৃষ্টির
প্রারম্ভে ব্রহ্মা ধ্যানমগ্ন হলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বংশীধ্বনি বৈদিকমন্ত্র ওঙ্কাররূপে
তাঁর কর্ণে প্রবিষ্ট হয়। এভাবে তিনি পরিপূর্ণ বৈদিক জ্ঞান লাভ করে সমস্ত জীবের প্রথম
গুরুর পদে অধিষ্ঠিত হন। তারপর ব্রহ্মার কাছ থেকে সেই বৈদিক জ্ঞান গুরু-শিষ্য পরম্পরাক্রমে
নেমে আসে।
তারপরও এ পরম তত্ত্বজ্ঞান বাহিত হওয়ার প্রবাহ তথা
পরম্পরা যখনই ছিন্ন বা নষ্ট হয়, তখনই ভগবান এসে তা পুনরায় প্রদান করেন। ঠিক যেমন আজ
থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে পরমতত্ত্ব
গীতাজ্ঞান দান করেছিলেন। অর্জুনের কাছে তিনি এও বলেছেন যে, আজ থেকে কোটি কোটি বছর পূর্বে
যখন পরম্পরা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি সূর্যদেব বিবস্বানকে এ গীতাজ্ঞান দান করেছিলেন
(গী. ৪/১)।
বৈদিক
শাস্ত্র কী?
সংস্কৃত
‘বিদ্’ ধাতু থেকে বেদ শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে। বিদ ধাতুর অর্থ জানা বা অনুভব করা। “বেদয়তি
ধর্মং ব্রহ্ম চ বেদঃ”- যিনি ধর্ম ও ব্রহ্মতত্ত্বকে (সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়ই) জানিয়ে
দেন, তিনিই বেদ। ভবিষ্যপুরাণ অনুসারে ঋগে¦দ, যজুর্বেদ, সামবেদ, মহাভারত (যার মধ্যে
ভগবদ্গীতা অন্তর্ভুক্ত), পঞ্চরাত্র মূল রামায়ণ এবং পুরাণসমূহকে একত্রে বৈদিক শাস্ত্র
বলে। ছান্দোগ্য উপনিষদে (৭/১/৪) পুরাণ ও ইতিহাসসমূহেরও উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের পঞ্চম
বেদ বলা হয়। মুখ্য পুরাণের সংখ্যা ১৮টি এবং সমস্ত পুরাণের মধ্যে ভাগবত পুরাণ (শ্রীমদ্ভাগবত)
বেদান্তসূত্রের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ভাষ্য। বৈদিক শাস্ত্রের এ বিপুল জ্ঞানভা-ারে প্রায়
১০০ কোটি সংস্কৃত শ্লোক আছে।
কলিযুগ-পূর্ব যুগের মানুষ এতই মেধাসম্পন্ন ও শ্রুতিধর
ছিলেন যে, গুরুদেবের কাছ থেকে একবার শ্রবণ করার পরই তাঁরা সবকিছু বুঝে মনে রাখতে পারতেন।
বেদের জ্ঞানও শ্রবণের মাধ্যমেই পরম্পরাক্রমে নেমে আসে বলে এর অপর নাম হলো শ্রুতি। শুকদেব
গোস্বামী তাঁর পিতা মহামুনি ব্যাসদেবের কাছ থেকে আঠার হাজার শ্লোকসমন্বিত শ্রীমদ্ভাগবত
শ্রবণ করেছিলেন এবং অনায়াসে তা অবিকৃতভাবে স্মরণ রেখে মহারাজ পরীক্ষিতসহ উপস্থিত মুনি-ঋষিগণকে
শ্রবণ করান। কিন্তু এ কলিযুগের মানুষ পারমার্থিক জীবনের প্রতি অনীহাযুক্ত ও অলস এবং
তাদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত দুর্বল। তাই এ কলিযুগের মানুষের কথা ভেবে ব্যাসদেব পাঁচ
হাজার বছর পূর্বেই সকল বেদ ও পুরাণ সংকলনপূর্বক লিপিবদ্ধ করেন।
প্রশ্ন
হতে পারে যে, ব্যাসদেব তো একজন মানুষ; তবে তার লিখিত শাস্ত্রসমূহ কীভাবে প্রমাণ বলে
স্বীকৃত হবে।
-
প্রথমত ব্যাসদেব কোনো সাধারণ মানুষ নন। তিনি ভগবানের শক্ত্যাবেশ অবতার। শক্ত্যাবেশ
অবতাররূপে তিনি এজগতে জীবকে তার স্বরূপ প্রদানের নিমিত্তে বৈদিক শাস্ত্রসমূহ রচনা করেন।
তাই ব্যাসদেব রচিত কোনো গ্রন্থ মনুষ্য রচিত কাল্পনিক কোনো সাহিত্যের মতো নয়। তা স্বয়ং
ভগবদ্প্রদত্ত।
-
দ্বিতীয়ত এই বৈদিক জ্ঞান পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে এসেছে। তাই যথার্থ পরম্পরা থেকে আগত
জ্ঞান নিঃসন্দেহে অভ্রান্ত।
বেদ
সম্বন্ধে ভুল ধারণা
অনেকের
মধ্যে আবার ভুল ধারণাও আছে যে, বেদ হলো হিমালয়ের প্রাচীন গুহাবাসী মানুষের তালপাতার
ওপর লেখা সংস্কৃত ভাষার এক প্রাচীন গ্রন্থ, যা ঋক্, সাম, যজু ও অথর্ব- এ চার খ-ে বিভক্ত।
কিন্তু একথা সম্পূর্ণ অসত্য। ‘বেদ’ অর্থ ‘জ্ঞান’। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়,
প্রতিরক্ষা, চিকিৎসা, পদার্থবিদ্যা, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প ও কলাবিদ্যা প্রভৃতি সব ধরনের
জ্ঞানই বেদের অন্তর্ভুক্ত এবং ঋক্, সাম, যজু ও অথর্ব হলো বেদের অন্তর্গত চারটি সংহিতা।
বেদকে ব্রাহ্মণ, সংহিতা, আরণ্যক ও উপনিষদ- এ চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
বৈদিক
শাস্ত্র যে অভ্রান্ত, তার প্রমাণ কী?
কোনো
ম্যানুফ্যাকচারার (উৎপাদক) যেমন কোনো পণ্য (হতে পারে কোনো ঔষধ) তৈরি করলে সাথে সাথে
কীভাবে সেটি ব্যবহার করতে হবে তার একটি ম্যানুয়াল (নির্দেশিকা) প্রদান করে, তেমনি এ
জগতের মানুষ কীভাবে তাদের জীবন পরিচালনা করবে, তারও ম্যানুয়াল থাকা চাই। আর সে ম্যানুয়াল
হলো মানুষের জন্য উদ্দিষ্ট ভগবৎপ্রদত্ত বৈদিক শাস্ত্র। বৈদিক শাস্ত্রে জগৎ ও জীবনের
সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের জ্ঞান, তত্ত্ব ও তথ্য বর্ণিত হয়েছে এবং তা যে অভ্রান্ত, তার
কিছু প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ঘাটিতও হয়েছে। নি¤েœ সে সম্বন্ধে
সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
মহাভারতের বর্ণনা অনুসারে গান্ধারীর ভ্রƒণ থেকে
ব্যাসদেব কর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রের ১০০ পুত্রের জন্ম অনেকের কাছে অবাস্তব, অবৈজ্ঞানিক ও
কাল্পনিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ৫০০০ বছরেরও অধিক সময় পরে হলেও এ ঘটনার বৈজ্ঞানিক
যথার্থতা স্বীকার করে মাওলানা আজাদ মেডিক্যাল কলেজের সার্জন ডা. বি. জি মাতাপুরকার
(অরগান রিজেনারেশনের ওপর আমেরিকান পুরস্কারপ্রাপ্ত) বলেন, “ব্যাসদেব শুধু টেস্টটিউব
বেবি সম্বন্ধেই জানতেন না, তিনি ভ্রূণকে নারী শরীর থেকে আলাদা করে আলাদা আলাদা শরীর
দানের প্রযুক্তিও জানতেন।”( ‘Times of India, May 5, 2002’)
শ্রীমদ্ভাগবতে বেণ মহারাজের শরীর থেকে পৃথু মহারাজের
আবির্ভাবের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা বর্তমান প্রযুক্তির ক্লোনিং সিস্টেমের অনুরূপ,
যা বিজ্ঞানের অতি সাম্প্রতিক আবিষ্কার।
বর্তমানে
উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুবাদে কিছু কিছু অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে; কিন্তু
শাস্ত্রে মস্তক প্রতিস্থাপনের দৃষ্টান্তও আছে; যেমন: শনির দৃষ্টিপাতে গণেশের মস্তক
ছিন্ন হলে হাতির মস্তক প্রতিস্থাপন করা হয়, দক্ষরাজের মস্তক ছিন্ন হওয়ার পর ছাগলের
মস্তক লাগিয়ে তাকে জীবিত করা হয়। আবার অশ্বিনী কুমারদ্বয় দধীচি মুনির কাছে বেদের জ্ঞান
লাভের জন্য এলে যখন দধীচি মুনি ইন্দ্র কর্তৃক শিরচ্ছেদের ভয় পাচ্ছিলেন, তখন অশ্বিনী
কুমারদ্বয় দধীচি মুনির মস্তকে অশ্বের মস্তক প্রতিস্থাপন করে জ্ঞান লাভ করেন। যে কারণে
বেদের আরেক নাম অশ্বশিরা। ইন্দ্র পরে একথা শুনে দধীচি মুনির অশ্ব-মস্তক ছিন্ন করলে
অশ্বিনী কুমারদ্বয় পুনরায় দধীচি মুনির আসল মস্তক সংযোগ করে দেন।
প্রথম থেকে দশম মাস পর্যন্ত মাতৃদেহে ভ্রƒণের বিকাশ
কীভাবে হয় তা আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধের ৩০ অধ্যায়ে পূর্ণাঙ্গভাবে
বর্ণনা করা হয়েছে, যা বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভব হচ্ছে।
ডালটন মাত্র দুশ’ বছর আগে পরমাণু আবিষ্কার করলেও
আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে রচিত শ্রীমদ্ভাগবতের মূল শ্লোকে পরমাণু যে অবিভাজ্য কণা
সে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রহ্মসংহিতায় (৫) বলা হয়েছে যে, শৃঙ্খলাযুক্ত জড় পদার্থের
বৃহত্তম ইউনিট বা একক হলো ব্রহ্মা- এবং ক্ষুদ্রতম একক হলো পরমাণু (অণ্ডান্তরস্থং পরমাণু-চয়া-অন্তরস্থং)।
এমন বৃহত্তম ইউনিট বা ব্রহ্মাণ্ড শুধু একটি নয়, কোটি কোটি রয়েছে (একোহপাস্য রচয়িতুং
জগদণ্ডকোটিং- ব্রহ্মসংহিতা-৫)।
এমনকি পাঁচশ’ বছর আগেও ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলের
মানুষ বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী সমতল। অথচ বেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, পৃথিবী গোল-
‘ভূগোল’।
আইনস্টাইন স্থান ও কাল সম্পর্কিত আপেক্ষিকতাবাদ
ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র কিছুকাল আগে, কিন্তু কুকুদ্মি মুনির আপেক্ষিকতা বিষয়ক অভিজ্ঞতা
ভাগবতে পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে।
মনোবিজ্ঞান মন নামক ইন্দ্রিয়কে স্বীকার করে মন
নিয়ে অনেক গবেষণা করছে মাত্র। জড় বিজ্ঞান মন বিষয়ে তেমন কিছুই জানতে পারছে না; কিন্তু
বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, জীবের স্থূল শরীর পাঁচটি স্থূল উপাদান যথা- ভূমি (কঠিন),
জল (তরল), বায়ু (গ্যাসীয়), তাপ (আগুন) ও ব্যোম (আকাশ) দিয়ে এবং সূক্ষ্ম শরীর তিনটি
সূক্ষ্ম উপাদান যথা- মন, বুদ্ধি ও অহংকার দিয়ে গঠিত। অর্থাৎ মানুষের মন জড় সূক্ষ্ম
ইন্দ্রিয়।
শতকের গুণনীয়কের হিসাব ২/৩ হাজার বছর পূর্বে উদ্ভাবিত
হয়েছে বলে বলা হলেও বেদের অসংখ্য স্থানে শতকের গুণনীয়ক সংখ্যা সহস্র-লক্ষ-কোটি-অর্বুদ-পরার্ধ্বের
কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: চুরাশি লক্ষ প্রজাতির জীবের কথা (চতুর্লক্ষশ্চ মানবাঃ),
আত্মার আয়তন (কেশাগ্রের ১০,০০০ ভাগের এক ভাগ), কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের হিসাব (একোহপাস্য
রচয়িতুং জগদণ্ডকোটিং- ব্রহ্মসংহিতা ৫)।
মহাভারতের বর্ণনা অনুসারে, অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্র
উত্তরার কোনোরূপ ক্ষতিসাধন ছাড়াই তার গর্ভস্থ সন্তানের দিকে ধাবিত হয়েছিল, যার ক্ষমতা
বর্তমান নিউক্লিয়ার বোমার চেয়েও অধিক।
বেদে
বলা হয়েছে- উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষসহ সকল জীবের দেহে প্রাণ, জীবনী শক্তি বা আত্মা আছে।
অথচ বিজ্ঞানীরা জগদীশ চন্দ্র বসু পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করে দেখানোর আগে বিশ্বাসই
করতেন না যে, উদ্ভিদের প্রাণ আছে।
বেদ অনুসারে আগুনের মধ্যেও জীব রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা
মনে করতেন যে, এমনকি ফোটানো জলেও ব্যাকটেরিয়া বাঁচতে পারে না, সেজন্য তারা ফোটানোর
মাধ্যমে নির্জীবিকরণ করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণায় এক ধরনের জীবাণুর সন্ধান
পাওয়া গেছে যা আগুনের মধ্যেও বাঁচতে সক্ষম। তারা এর নাম দিয়েছেন ‘অগ্নি-ব্যাকটেরিয়া’
(Fire Bacteria)। এছাড়া প্রাকৃতিক প্রস্ববণ এবং আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখেও ব্যাকটেরিয়ার
সন্ধান পাওয়া গেছে।
বেদে বলা হয়েছে, গোবর বিষ্ঠা হওয়া সত্ত্বেও পবিত্র।
অথচ এতদিন পর ১৯৪০ সালে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, গোবর
হলো জীবাণু-প্রতিরোধক; জীবাণুপ্রতিরোধী সব গুণই গোবরে আছে।
শাস্ত্রে অনেক আগেই বলা হয়েছে যে, গঙ্গাজল (ভগবানের
চরণধৌত জল) পরম পবিত্র ও সর্বপাপনাশক, যা বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে
জেনেছেন যে, গঙ্গাজলে ব্যাকটেরিওফাজ (Bacteriophage) নামক যে ভাইরাস আছে তা পানি দূষণের
জন্য দায়ী সমস্ত ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে; কিন্তু তা মানুষের জন্য মোটেই ক্ষতিকর নয়,
বরং উপকারী।
শাস্ত্রে তুলসী বৃক্ষকে পরম পবিত্রকারী, ভক্তিবর্ধক
বৃক্ষরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান এতদিন পর তা স্বীকার করে বলছে যে,
তুলসী বৃক্ষ (Ocimum sanctum) জীবাণু ও সংক্রমণ নাশক, এ বৃক্ষ সর্বদাই যে অক্সিজেন
ছাড়ে তা কখনো কোনোকিছুর দ্বারা দূষিত হয় না, উপরন্তু দূষিত বায়ুকেও নির্মল করে দেয়।
পৃথিবীতে বিভিন্ন অবতার ও মহাপুরুষের আবির্ভাব
সম্বন্ধেও বেদে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে; যেমন:
✭
বুদ্ধ (ভাগবত. ১.৩.২৪), ✭ চাণক্য (ভা. ১২.১.১১), ✭
সম্রাট অশোক ও চন্দ্রগুপ্ত (ভা. ১২.১.১২)
✭
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব, ১২৭.৯২,৭৫, ভাগবত ১১.৫.৩২),
✭
যীশু (ভবিষ্যপুরাণ, প্রতিসর্গপর্ব, ভারতখণ্ডের অষ্টাদশ রাজ্যস্থান বর্ণন- ২৩, ২৪, ৩১)
✭
মুহম্মদ (ভবিষ্যপুরাণ, প্রতিসর্গপর্ব, শালিবাহন বংশীয় নৃপতি বর্ণন- ১২, ২৪-২৭)।
এমনকি বৈদিক শাস্ত্রে কলিযুগ সম্বন্ধে যে ভবিষ্যদ্বাণী
করা হয়েছে, তার প্রতিফলন আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি:
খাদ্যসামগ্রী
বিক্রি করা হবে (পূর্বে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করা হতো না; এখন জল ও বায়ুসহ সব ধরনের
খাদ্যসামগ্রীই ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে)।
কলিযুগের মানুষ অন্নগত প্রাণ ও যোনিগত মন। কেবল
যৌন আকর্ষণের ভিত্তিতেই এ যুগে নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে।
মানুষ
নিজেদের ভ্রূণ পর্যন্ত আহার করবে (পূর্বে পিতামাতা সন্তানকে ভগবান প্রদত্ত আশীর্বাদ
বলে পরম আদরে গ্রহণ করে অকৃত্রিম ভালোবাসায় তাদের লালন-পালন করতেন; কিন্তু বর্তমানে
পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় রেস্টুরেন্টে মানব ভ্রƒণ উপাদেয় আহার হিসেবে বিক্রি হচ্ছে)।
অর্থ ও ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মানুষ মানুষকে সম্মান
করবে।
লাবণ্যম কেশ ধারণম্- লম্বা চুল ধারণ করা সৌন্দর্যের
প্রতীক বলে বিবেচিত হবে।
বিপ্রতেভ সূত্রমেভা হি- কেবল উপবীত ধারণ করেই মানুষ
ব্রাহ্মণ বলে স্বীকৃত হবে।
বৈদিক শাস্ত্রের প্রত্যেকটি কথার বাস্তবতা আমরা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করছি। এজন্য তা অভ্রান্ত।
উল্লিখিত
যুক্তি ও প্রমাণসমূহ কি বৈদিক জ্ঞানের প্রামাণিকতা নিশ্চিত করে না? বৈদিক শাস্ত্রসমূহ
এভাবেই মাতারূপে ভগবানকে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন যাতে করে আমরা পুনরায় নিত্যধামে প্রত্যাবর্তন
করতে পারি। -হরেকৃষ্ণ